ভারতের ৩টি তেজাস বিধ্বস্ত, পুরো বহরের উড্ডয়ন স্থগিত

ভারতের নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি হালকা যুদ্ধবিমান ‘তেজাস’ আবারও বড় ধরনের দুর্ঘটনার কবলে পড়েছে। গত শনিবার অবতরণের সময় একটি গুরুত্বপূর্ণ বিমানঘাঁটিতে সর্বশেষ এই দুর্ঘটনা ঘটে। গত কয়েক বছরে এটি তেজাস প্ল্যাটফর্মের তৃতীয় বড় দুর্ঘটনা, যার পরিপ্রেক্ষিতে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে পুরো বহরের উড্ডয়ন সাময়িকভাবে স্থগিত করেছে ভারতীয় বিমানবাহিনী।

এই দুর্ঘটনার ফলে ৪৩ বছরে ধরে চলা ভারতের নিজস্ব এই হালকা নিজস্ব বিমান প্রকল্পের অধীনে নির্মিত ৩২টি বিমানের মধ্যে ৩টি ধ্বংস হয়ে গেল যা মোট বহরের প্রায় ১০ শতাংশ।

কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, নিয়মিত প্রশিক্ষণ মহড়া শেষে অবতরণের সময় বিমানটি যান্ত্রিক সমস্যায় পড়ে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে পাইলট তাৎক্ষণিকভাবে ইজেক্ট করেন। তিনি নিরাপদে অবতরণ করেছেন এবং শারীরিকভাবে সুস্থ আছেন। তবে বিমানটি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং ভারতীয় বিমানবাহিনী এটিকে ‘আনসার্ভিসিবল’ বা ব্যবহারের অনুপযোগী ঘোষণা করেছে। এই দুর্ঘটনা নিয়ে এখনও আনুষ্ঠানিক বিস্তারিত বিবৃতি প্রকাশ করা হয়নি।

দুর্ঘটনাকবলিত বিমানটি রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা হিন্দুস্তান অ্যারোনটিক্স লিমিটেড (হাল) সরবরাহ করা ৩২টি একক আসনের তেজাস বিমানের একটি। প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে বিমানের কাঠামোগত বড় ক্ষতির আভাস পাওয়া গেছে।

দুর্ঘটনার ধারাবাহিকতা

তেজাস যুদ্ধবিমানের এটিই তৃতীয় দুর্ঘটনা। প্রথমটি ঘটে মার্চ ২০২৪ সালে রাজস্থানের জয়সলমীরের কাছে। একটি ফায়ার পাওয়ার প্রদর্শনী শেষে ফেরার পথে বিমানটি বিধ্বস্ত হয়, যদিও পাইলট নিরাপদে বের হতে সক্ষম হন।

দ্বিতীয় দুর্ঘটনা ঘটে নভেম্বর ২০২৫ সালে দুবাই এয়ারশোতে অ্যারোবেটিক প্রদর্শনের সময়। ওই দুর্ঘটনায় ভারতীয় বিমানবাহিনীর উইং কমান্ডার নমনিশ সিয়াল নিহত হন। সেই ঘটনার তদন্ত এখনও চলমান।

সাম্প্রতিক দুর্ঘটনার পর বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উন্নয়ন ও মোতায়েন পর্যায়ে বিশ্বজুড়ে যুদ্ধবিমান কর্মসূচিতে বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনা অস্বাভাবিক নয়। তবে অল্প সময়ের ব্যবধানে তিনটি দুর্ঘটনা তেজাসের নির্ভরযোগ্যতা ও অপারেশনাল প্রস্তুতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।

ডেলিভারিতে বিলম্ব নিয়ে উদ্বেগ

ভারতীয় বিমানবাহিনী উন্নত রাডার ও এভিওনিক্স সমৃদ্ধ ১৮০টি ‘তেজাস মার্ক–১এ’ যুদ্ধবিমান অর্ডার করেছে। কিন্তু এই উন্নত সংস্করণ সরবরাহে হিন্দুস্তান অ্যারোনটিক্স লিমিটেড একাধিক নির্ধারিত সময়সীমা পূরণ করতে পারেনি বলে প্রতিরক্ষা মহলে আলোচনা রয়েছে। সরবরাহ চেইনের জটিলতা ও প্রযুক্তিগত সমন্বয় সমস্যাকে বিলম্বের সম্ভাব্য কারণ হিসেবে উল্লেখ করছেন সংশ্লিষ্টরা।

ভারতের বিমানবাহিনী বহর আধুনিকায়নের ওপর জোর দিলেও সরবরাহ বিলম্ব তাদের পরিকল্পনায় প্রভাব ফেলতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

পুরো বহরের উড্ডয়ন স্থগিত

সর্বশেষ দুর্ঘটনার পর সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে কার্যকর থাকা সব তেজাস বিমানের উড্ডয়ন সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। এই সময় প্রতিটি বিমানের কারিগরি পরীক্ষা, নিরাপত্তা প্রোটোকল ও রক্ষণাবেক্ষণ রেকর্ড পুনরায় যাচাই করা হবে। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত এই নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকতে পারে।

প্রমিত পদ্ধতি অনুযায়ী তদন্তকারীরা ফ্লাইট ডেটা রেকর্ডার, ককপিট ভয়েস রেকর্ডিং এবং রক্ষণাবেক্ষণ নথিপত্র বিশ্লেষণ করবেন। দুর্ঘটনার কারণ যান্ত্রিক ত্রুটি, মানবিক ভুল নাকি অন্য কোনো বাহ্যিক প্রভাব—তা তদন্ত শেষে স্পষ্ট হবে। ক্ষতিগ্রস্ত বিমানটি মেরামতযোগ্য কি না, সেটিও চূড়ান্ত কারিগরি মূল্যায়নের ওপর নির্ভর করছে।

৩২টি সরবরাহকৃত বিমানের মধ্যে তিনটি ধ্বংস হওয়ায় তেজাস কর্মসূচির নির্ভরযোগ্যতা, উৎপাদন গতি এবং সরবরাহ সময়সীমা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে ভারতের প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক মহলে। সূত্র: দ্য সানডে গার্ডিয়ান

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন