ভাগ্য বদলের আশায় ঘর ছেড়েছিলেন তরুণ মোঃ সুহানুর রহমান (এহিয়া)। পরিবারের স্বপ্ন, নিজের ভবিষ্যৎ—সবকিছু গুছিয়ে নিতে চেয়েছিলেন দূর ইউরোপে গিয়ে। কিন্তু সেই স্বপ্ন আর বাস্তব হলো না। ভূমধ্যসাগরের উত্তাল ঢেউয়ের মাঝে চিরতরে থেমে গেল তার জীবনযাত্রা।
সুনামগঞ্জ জেলার দিরাই উপজেলার বাসুরী গ্রামের বাসিন্দা এহিয়া, পিতা মোঃ সালিকুর রহমান। প্রায় তিন মাস আগে অবৈধ পথে গ্রীসে যাওয়ার উদ্দেশ্যে বাড়ি ছাড়েন তিনি। প্রথমে ঢাকায় গিয়ে প্রায় এক মাস অবস্থান করেন। এরপর দালালচক্রের মাধ্যমে বিমানযোগে মিশর হয়ে পৌঁছান লিবিয়ায়—যেখানে শুরু হয় অনিশ্চয়তা আর ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রার আরেক অধ্যায়।
গত ২২ মার্চ, আনুমানিক রাত সাড়ে ১০টার দিকে লিবিয়া উপকূল থেকে একটি ঝুঁকিপূর্ণ নৌযানে (বোট) যাত্রা শুরু করেন এহিয়াসহ আরও অনেক স্বপ্নবাজ মানুষ। গন্তব্য ছিল ইউরোপের গ্রিস—কিন্তু মাঝপথেই প্রকৃতি হয়ে ওঠে নির্মম।
যাত্রার মাত্র ৬-৭ ঘণ্টার মধ্যেই শুরু হয় প্রবল ঝড়। উত্তাল ঢেউয়ের আঘাতে দিকভ্রান্ত হয়ে পড়ে ছোট নৌযানটি। চারদিকে শুধু অন্ধকার আর বিশাল সমুদ্র—কোনো দিকনির্দেশনা নেই, নেই নিরাপত্তার কোনো নিশ্চয়তা। কয়েকদিন ধরে গহিন সাগরে দুলতে থাকে নৌযানটি, আর ততক্ষণে নিঃশেষ হতে থাকে যাত্রীদের শক্তি, আশা আর জীবন।
পরিবার সূত্রে জানা যায়, ২৫ মার্চ—যাত্রার তৃতীয় দিনে—এহিয়া মৃত্যুবরণ করেন। তার মৃত্যুর খবর পরে নিশ্চিত করেন আত্মীয় মাসুম আহমদ, যিনি তপোবন আবাসিক এলাকায় বসবাস করেন।
অবশেষে ২৮ মার্চ নৌযানটি কোনোভাবে উপকূলে পৌঁছায়। তবে ততক্ষণে এহিয়ার নিথর দেহে পচন ধরায়, সহযাত্রীদের বাধ্য হয়ে তার লাশ সাগরেই ফেলে দিতে হয়। এ যেন এক নিঃশব্দ বিদায়—না ছিল জানাজা, না ছিল শেষ দেখা, না ছিল মাটির কবর—গভীর সাগরই হয়ে উঠলো তার শেষ ঠিকানা।
এহিয়ার মৃত্যুসংবাদ গ্রামে পৌঁছালে নেমে আসে শোকের ছায়া। পরিবার, স্বজন, প্রতিবেশী—সবাই স্তব্ধ। যার চোখে ছিল স্বপ্ন, যার মনে ছিল ভবিষ্যতের আশা—সে আজ নিখোঁজ এক নাম, হারিয়ে যাওয়া এক জীবন।
গ্রামবাসীরা বলছেন, “অভাব আর স্বপ্ন মানুষকে এমন ঝুঁকির পথে ঠেলে দেয়। কিন্তু এভাবে যেন আর কোনো মায়ের বুক খালি না হয়।”
এহিয়ার এই করুণ পরিণতি আবারও মনে করিয়ে দেয়—অবৈধ পথে বিদেশযাত্রা কতটা ভয়াবহ ও অনিশ্চিত হতে পারে। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে শুরু করা এমন যাত্রা অনেক সময় পৌঁছায় না কোনো গন্তব্যে—বরং শেষ হয় অচেনা সাগরের গভীরে, নিঃশব্দ মৃত্যুর মধ্য দিয়ে।