ভূমধ্যসাগরের বিভীষিকা: বেঁচে ফেরা এক যুবকের বর্ণনায় মৃত্যুপুরী (ভিডিও)

ভাগ্য বদলের আশায় লিবিয়া থেকে ইউরোপের পথে যাত্রা—কিন্তু সেই পথই হয়ে উঠেছিল এক ভয়াবহ মৃত্যুফাঁদ। ভূমধ্যসাগর থেকে জীবিত ফিরে আসা এক বাংলাদেশি যুবকের বর্ণনায় উঠে এসেছে এমন এক বিভীষিকার চিত্র, যা শুনলে গা শিউরে ওঠে।

ওই যুবকের ভাষ্য অনুযায়ী, লিবিয়া থেকে মোট ৪৩ জন যাত্রী নিয়ে যাত্রা শুরু হয়েছিল, যার মধ্যে ৩৮ জনই বাংলাদেশি। তাদের বেশিরভাগই সিলেট অঞ্চলের, আর একজন ছিলেন কিশোরগঞ্জের বাসিন্দা। গন্তব্য ছিল গ্রীস। দালালদের সঙ্গে চুক্তি হয়েছিল বড় ও তুলনামূলক নিরাপদ নৌযানে করে পাঠানো হবে।

কিন্তু বাস্তবে তাদের নেওয়া হয় সাগরপাড়ে এবং জোর করে তুলে দেওয়া হয় একটি ছোট, প্লাস্টিকের ঝুঁকিপূর্ণ নৌকায়। ৪৩ জন মানুষকে গাদাগাদি করে সেই নৌকায় তুলে দেওয়া হয়, যেখানে নিরাপত্তা বা প্রয়োজনীয় প্রস্তুতির কোনো ব্যবস্থা ছিল না।

প্রথমে বলা হয়েছিল, যাত্রা সর্বোচ্চ দুই দিন লাগবে। সেই অনুযায়ী সামান্য খাবার ও পানি সঙ্গে ছিল। কিন্তু যাত্রার কিছুক্ষণের মধ্যেই নৌকাটি দিকভ্রান্ত হয়ে পড়ে এবং গভীর সমুদ্রে হারিয়ে যায়। চারদিকে শুধু পানি আর অজানা দিক—কোনো যোগাযোগ নেই, নেই উদ্ধার পাওয়ার নিশ্চয়তা।

দুই দিন পার হতেই খাবার ও পানির মজুত শেষ হয়ে যায়। তৃষ্ণা আর ক্ষুধায় একে একে দুর্বল হয়ে পড়তে থাকেন যাত্রীরা। তৃতীয় দিন থেকেই শুরু হয় মৃত্যুর মিছিল।

বেঁচে ফেরা যুবক জানান, ছোট্ট নৌকাটির ভেতর তখন ৪৩ জন মানুষের সঙ্গে ছিল মৃতদেহও। স্বজন, বন্ধু, সহযাত্রী—একজন আরেকজনের লাশ কোলে নিয়ে বসে ছিলেন। নিজেরা না খেয়ে, না পানিতে তৃষ্ণায় কাতর থাকলেও মৃতদের প্রতি শেষ সম্মান জানাতে চেয়েছিলেন তারা।

তিনি বলেন, “আমরা চেয়েছিলাম কোনোভাবে তীরে পৌঁছাতে পারলে সবাইকে কবর দেবো। তাই দুই দিন পর্যন্ত লাশগুলো বুকে ধরে রেখেছিলাম।”

কিন্তু সমুদ্রের লবণাক্ত পানি ও তীব্র তাপে দ্রুত পচন ধরতে শুরু করে মৃতদেহে। অসহনীয় দুর্গন্ধ, দুর্বলতা আর বেঁচে থাকার সংগ্রামের মধ্যে পড়ে শেষ পর্যন্ত বাধ্য হন তারা—এক এক করে প্রিয়জনদের লাশ সাগরে ভাসিয়ে দিতে।

এইভাবে টানা ছয় দিন গভীর সমুদ্রে ভেসে থাকার পর অবশেষে গ্রীসের কোস্টগার্ডের নজরে আসে নৌযানটি। উদ্ধার করা হয় জীবিতদের। তবে ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে—১৮ জন যাত্রী তাদের কোলে, চোখের সামনে একে একে মারা গেছেন। নিহতদের সবাই বাংলাদেশি বলে জানা গেছে।

এই ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা ওই যুবক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লাইভে এসে তুলে ধরেন। যদিও তার পরিচয় নিশ্চিত হওয়া যায়নি, তার বর্ণনা ইতোমধ্যেই নাড়া দিয়েছে মানুষের বিবেক।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দালালচক্রের প্রলোভনে পড়ে এমন ঝুঁকিপূর্ণ পথে পাড়ি দেওয়া প্রতিনিয়তই প্রাণঘাতী হয়ে উঠছে। সামান্য স্বপ্ন আর ভালো জীবনের আশায় মানুষ নিজের জীবনকে ঠেলে দিচ্ছে অনিশ্চিত মৃত্যুর মুখে।

ভূমধ্যসাগরের এই বিভীষিকা আবারও মনে করিয়ে দেয়—অবৈধ পথে বিদেশযাত্রা শুধু অনিশ্চিতই নয়, অনেক ক্ষেত্রে তা হয়ে উঠছে নিশ্চিত মৃত্যুর আরেক নাম।

ভিডিও দেখতে এই লিংকে ক্লিক করুন:

https://www.facebook.com/share/r/1c4UPuD84X/

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন