কলকাতার সুলুক সন্ধানে-শেষ পর্ব

দৈনিকসিলেট ডেস্ক :
আমরা রওনা হলাম ঐতিহাসিক স্থান প্রিন্সেপ ঘাটের দিকে। কলকাতার ঘিঞ্জি শহর থেকে দূরে নির্জনে অবস্থিত প্রিন্সেপ ঘাট। হুগলি নদীর তীরে ঐতিহাসিক এ স্থানটি ব্রিটিশ আমলে ১৮৪১ সালে নির্মিত হয়েছে। ব্রিটিশ যাত্রীবাহী জাহাজের ওঠানামার কাজে ব্যবহার করা হত এই ঘাট।ব্রিটিশরা ভারতবর্ষের প্রাকৃতিক ও খনিজ সম্পদ লুট করে নিয়ে যেত এই ঘাট দিয়ে।
ঘাটে পৌঁছে দেখলাম বিশেষ আকর্ষণীয় একটি মনুমেন্ট নির্মাণ করা হয়েছে। অন্ধকার আর বাহারি লাইট মিলিয়ে এক অপরূপ দৃশ্য ধারণ করেছে প্রিন্সেপ ঘাট। মনুমেন্টের পেছনে আবছা অন্ধকারে ছেয়ে আছে।
ঘাটের চারপাশের পরিবেশ বেশ মনোরম ও খোলামেলা, ডান দিকে সুসজ্জিত একটি পার্ক। বাহারি খাবারের দোকানে বিক্রি হচ্ছে পাউ ভাজি, ফুচকা। ঘাটকে ঘিরে পর্যটককেন্দ্র ভালোই গড়ে উঠেছে। সিঁড়ি বেয়ে ঘাটের নিচে নামলাম।
পানির ওপর কয়েকটি জাহাজ নোঙর করা আছে। হুগলি নদীতে ভাটা চলছে। পানির ওপর আলোর ঝাপটা পড়ে অন্য রকম এক আবহ সৃষ্টি হয়েছে। সত্যিই ব্রিটিশ নির্মিত ঘাটের সৌন্দর্য্যের তুলনা হয় না।
হাওড়া ব্রিজ
দিনের শেষ ভ্রমণ হিসেবে বাসে চেপে রওনা হলাম হাওড়া ব্রিজের দিকে।কলকাতা ও হাওড়া শহরের মধ্যে সংযোগকারী ব্রিজ হচ্ছে হাওড়া। সেতুর মূল আকর্ষণ হলো এতে কোনো পিলার নেই। বিশাল স্টিলের পাত একটার সঙ্গে আরেকটা জুড়ে বানানো হয়েছে। ব্রিজটি দেড়শ বছরের ইতিহাসের সাক্ষী দাঁড়িয়ে আছে। নাটবল্টু ছাড়াই ১৮৭৪ সালে ব্রিটিশরা নির্মিত করেছিলেন হাওড়া ব্রিজ। হাওড়া এখনো বিশ্বের ষষ্ঠ দীর্ঘতম সেতু।
হাওড়া ব্রিজের কাছে পৌঁছে দেখলাম ব্রিজের দুই পাশের পানির ওপর আলো পড়ে অন্য রকম আবহ সৃষ্টি করেছে। উপভোগ করছি, আলোর ছন্দে ছন্দে রং বদলানোর দৃশ্যপট। ভাবছি, আঠারো শতকে সেতু প্রকৌশল ও প্রযুক্তি জ্ঞানের কথা। দেড় শ বছর আগে কিভাবে নকশা প্রনয়ণ করে, নাটবল্টু ছাড়াই ব্রিজ নির্মাণ করল? সত্যি, ইংরেজরা শুধু ভারতবর্ষ নয় পুরো পৃথিবী শাসন করতো বুদ্ধির জোরে। পথচারীদের দেখে মনে হচ্ছে, ব্রিজের ওপর দিয়ে নির্বাচনী মিছিল যাচ্ছে। মানুষের এমন চলন্ত স্রোত কখনো চোখে পড়েনি। দৈনিক ৮০,০০০ যানবাহন ও প্রায় ১০ লাখ পথচারী চলাচল করে।
জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ি
দ্বিতীয় দিন সকালে রওনা হলাম কবি গুরুর জোড়াসাঁকোর বাড়ির উদ্দেশে। বাড়িতে প্রবেশের সময় মনে হচ্ছে ইতিহাসের পুরাতন অধ্যায়ে প্রবেশ করছি। বিশ্বভারতীর গেট পেরিয়ে সবুজ আঙিনা। ২০ রুপির টিকিট কেটে ঢুকে পড়লাম, বিশ্বকবির পদচারণে মুখরিত চোখধাঁধানো লাল বিল্ডিংয়ে। নীলমণি ঠাকুরের ১৭৮৪ খ্রিস্টাব্দে নির্মাণ করা জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ি। বাড়ির সামনে মূর্তি হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন মহর্ষি রবীন্দ্রনাথ। কবি গুরু হাতে বই রেখে সাহিত্য চর্চায় মগ্ন।
বিশ্বকবি ১৮৬১ সালে এ বাড়িতেই জন্মগ্রহণ করে ১৯৪১ সালে মারা যান। কবির স্মৃতি সংরক্ষণে মিউজিয়াম ও রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে বাড়িতে। ভবনটির দ্বিতীয় তলায় জাদুঘর ও সংরক্ষণাগার। সাউন্ড সিস্টেমে অবিরত রবীন্দ্রসংগীত বেজে চলেছে। বিল্ডিংয়ে রয়েছে সারি সারি রুম। প্রধান দর্শনীয় ঘরের নাম রবীন্দ্র প্রয়াণকক্ষ। এ ঘরেই কবি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছিলেন। বিছানাটি ঘেরা রয়েছে কাঠের বেষ্টনীতে। সময় সবাইকে অতীত করে দেয়। হোক সে মহা পরাক্রমশালী বা জ্ঞানী।
ভবনে আর্কাইভ করে রাখা হয়েছে কবি গুরুর লিখার প্রয়োজনীয় উপকরণ। আছে কবির ব্যবহৃত পোশাক ও তার নানা বয়সের ছবি। কবিপত্নী মৃণালিনী দেবীর রান্নার কাজে ব্যবহৃত তৈজসপত্র সংরক্ষণিত আছে যথাযথ ভাবে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বিশ্ব ভ্রমণে গিয়ে ৩০টির অধিক দেশ ভ্রমণ করেছিলেন। কবির ভ্রমণকালীন স্মৃতি সংরক্ষণের জন্য রয়েছে সংগ্রহশালা। গ্যালারিতে প্রদর্শিত আছে কবির আগের কয়েক প্রজন্মের শিল্পকলা ও সাহিত্য। শিল্পাচার্য অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের চিত্রকর্ম, তৈলচিত্র, ল্যান্ডস্ক্যাপ দেখে মুগ্ধ হয়ে যাচ্ছি। এ বাড়িতেই কবি তার সাহিত্যের উন্মেষ ঘটিয়েছিলেন। ১৯১৩ সালে কবি নোবেল পুরস্কারে ভুষিত হয়েছিলেন। সব শেষে সিঁড়ির পাশের রুমে চোখে পড়ল বিশ্বকবির বংশতালিকার ওয়ালমেট।
ভবনের তত্ত্বাবধায়ককে জিজ্ঞেস করলাম, দাদা একটা ছবি নেওয়া যাবে? উনি বললেন, জাদুঘরের ভেতরে ফটোগ্রাফি নিষিদ্ধ কিন্তু বাইরে অনুমোদিত। আমি ছবি নিলে কর্তৃপক্ষ তার চাকরিটা নিয়ে নেবে।
পরদিন সকালে কলকাতা থেকে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হলাম। ফিরতি পথে ভাবছি, এক সময় দুই বাংলার মানুষের দেখা করতে ভিসা পাসপোর্ট লাগত না। দেশভাগের সময় ব্রিটিশরা রাজনীতির কূটখেলায় অবিভক্ত বাংলাকে বিভক্ত করে দিয়ে গেছেন। দুই বাংলায় চির বিভাজন সৃষ্টি হলো। হয়তো দুই বাংলার বিভাজনের দেওয়াল আর ভাঙবে না কখনো। দুই বাংলা পরস্পরের সংস্কৃতি থেকে বঞ্চিত হবে চিরকাল। এটি হয়তো দেশ বিভাজনের সময় তলিয়ে দেখেনি বাঙালি। হয়তো দেখার মতো চোখও তখন তাদের ছিল না।