বাবার শূন্যতা, সন্তানের কান্না আর মায়ের আকুতি
‘মা, আব্বারে মোবাইল দিয়া কও, জলদি আইতে। কতদিন ধইরা দেখি না, একসাথে ভাতও খাই না।’—এই কথা বলেই কান্নায় ভেঙে পড়ে শিমু আখঞ্জী। বাবার জন্য তার আকুতি থেমে থাকে না। ছোট ভাই সামী আর আড়াই বছরের ছোট বোন সোহাও সারাক্ষণ বাবাকে খোঁজে। অবুঝ শিশুটিরা বুঝে না, তাদের বাবা, সাংবাদিক সোহেল আখঞ্জী, এখন আর নেই। তিনি শহীদ হয়েছেন ২০২৪ সালের জুলাই মাসের গণ-অভ্যুত্থানে। এক বছর পেরিয়ে গেলেও বাবার ফিরে আসা নিয়ে শিশুদের মনে আশার সুর।
চারদিকে স্বজনহীনতা, অভাব আর শোকের আবহ। এ যেন এক প্রান্তিক পরিবারের নিঃশব্দ যন্ত্রণা। শিশুদের প্রশ্নের জবাব দিতে না পেরে নীরবে চোখ মুছেন মা মৌসুমী আক্তার। সন্তানদের ভবিষ্যতের কথা ভেবে আতঙ্কে দিন কাটে তার।
সাংবাদিকতা করতে গিয়ে শহীদ
গত বছরের ৫ আগস্ট। হবিগঞ্জের বানিয়াচং উপজেলায় কোটাবিরোধী ছাত্র ও নাগরিক আন্দোলনে উত্তাল হয়ে ওঠে সকালটা। আন্দোলনকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ শুরু হলে, তা ধারণ করতে এগিয়ে যান স্থানীয় দৈনিক ‘লোকালয় বার্তা’র স্টাফ রিপোর্টার সোহেল আখঞ্জী। তখনই বানিয়াচং থানা সংলগ্ন এলাকায় পুলিশের গুলিতে গুলিবিদ্ধ হয়ে শহীদ হন তিনি।
শহীদ সোহেল ছিলেন বানিয়াচংয়ের সাগর দিঘির পূর্বপারের মোশাহিদ আখঞ্জীর ছেলে। বয়স হয়েছিল ৪৩ বছর। সাংবাদিকতায় যোগ দেওয়ার আগে তিনি সৌদি আরব ও কাতারে ছিলেন কর্মসূত্রে। দেশে ফিরে ২০১৯ সালে সাংবাদিকতা শুরু করেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গণ-অভ্যুত্থান ঘিরে খবর ও ভিডিও প্রচারে ছিলেন সক্রিয়। মৃত্যুর আগের মুহূর্তেও সংগ্রামে অংশ নেওয়া মানুষদের দৃশ্য ক্যামেরাবন্দি করছিলেন।
স্বামীর হত্যার বিচার চান মৌসুমী
শহীদ সোহেলের স্ত্রী মৌসুমী আক্তার জানালেন, ছোটবেলায় মানসিক সমস্যার কারণে সোহেলের মা অন্যত্র চলে যান। বাবাও এখন আর নেই। ফলে শহীদ হওয়ার পর পরিবারটি হয়ে পড়ে নিঃসঙ্গ। সরকার ও ‘জুলাই ফাউন্ডেশন’ থেকে ৫ লাখ টাকা নগদ ও ১০ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র, সাংবাদিক কল্যাণ ট্রাস্ট ও কয়েকটি রাজনৈতিক সংগঠন থেকে কিছু আর্থিক সহায়তা পেলেও সেটি দিয়ে মূলত ঋণ শোধ ও একটি ঘর নির্মাণ করেছেন তিনি।
বর্তমানে তিন সন্তানকে নিয়ে কষ্টে দিন চলছে তাঁর। বড় মেয়ে শিমু পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ে, ছেলে সামী প্লেগ্রুপে আর ছোট মেয়ে সোহার বয়স আড়াই বছর। সোহেল মারা যাওয়ার সময় সোহার বয়স ছিল মাত্র দেড় বছর।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে মৌসুমী বলেন, ‘এক বছর হয়ে গেল, এখনো স্বামী হত্যার বিচার পাইনি। যারা আমাকে বিধবা করেছে, আমার সন্তানদের “বাবা” ডাকার অধিকার কেড়ে নিয়েছে, তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।’
সরকারি সহায়তা চাইলেন মৌসুমী
সরকারের প্রতি অনুরোধ জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমি লাখাই মুক্তিযোদ্ধা জিয়া কলেজ থেকে বিএ পাস করেছি। যদি যোগ্যতা অনুযায়ী সরকার কোনো চাকরি দিত, তাহলে সন্তানদের নিয়ে অন্তত বেঁচে থাকতে পারতাম। আর যদি আমার সন্তানদের পড়ালেখার দায়িত্ব সরকার নিত, সেটাই হতো সবচেয়ে বড় সহায়তা।’
তদন্তে অগ্রগতি দাবি পুলিশের বানিয়াচং থানার ওসি গোলাম মোস্তফা জানিয়েছেন, সোহেল আখঞ্জী হত্যা মামলার কয়েকজন আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বাকিদের ধরতে অভিযান চলছে। তবে পরিবার বলছে, এখনো বিচার প্রক্রিয়ায় দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি নেই।
একজন সৎ ও সংগ্রামী সাংবাদিককে হারানোর শোক এখনও ভারি স্থানীয় সাংবাদিক মহলে সোহেল আখঞ্জী ছিলেন সৎ, নির্ভীক ও দায়িত্বশীল। গণআন্দোলনের পক্ষে দাঁড়ানো একজন সাংবাদিক হিসেবে তাঁকে মনে রাখছেন সহকর্মীরা। তার সাহসিকতা এবং মানুষের পক্ষে লেখার দৃঢ়তা তাকে শহীদের মর্যাদা এনে দিয়েছে।
শিশু সোহা আজো জানে না, কেন তার বাবা ফিরে আসেন না। বাবার মুখ মনে করতে গিয়ে আয়নায় তাকিয়ে থাকে সে—হয়তো বাবাকে খুঁজে পেতে চায় নিজের চোখেই।
একজন নিরীহ সাংবাদিকের মৃত্যুর পর এক নিঃস্ব পরিবার শুধু আর্থিক অনিশ্চয়তায় নয়, বিচারহীনতার ভারও বয়ে বেড়াচ্ছে। শহীদ সোহেল আখঞ্জীর জন্য সুবিচার ও তাঁর পরিবারের পাশে সমাজ ও রাষ্ট্রের দাঁড়ানো এখন সময়ের দাবি।








