শিকারি পাখি সাপচুর
মেঘের রাজ্য রাঙামাটির সাজেক থেকে মারিশ্যা পৌঁছে কাসালং নদীর সুস্বাদু মাছ দিয়ে দুপুরের খাবার সারলাম। এরপর বড় একটি ইঞ্জিন নৌকায় রাঙামাটির বিখ্যাত পাবলাখালী বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের দিকে রওনা হলাম। কাসালং নদী থেকে আমাদের নৌকা কাপ্তাই হ্রদ দিয়ে পাবলাখালীর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। কাপ্তাই হ্রদের দুই পারের নয়ানাভিরাম দৃশ্য দেখতে দেখতে বিকেল ৩টা নাগাদ পাবলাখালী বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যে পৌঁছলাম।
কথা ছিল, ওখানকার বন বিভাগের অতিথিশালায় রাত্রি যাপন করব। কিন্তু সন্ত্রাসী ও বুনো হাতির সম্ভাব্য আক্রমণের আশঙ্কা দেখিয়ে বন বিভাগ ওখানে থাকতে দিল না। বাধ্য হয়ে লংগদু উপজেলার মাইনিমুখ বাজারে রাত্রি যাপন করতে হলো। বিকেলে পৌঁছার কারণে পাবলাখালী অভয়ারণ্য ভালোভাবে দেখতে পারিনি।
ওখানে ঘোরাঘুরির জন্য মাত্র ঘণ্টাখানেক সময় দেওয়া হলো। ফলে বনের ভেতর আর প্রবেশ করা হলো না। আশপাশটা ঘুরে দু-চারটি পাখি ও প্রজাপতির ছবি তুলে বেশ বড় একটি খালের পারে এসে দাঁড়ালাম। খালপারে বড় বড় পুরনো গাছ।
ওপরে তাকিয়ে দেখি গাছের ডালে একটি শিকারি পাখি বসে আছে। তার দৃষ্টি নিচে খালের পানির দিকে। একটুও নড়াচড়া করছে না। দ্রুত কয়েকটি ছবি তুলে নিলাম। আচমকা পাখিটি নিচের দিকে ডাইভ দিয়ে খাল থেকে একটি সাপ তুলে ধারালো নখে গেঁথে সোজা সামনের দিকে উড়ে গেল।
ঘটনার আকস্মিকতায় ক্যামেরায় ক্লিক করা হয় না। ফলে সাপসহ পাখিটির উড়ন্ত ছবি তোলা হলো না। মন খারাপ করে মাইনিমুখ যেতে আবারও নৌকায় উঠলাম। ২৮ সেপ্টেম্বর ২০১৫-এর ঘটনা এটি।
এরপর পাখিটিকে আরো অনেক জায়গায় দেখেছি। মৌলভীবাজারের লাউয়াছড়ায়, হবিগঞ্জের সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানে, ভোলার চর কুকরি-মুকরিতে। তবে সবচেয়ে বেশি দেখেছি সুন্দরবনের বিভিন্ন স্থানে। এ পর্যন্ত যতবার সুন্দরবন গিয়েছি ততবার ওর দেখা পেয়েছি। সর্বশেষ পাখিটির দেখা পেলাম সুন্দরবনের কোকিলমনির ক্ষেতখেরা বা আগুনজ্বলা খাল, আন্ধারমানিকের পক্ষীর খাল, তাম্বুলবনিয়া খাল এবং করমজল ইকোট্যুরিজম কেন্দ্রে। করমজলের পাখিটি ছিল একেবারে অল্পবয়স্ক।
রাঙামাটির পাবলাখালী বা সুন্দরবনের এই শিকারি পাখি এ দেশে বহুল দৃশ্যমান আবাসিক পাখি সাপচুর। এ ছাড়া পাখিটি সাপখাওরি, সাপখেকো বাজ, তিলা ইগল, দুম্বা ইগল বা হাদাল ইগল নামেও পরিচিত। পশ্চিমবঙ্গে ওর নাম তিলাজ বাজ। ইংরেজি নাম Crested Serpent-eagle বা Serpent Eagle। অ্যাক্সিপিট্রিডি গোত্রের পাখিটির বৈজ্ঞানিক নাম Spilornis cheela (স্পিলরনিস চিল)। পাখিটির বৈশ্বিক বিস্তৃতি এশিয়া মহাদেশে সীমাবদ্ধ। বাংলাদেশ ছাড়াও দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশের আবাসিক পাখি এটি।
প্রাপ্তবয়স্ক সাপচুরের দৈর্ঘ্য ৫০ থেকে ৭৫ সেন্টিমিটার, প্রসারিত ডানা ১২৩ থেকে ১৫৫ সেন্টিমিটার আর ওজন ৪২০ থেকে এক হাজার ৮০০ গ্রাম। পাখিটির মাথা বড়। মাথার পেছনের সাদাটে-বাদামি ফুটকি বা তিলযুক্ত কালচে-বাদামি খোঁপা কেবল খাড়া করলেই চোখে পড়ে। বুক, বগল ও পেট লালচে-বাদামি, তাতে সাদা তিল আছে। ডানা ও লেজ চওড়া এবং গোলাকার। লেজেও তিল দেখা যায়। মাথার তালু কালো, পিঠ কালচে-বাদামি, লেজের ডগা কালো। ডানার মধ্য ও প্রান্তে পালক এবং লেজে সাদা চওড়া ফিতা রয়েছে। চোখ সোনালি-হলুদ। চঞ্চু কালচে ও পা অনুজ্জ্বল হলুদ। প্রজননকালে চঞ্চুর গোড়ার হলদে পট্টিটি উজ্জ্বলতর হয়। অপ্রাপ্তবয়স্ক পাখির মাথা সাদাটে ও কান-ঢাকনি কালো। কাঁধ-ঢাকনি ও ডানার পালক-ঢাকনির পাড় সাদা। পিঠে থাকে অসংখ্য সাদা তিল। দেহের নিচটা পীতাভ-সাদা। সরু লেজে থাকে কালচে ও সাদা ফিতা।
সাপচুর সুন্দরবনসহ অন্যান্য বনের প্রান্ত ও গ্রামাঞ্চলে বিচরণ করে। গাছের পাতাহীন অংশে বসে থেকে অথবা আকাশে উড়ে শিকার খোঁজে। ডানা গুটিয়ে দ্রুতবেগে নিচে নেমে লম্বা লম্বা নখ দিয়ে সাপ, ব্যাঙ, ইঁদুর ও টিকটিকি ধরে খায়। নির্বিষ দাঁড়াশ সাপ, চিলুসাপ ইত্যাদি প্রিয় খাদ্য। ‘কিই-কিই-কিই…’ শব্দে লম্বা সময় ধরে ডাকে।
ফেব্রুয়ারি থেকে মে প্রজননকাল। প্রতিবছর এরা একই জায়গায় বাসা বানায়। স্ত্রী-পুরুষ মিলেমিশে ভূমির ৬ থেকে ২০ মিটার উঁচুতে গাছের মগডালে সরু ডালপালা দিয়ে ছোট আকারের বাসা তৈরি করে। সবুজ পাতা দিয়ে বাসার গদি সাজায়। স্ত্রী একটিমাত্র সাদা রঙের ডিম পাড়ে এবং একাই ডিমে তা দেয়। ডিম ফোটে ২৭ থেকে ৩৫ দিনে। পুরুষ পাখিটিই বেশির ভাগ সময় খাবার সংগ্রহ করে এবং স্ত্রী ছানাকে খাওয়ায়। প্রায় ২১ দিন বয়সে ছানার গায়ের কোমল পালক ঝরে সত্যিকারের পালক গজায়। ওড়া শিখতে প্রায় দুই মাস সময় লাগে। এর পরও ছানারা আরো কিছুদিন মা-বাবার সঙ্গে থাকে। আয়ুষ্কাল প্রায় ১৩ বছর।






