শাহ মখদুম রূপোশ (রহ.)-এর জীবন ও সমাজসংস্কার
বাংলার ইতিহাসে ইসলাম প্রচার ও সমাজ সংস্কারের ক্ষেত্রে সুফি দরবেশদের অবদান অনস্বীকার্য। তাঁদের আধ্যাত্মিক সাধনা, মানবিকতা, ত্যাগ ও চরিত্র মাধুর্যের মাধ্যমে বাংলার জনজীবনে ইসলামের অনাবিল সৌন্দর্য বিকশিত হয়েছে। এসব মহান সাধকের মধ্যে শাহ মখদুম রূপোশ (রহ.) এক অনন্য নাম। বাগদাদের এক সম্ভ্রান্ত সুফি পরিবারে জন্মগ্রহণ করে তিনি জ্ঞান, সাধনা ও সংগ্রামের দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে বাংলায় আগমন করেন।
দিল্লি ও গৌড় হয়ে রাজশাহী অঞ্চলে তাঁর অবস্থান শুধু একটি ভৌগোলিক যাত্রা নয়, বরং তা ছিল ধর্মীয়, সামাজিক ও নৈতিক পুনর্জাগরণের সূচনা। রাজশাহী অঞ্চলের অত্যাচারী শাসনব্যবস্থার অবসান, মানবিক মূল্যবোধের প্রতিষ্ঠা এবং ইসলামের শান্তিময় আদর্শ প্রচারে শাহ মখদুম রূপোশ (রহ.) যে ভূমিকা পালন করেন, তা বাংলার ইতিহাসে বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। তাঁর জীবন ও কর্ম বিশ্লেষণ করলে ইসলামী সমাজসংস্কারের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত ফুটে ওঠে।
নাম ও জন্ম পরিচয় : শাহ মখদুম (রহ.)-এর প্রকৃত নাম আবদুল কুদ্দুস।
তিনি হিজরি ৬১৫ সালের ২ রজব (১২১৬ খ্রিস্টাব্দ) বাগদাদের এক বিখ্যাত সুফি পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা সায়্যিদ আজাল্লাহ শাহ তৎকালীন সময়ের একজন বিশিষ্ট আলেম ও আধ্যাতিক নেতা হিসেবে বিখ্যাত ছিলেন। তাঁর দাদা হলেন বিশ্বখ্যাত সাধক বড় পীর আব্দুল কাদির জিলানি (রহ.)।
শিক্ষালাভ : শাহ মখদুমের বাল্যকাল কাটে বাগদাদ নগরে।
জ্ঞানচর্চার হাতেখড়ি হয় পিতার কাছে। অল্প বয়সে তিনি কোরআন, হাদিস, ফিকহ, আরবি ভাষা ও ব্যাকরণ, সুফিতত্ত্ব ইত্যাদি বিষয়ে জ্ঞান লাভ করেন। একসময় তাঁর পিতা শাসকদের রোষানলে পড়েন এবং সপরিবারে বাগদাদ ত্যাগ করতে বাধ্য হন। ১২৫৮ সালে তাঁতারিদের হাতে বাগদাদ নগরীর পতন ঘটার আগেই পিতার সঙ্গে শাহ মখদুম বাগদাদ ত্যাগ করে ভারতের দিকে রওনা হন। বাগদাদ ছেড়ে যাওয়ার পর শাহ মখদুমের পরিবার সিন্ধুতে অবস্থান করে।
সেখানে বিখ্যাত সুফি জালাল উদ্দিন শাহ সুরের মাদরাসায় শাহ মখদুম ইসলামের উচ্চতর বিষয়ে পড়াশোনা করেন এবং কাদেরিয়া তরিকার সিদ্ধ পুরুষ পরিণত হন।
বাংলায় আগমন : সিন্ধুতে কিছুদিন আবস্থান করে শাহ মখদুমের পরিবার দিল্লিতে এসে বসবাস শুরু করে। যখন তাঁতারিরা বাগদাদ ধ্বংস করে তখন দিল্লির সম্রাট ছিলেন নাসিরুদ্দিন মাহমুদ (শাসনকাল : ১২৪৬-১২৬৬)। তাঁর শাসনামলে প্রকৃত পক্ষে রাজ্য শাসন করতেন গিয়াসউদ্দিন বলবন (শাসনকাল : ১২৬৬-১২৮৭)।
উভয়ের সঙ্গেই শাহ মখদুমের পরিবারের ভালো সম্পর্ক ছিল। দিল্লিতে বসবাসকালে আজাল্লাহ শাহ তাঁর তিন পুত্র সায়্যিদ আহমাদ আলি তন্নুরি, আবদুল কুদ্দুস শাহ মখদুম এবং সায়্যিদ মনির আহমাদ শাহকে ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে পূর্ব ভারত তথা বাংলাদেশে যাওয়ার নির্দেশ দেন। হালাকু খাঁর মৃত্যুর পর আজাল্লাহ শাহ বাগদাদে ফিরে আসেন এবং তাঁর তিন পুত্র ইসলাম প্রচারে ভারতে থেকে যান। সে সময় বাংলার শাসক ছিলেন তুঘরিল খান। তিনি দিল্লির সুলতানের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেন। বিদ্রোহ দমন করতে বৃদ্ধ বয়সে গিয়াসউদ্দিন বলবন ১২৭৮ সালে বাংলাদেশে আসেন। গিয়াসউদ্দিন বলবনের যুদ্ধযাত্রার সময় শাহ মখদুম, তাঁর অন্য দুই ভাই এবং শতাধিক অনুসারী তাঁদের অনুগামী হয়। গিয়াসউদ্দিন বলবন, তুঘরিল খানকে পরাজিত করে স্বীয় পুত্র বোখরা খানকে সুলতান বানান। বোখরা খান আলেম এবং ধর্ম প্রচারকদের খুব সম্মান করতেন। সেই সূত্রে তাঁর সঙ্গে শাহ মখদুমের গভীর সম্পর্ক তৈরি হয় এবং তিনি গৌড়ে বসবাস শুরু করেন।
রাজশাহীতে শাহ মুখদুম : ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে শাহ মখদুম রূপোশ গৌড় অঞ্চল থেকে দক্ষিণ দিকে যাত্রা শুরু করেন। নৌপথে তিনি নোয়াখালীতে পৌঁছেন। নোয়াখালীর সোনাইমুড়ী থেকে ১০-১২ মাইল দূরে শ্যামপুর নামক গ্রামে অবস্থান করে ধর্ম প্রচারের কাজ শুরু করেন। ১২৮৭ সালে কাঞ্চনপুরে একটি খানকা নির্মাণ করেন। তাঁর অনুপম চরিত্র আর ইসলামের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে অনেক মানুষ ইসলামের ছায়াতলে আসে। এখানে দুই বছর থাকার পর গৌড়ে তাঁর প্রাণপ্রিয় শিষ্য তুরকান শাহর ইন্তেকালের সংবাদ পেয়ে ১২৮৯ সালে কিছু সঙ্গী নিয়ে তিনি গৌড়ের উদ্দেশে যাত্রা করেন। নোয়াখালী থেকে নৌপথে শাহ মখদুম
রূপোশ রাজশাহীর বাঘা উপজেলায় অবতরণ করেন। বাঘায় পদ্মা নদী থেকে দুই কিলোমিটার দূরে তিনি বসতি স্থাপন করেন। রাজশাহী তখন মহাকালগড় নামে পরিচিত ছিল। মহাকালগড় শাসন করতেন তৎকালীন সামন্তরাজ কাপলিক তন্ত্রে বিশ্বাসী দুই ভাই। এই দুই ভাইয়ের অত্যাচারী শাসনব্যবস্থায় জনগণ অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিল। সে সময় এ অঞ্চলে নরবলি দেওয়ার প্রচলন ছিল। জনগণ এই প্রথার বিরুদ্ধেও প্রতিবাদী হয়ে উঠেছিল। সর্বোপরি তাদের প্রশাসনিক ব্যবস্থা যথেষ্ট দুর্বল ছিল। শাহ মখদুম শাসকের এসব দুর্বলতা উপলব্ধি করে যুদ্ধ করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। তিনি একই সঙ্গে নৌবাহিনী, অশ্বারোহী বাহিনী এবং পদাতিক বাহিনীর জন্য লোকবল সংগ্রহ করে প্রশিক্ষণ দিতে শুরু করেন। অল্প সময়ের মধ্যে তাঁর বাহিনী অপরাজেয় শক্তির অধিকারী হয়ে উঠে। সেখানে তিনি একটি ছোট কেল্লাও নির্মাণ করেন। এদিকে শাসকচক্র এসব সংবাদ পেয়ে পাল্টা বাহিনী গঠন করে। ফলে যুদ্ধ অবশ্যম্ভাবী হয়ে ওঠে। শাহ মখদুম রূপোশ রাজশাহী অঞ্চলে অবস্থানকালে দেওরাজদের সঙ্গে তাঁর তিনবার যুদ্ধ সংঘটিত হয়।
প্রথম যুদ্ধ : শাহ মখদুম নৌপথে বাঘা থেকে রাজশাহীতে এলে অশ্বারোহী একটি দল মহাকালগড়ের রাজবাড়ি দেবালয় ঘিরে ফেলে। ফলে ভয়াবহ যুদ্ধ লেগে যায়। উভয় পক্ষে অনেক অশ্বারোহী ছিল। এতে অনেক মানুষ হতাহত হয়। রাজা এবং শাহ মুখদুমের অনেক ঘোড়াও মারা পড়ে। এ জন্য ওই অঞ্চলের নাম ঘোড়ামারা হয়ে যায়। যুদ্ধ শেষে শাহ মখদুম বাঘায় ফিরে যান।
দ্বিতীয় ও তৃতীয় যুদ্ধ : প্রথম যুদ্ধের প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য দেওরাজদ্বয় সৈন্য সংগ্রহ করতে শুরু করে। তারা নিজ ধর্মবিশ্বাসীদের শাহ মখদুমের বিরুদ্ধে খেপিয়ে তোলে। এই খবর শাহ মখদুম জানতে পেরে তিনিও সেনা প্রস্তুত করেন, বিশেষত শাসকদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ শ্রেণিকে এক কাতারে নিয়ে আসেন। এই বৃহৎ সম্মিলিত বাহিনী দলে দলে ভাগ হয়ে দেওরাজের ওপর আক্রমণ করে শাহ মখদুম জয়লাভ করেন। সামন্ত শাসকরা রাজ্য ছেড়ে পালিয়ে যায়। যুদ্ধ শেষ করে শাহ মখদুম আবার বাঘায় ফিরে যান। পলাতক রাজা এবং তার অনুসারীরা আবার একত্র হওয়ার চেষ্টা করে এবং নতুন করে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে থাকে। বিজিত রাজ্য দখলে রাখতে শাহ মখদুম মহাকালগড় বা রাজশাহীতে এসে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। কিছুদিন পর সামন্তরাজ সৈন্য নিয়ে ফিরে আসে এবং শাহ মখদুম তাঁর জীবনের তৃতীয় এবং শেষ যুদ্ধে অবতীর্ণ হন। এই যুদ্ধেও দেওরাজদ্বয় তেমন কোনো বীরত্ব দেখাতে পারেনি। আবার তাদের পরাজয় ঘটে। ছয়জন রাজকুমারসহ দুজন রাজভ্রাতা বন্দি হয়। শাহ মখদুম তাদের হত্যা না করে মুক্ত করে দেন এবং আহত রাজকুমারদের নিজের হাতে সেবা করে সুস্থ করেন। শাহ মখদুমের এমন মহানুভবতা দেখে দেওরাজদ্বয় ইসলাম গ্রহণ করে।
মৃত্যু: রাজশাহী অঞ্চলে ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর তিনি সারা দিন ধ্যান আর ইবাদত-বন্দেগিতে মশগুল থাকতেন। একদিন তিনি তাঁর ভক্তদের একত্র করে নসিহত প্রদান করেন এবং একসঙ্গে জোহরের নামাজ আদায় করেন। নামাজ শেষে তিনি তাঁর যোগ্য শিষ্যদের এলাকা ভাগ করে দিয়ে ইসলাম প্রচারের দায়িত্ব প্রদান করেন। আসরের নামাজের পর তিনি তাঁর কবরের স্থান দেখিয়ে দেন। মাগরিবের নামাজ পড়ে তিনি হুজরাখানায় ঢুকে সাদা চাদর দিয়ে আপাদমস্তক ঢেকে ঘুমিয়ে পড়েন। এরপর হুজরা থেকে আর বের না হওয়ায় শিষ্যরা হুজরার ভেতরে গিয়ে নিশ্চিত হন যে উপমহাদেশের শ্রেষ্ঠ সাধক শাহ মখদুম রূপোশ ইন্তেকাল করেছেন। দিনটি ছিল হিজরি ৭১৩ সালের রজব মাসের ২৭ তারিখ (১৩১৩ খ্রিস্টাব্দ)।
শাহ মখদুম রূপোশ (রহ.)-এর সমাজসংস্কার : শাহ মখদুম রূপোশ (রহ.)-এর সমাজসংস্কারের মূল শক্তি ছিল তাঁর নিখুঁত ঈমান, একনিষ্ঠ আমল এবং অনুপম চারিত্রিক মাধুর্য। তাঁর জীবনধারায় প্রস্ফুটিত হতো ইসলামের অনাবিল সৌন্দর্য। তাতে মুগ্ধ হয়েই অনেক মানুষ ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় লাভ করে শোষণমুক্ত শান্তিময় জীবনের সন্ধান পায়। ছয়জন রাজকুমারসহ দুজন রাজভ্রাতা শাহ মখদুমের হাতে বন্দি হলে তিনি তাদের হত্যা না করে মুক্ত করে দেন এবং আহত রাজকুমারদের নিজের হাতে সেবা করে সুস্থ করেন। তাঁর এমন মানবতায় মুগ্ধ হয়ে দেওরাজদ্বয়ও ইসলাম গ্রহণ করে তাঁর ভক্তে পরিণত হয়।
পরিশেষে বলা যায়, শাহ মখদুম রূপোশ (রহ.) ছিলেন একাধারে সুফি সাধক, সমাজ সংস্কারক ও মানবতার দূত। রাজশাহী অঞ্চলে তাঁর আগমন ইসলামের শুধু রাজনৈতিক বা সামরিক বিজয় নয়, বরং তা ছিল হৃদয় জয়ের আন্দোলন। তাঁর জীবন ও কর্ম আজও মানবতা, ন্যায়বিচার ও ধর্মীয় সহনশীলতার এক অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে বিদ্যমান।
তথ্যসূত্র :
১. শাহ মখদুম রূপশ (রহ.), বাংলা পিডিয়া (https://bn.banglapedia.org)
২. বাংলাদেশে ইসলামের অগ্রসেনানী শাহ মাখদুম রূপোশ (রহ.), কমাশিসা https://komashisha.com
৩. মো. আবুল, কাসেম, শাহ মখদুম রূপোশ যুগ মানস (দ্বিতীয় সংস্করণ), শাহ মখদুম রূপোশ দরগা এস্টেট, রাজশাহী।
৪. ডক্টর গোলাম সাকলায়েন, বাংলাদেশের সূফী সাধক, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, বাংলাদেশ।







