বিদায় হজে রাসুল (সা.)-এর ১০ উপদেশ
দশম হিজরির জিলহজ মাসে আরাফাত ময়দানে লক্ষাধিক সাহাবির সামনে রাসুল (সা.) যে ঐতিহাসিক ভাষণ প্রদান করেন, তা ছিল একটি সর্বজনীন মানবিক ঘোষণা, যা কালো, সাদা, আরব, অনারব সব মানুষের জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য। এ ভাষণ শুধু ধর্মীয় নয়, সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও নৈতিকসহ সবদিক থেকেই গুরুত্বপূর্ণ। বিদায় হজের ভাষণে রাসুল (সা.) তার উম্মতের জন্য রেখে যান চিরন্তন কিছু দিকনির্দেশনা, যা যুগে যুগে মুসলমানদের জন্য পথপ্রদর্শক হয়ে থাকবে। তিনি একদিকে যেমন আল্লাহর প্রতি তাকওয়া অবলম্বনের নির্দেশ দেন, তেমনি সুদমুক্ত সমাজ গঠনের আহ্বান জানান। যেমন নারীদের সম্মান ও অধিকার রক্ষার তাগিদ দেন, তেমনি শয়তানের ধোঁকায় না পড়ার ব্যাপারে সতর্ক করেন। এসব উপদেশ শুধু হিজরি দশম শতাব্দীর মানুষের জন্য নয়, আধুনিক সভ্যতাকেও এর মধ্যে খুঁজে নিতে হবে শান্তি, সমতা ও ন্যায়ের মূলমন্ত্র।
বিশে^ যখন জাতিগত বৈষম্য, নারী নিপীড়ন, অর্থনৈতিক বৈষম্য, নৈতিক অবক্ষয় ও ধর্মীয় অশান্তি ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে, তখন বিদায় হজের ভাষণ আজও প্রাসঙ্গিক, প্রয়োজনীয় এবং মানবতার মুক্তির একটি সর্বজনীন রূপরেখা। এ ভাষণ এমন এক আধ্যাত্মিক দলিল, যার প্রতিটি বাক্য, প্রতিটি উপদেশ মানুষকে উন্নত চরিত্র, সততা ও ন্যায়ের পথে চলার শিক্ষা দেয়।
বিদায় হজের ভাষণ থেকে নির্বাচিত ১০টি গুরুত্বপূর্ণ উপদেশ উল্লেখ করা হলো, যা কোরআন ও হাদিসের আলোকে প্রতিটি মুসলমানের জীবন পরিচালনার জন্য অপরিহার্য দিকনির্দেশনা প্রদান করে।
তাকওয়া : রাসুল (সা.) ভাষণের শুরুতে আল্লাহর প্রশংসা করেন এবং তাকওয়ার (আল্লাহভীতি) গুরুত্ব তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘হে মানুষ! তোমাদের প্রভুর প্রতি তাকওয়া অবলম্বন করো, যিনি তোমাদের একটি প্রাণ থেকে সৃষ্টি করেছেন।’ (সহিহ বুখারি)
জাতিগত অহংকারের অবসান : নবীজি (সা.) এই ভাষণে বংশ, ভাষা, জাতি কিংবা বর্ণভিত্তিক সব ধরনের বৈষম্য বাতিল করেছেন। তিনি বলেন, ‘হে মানুষ! তোমাদের প্রভু এক। তোমাদের পিতা এক। কোনো আরবের ওপর অনারবের বা অনারবের ওপর আরবের কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই। কোনো সাদা মানুষের ওপর কালো মানুষের বা কালো মানুষের ওপর সাদা মানুষের কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই, শ্রেষ্ঠত্ব শুধু তাকওয়ার ভিত্তিতে।’ (বায়হাকি)
মানবাধিকার ও সম্মান রক্ষা : মানুষের নিরাপত্তা, সম্পদের নিরাপত্তা এবং ব্যক্তিত্বের সম্মান রক্ষাই একটি আদর্শ সমাজের ভিত্তি। রাসুল (সা.) বলেন, ‘তোমাদের রক্ত, সম্পদ ও সম্মান পরস্পরের জন্য হারাম, যেমন এই দিন (আরাফাতের দিন), এই মাস (জিলহজ) এবং এই শহর (মক্কা) পবিত্র।’ (সহিহ বুখারি)
দায়িত্ব পালনের শিক্ষা : নবীজি (সা.) সেদিন বলেছিলেন, ‘তোমাদের কাছে যা আমানত রাখা হয়েছে, তা আদায় করো।’ আমাদের চাকরি, নেতৃত্ব, সম্পদ কিংবা সম্পর্ক সবকিছুই আমানত। প্রতিটি ক্ষেত্রে দায়িত্বশীলতা ও বিশ^স্ততা মুসলমানের অপরিহার্য গুণ হওয়া উচিত।
নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠা : নারীদের প্রতি সদ্ব্যবহার করা এবং তাদের অধিকার রক্ষার তাগিদ দেওয়া হয়েছে এই ভাষণে। নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘নারীদের সম্পর্কে আল্লাহকে ভয় করো। তিনি নারীর অধিকার রক্ষা, সদ্ব্যবহার এবং দাম্পত্য জীবনে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার নির্দেশ দেন।’ হাদিসে এসেছে, ‘নারীদের ব্যাপারে আমি তোমাদের উপদেশ দিচ্ছি। তাদের প্রতি সদ্ব্যবহার করো। তারা তোমাদের সহচর। তাদের ওপর তোমাদের যে অধিকার আছে, তেমনি তাদেরও তোমাদের ওপর অধিকার আছে।’ (সহিহ মুসলিম) মহান আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা স্ত্রীদের সঙ্গে সদ্ব্যবহার করো।’ (সুরা নিসা ১৯)
সুদ নিষিদ্ধ : বিদায় হজের ভাষণে নবীজি (সা.) সুদের ওপর সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা দেন। রাসুল (সা.) বলেন, ‘জাহেলি যুগের সব সুদ বাতিল করা হলো। প্রথম যে সুদ আমি বাতিল করছি, তা আমার চাচা আব্বাস ইবনে আবদুল মুত্তালিবের সুদ।’ (সহিহ মুসলিম) মহান আল্লাহ বলেন, ‘আল্লাহ ব্যবসা হালাল করেছেন এবং সুদ হারাম করেছেন।’ (সুরা বাকারাহ ২৭৫)
কোরআন ও সুন্নাহ আঁকড়ে ধরা : রাসুল (সা.) জীবনের পথনির্দেশনার জন্য কোরআন ও হাদিসের ওপর অটল থাকার তাগিদ দেন। তিনি বলেন, ‘আমি তোমাদের মধ্যে দুটি জিনিস রেখে যাচ্ছি। যতক্ষণ তোমরা এ দুটির ওপর অটল থাকবে, ততক্ষণ পথভ্রষ্ট হবে না। তা হলো আল্লাহর কিতাব (কোরআন) এবং আমার সুন্নাহ।’ (মুয়াত্তা মালেক)
দ্বীন প্রচার : ইসলামের বার্তা প্রচার করা এবং সৎকর্মে অন্যদের উৎসাহিত করা মুসলমানের দায়িত্ব। রাসুল (সা.) তার ভাষণে বলেন, ‘যারা এখানে উপস্থিত আছে, তারা যেন অনুপস্থিতদের কাছে এই বার্তা পৌঁছে দেয়। কারণ হতে পারে যে বার্তা গ্রহণ করবে, সে এখানে উপস্থিত ব্যক্তির চেয়ে বেশি উপকৃত হবে।’ (সহিহ বুখারি)
শয়তানের ব্যাপারে সতর্কতা : শয়তান মানুষের চিরশত্রু। রাসুলুল্লাহ (সা.) আমাদের সতর্ক করে বলেন, শয়তান মানুষকে বড় গুনাহ দিয়ে ধ্বংস করতে না পারলে ছোট ছোট গুনাহের মাধ্যমে ধীরে ধীরে পতনের পথে নিয়ে যায়। হাদিসে এসেছে, ‘তোমরা গুনাহকে তুচ্ছ করে দেখো না, কেননা ছোট ছোট গুনাহও একত্র হয়ে পাহাড়সম হয়ে যায়।’ (তাবারানি)
জীবনের সব ক্ষেত্রে দিকনির্দেশনা : বিদায় হজের ভাষণ ইসলামের একটি সর্বজনীন সনদ, যা তাকওয়া, সমতা, ন্যায়বিচার, নারীদের অধিকার, সুদমুক্ত জীবন এবং কোরআন ও সুন্নাহর প্রতি আনুগত্যের শিক্ষা দেয়। এই ভাষণে পারিবারিক সম্পর্ক, আর্থিক লেনদেন, শাসনব্যবস্থা, নারী-পুরুষ সম্পর্ক, আখেরাতের প্রস্তুতি সবই আলোচিত হয়েছে।
মহান আল্লাহ আমাদের বিদায় হজের এই ভাষণ থেকে শিক্ষাগ্রহণ করে তা দৈনন্দিন জীবনে বাস্তবায়নের তওফিক দান করুন। আমিন।








