হাওর জনপদের লোক ঐতিহ্য গাজীর গান
‘প্রথমে বন্দনা করি ওই আল্লারও দরবারে, আওয়ালে বাইন্দাছি ভাই রে কোরানেরও বাণী…’-এমন বন্দনার মধ্য দিয়ে সূচনা হয় গাজীর গানের। দেশের লোকসংস্কৃতিতে এই গানের রয়েছে বিশেষ কদর। বৈচিত্র্যময় উপস্থাপনা, সুরের আরোহণ-অবরোহণ আর কথক নাট্যরূপের মিশেলে গাজীর গান আজও মানুষকে মুগ্ধ।
ভাটি অঞ্চলের এ প্রাচীন লোকসসংগীতের ধারাকে হাওর জনপদে বলা হয় গাজীর গান বা গাজীর পালা, যুগ যুগ ধরে যা এখানকার মানুষের প্রাণের খোরাক।
গাজীর গানে সাধারণত দলনেতার সঙ্গে থাকেন ঢোলবাদক, হারমোনিয়াম মাস্টার ও দোহার। দলনেতা আলখাল্লা পরেন, হাতে রাখেন আসা দণ্ড বা জাদুর কাঠি। বাদ্যের তালে তালে গল্প এগিয়ে চলে। পরিবেশনার একপর্যায়ে অনেক বয়াতি গাজী পীরের সঙ্গে চম্পাবতীর বিয়ের কাহিনি তুলে ধরেন।
একসময় হাওরাঞ্চলের বাইরে নোয়াখালী, চট্টগ্রাম ও ফরিদপুরেও গাজীর গানের আসর বসতো। সেই দৃশ্য এখন বিরল। তবে ব্যতিক্রম সুনামগঞ্জের মধ্যনগর উপজেলা। এখানকার লোকবিশ্বাসে গাজীর গান গভীরভাবে প্রোথিত।তাঁদের ধারণা, গাজী পীরের নাম করে মানত করলে মনোবাঞ্ছা পূরণ হয়।
গাজীর গান বহন করে পূঁথিসাহিত্যের সমৃদ্ধ ঐতিহ্য। এতে উঠে আসে নারী–পুরুষের সম্পর্ক, মানবিকতা, জীবনের সুখ–দুঃখসহ নানা প্রসঙ্গ, যা শিশুদের কল্পনাশক্তিও সমৃদ্ধ করে। কিন্তু আধুনিকতার স্রোতে হাওরের এই লোকগান এখন হারিয়ে যাওয়ার উপক্রম। তাই এ ধারাকে বাঁচিয়ে রাখার প্রয়োজন বোধ করছে সচেতন মহল।
হাওরাঞ্চলে গাজীর গানের অন্যতম পরিচিত নাম আব্দুল হাফিজ বয়াতি। সুনামগঞ্জের মধ্যনগর উপজেলার বুড়িপত্তন গ্রামের এই বয়াতি তিন দশক ধরে বহন করছেন লোক সংস্কৃতির এই মশাল। হাফিজের দলে হারমোনিয়ামে রয়েছেন দাতিয়াপাড়া গ্রামের আব্দুল আউয়াল, ঢোলে চামরদানী গ্রামের হাদিস ঢুলী এবং জুড়ি বাইন হিসেবে তাহিরপুরের লামাপাড়া গ্রামের মোশাররফ হোসেন। গাজীর গান তাঁদের কাছে শুধু জীবিকা নয়—বিশ্বাস ও ভালোবাসারও জায়গা।
বয়াতি আব্দুল হাফিজ বলেন,‘ছাত্রজীবন থেকেই গানের প্রতি টান। উস্তাদের সঙ্গে থেকে পালাগান শিখেছি। গাজীর গান মানুষের কথা বলে, মানবিকতার কথা বলে। সারা বছর এই গান গেয়েই আমাদের সংসার চলে। আজীবন এই সঙ্গীতকে বাঁচিয়ে রাখতে চাই।’
গাজীর গান টিকিয়ে রাখতে শিল্পীদের উৎসাহ ও সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা প্রয়োজন বলে মনে করেন পালাকার আব্দুল কুদ্দুস। তাঁর ভাষ্য,‘গাজীর পালা মূলত একটি পুঁথিসাহিত্য। এটি হাওরাঞ্চলের লোকসংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এই ধারাকে ধরে রাখতে হলে বয়াতিদের যথাযথ সম্মান ও সহযোগিতা দিতে হবে।’







