ভাড়াটিয়া বনাম বাড়িওয়ালা

নতুন বছর এলেই শহরের হাজারো ভাড়াটিয়া এক আতংকে ভোগেন। কারণ এই সময়টাতেই বেশিরভাগ বাড়িওয়ালা কোনো পূর্ব ঘোষণা বা সুস্পষ্ট নিয়মনীতি না মেনেই বাড়ি ভাড়া বাড়িয়ে দেন। বাস্তবতা হলো, নতুন বছর এলেও অধিকাংশ ভাড়াটিয়ার আয় বাড়ে না। উল্টো নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি, যাতায়াত খরচ, শিক্ষা ও চিকিৎসা ব্যয়ের চাপ তাদের জীবনকে আরও সংকুচিত করে তোলে। এর মধ্যেই বাড়তি ভাড়ার বোঝা যেন মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা।
ঢাকা শহরের মতো বড় নগরীতে মধ্যবিত্ত ও নি¤œ-মধ্যবিত্ত মানুষের মাসিক আয়ের বড় একটি অংশ চলে যায় বাড়ি ভাড়ায়। অনেক পরিবার আয়ের ৪০ থেকে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত ভাড়ার পেছনে ব্যয় করতে বাধ্য হয়। এমন অবস্থায় হঠাৎ ১০-২০ শতাংশ ভাড়া বৃদ্ধি তাদের জন্য চরম বিপর্যয়ের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ভাড়াটিয়াদের অভিযোগ, ভাড়া বাড়ানোর পেছনে অনেক সময় কোনো যুক্তিসঙ্গত কারণও দেখানো হয় না। না বাড়ির সংস্কার, না নতুন কোনো সুবিধা, শুধু ক্যালেন্ডারের পাতা বদলালেই বাড়ে ভাড়া।
মূল্যস্ফীতির বর্তমান পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা এমনিতেই কঠিন। চাল, ডাল, তেল, সবজি থেকে শুরু করে বিদ্যুৎ, গ্যাস ও পানির বিল সবকিছুর দাম ঊর্ধ্বমুখী। এই চাপ সামলাতে গিয়ে অনেক পরিবার সঞ্চয় ভাঙছে, কেউ আবার প্রয়োজনীয় খরচ কমিয়ে দিচ্ছে। তার ওপর বাড়ি ভাড়া বাড়লে সংসারের ভারসাম্য পুরোপুরি নষ্ট হয়ে যায়।
ফল হিসেবে অনেক ভাড়াটিয়াকে অনিচ্ছা সত্ত্বেও বাসা ছাড়তে হয়, খুঁজতে হয় আরও ছোট বা দূরের বাসা। এতে শিশুদের পড়াশোনা, কর্মজীবী মানুষের যাতায়াত এবং পারিবারিক স্থিতিশীলতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।বাংলাদেশে বাড়ি ভাড়া নিয়ন্ত্রণে আইন থাকলেও বাস্তবে তার প্রয়োগ খুবই সীমিত। অধিকাংশ ভাড়াটিয়া আইনি জটিলতা বা বাড়িওয়ালার সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট হওয়ার ভয়ে মুখ খুলতে চান না। এই নীরবতার সুযোগেই এক শ্রেণির বাড়িওয়ালা নির্বিঘেœ ভাড়া বাড়িয়ে চলেছেন।
নতুন বছরের শুরু তাই অনেক ভাড়াটিয়ার কাছে উৎসব নয়, বরং উদ্বেগ আর অনিশ্চয়তার বার্তা নিয়ে আসে। ভাড়াটিয়াদের স্বার্থ রক্ষায় কার্যকর নীতিমালা বাস্তবায়ন, ভাড়া বৃদ্ধির ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা এবং সামাজিক দায়বদ্ধতা এখন সময়ের দাবি। তা না হলে শহরের সাধারণ মানুষ এই বাড়তি চাপের নিচে আরও চাপে পড়বে, যা সামগ্রিকভাবে নগরজীবনকেই অস্থিতিশীল করে তুলবে।
পূর্ব রামপুরা ঢাকা থেকে, মো. নাসরুল্লাহ সাকিব।





