প্রাচীন স্থাপত্যশিল্পের মনোমুগ্ধকর নিদর্শন মজলিশ আউলিয়া মসজিদ
প্রাচীন স্থাপত্যশিল্পের এক মনোমুগ্ধকর নিদর্শন মজলিশ আউলিয়া খান জামে মসজিদ। এটি ফরিদপুরের ভাঙ্গা উপজেলার আজিমনগর ইউনিয়নের পাতরাইল দিঘিরপাড় গ্রামে অবস্থিত। মসজিদটি দেখতে প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পর্যটকদের ভিড় জমে। বিশেষ করে শুক্রবার জুমার নামাজ পড়তে বিভিন্ন স্থানের লোকজন এই মসজিদে আসেন। জুমার দিন এত বেশি ভিড় হয় যে, মসজিদ এবং মসজিদের সামনের আঙিনা ভরে যায়।
তবে স্থানীয়দের অভিমত, প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ উদ্যোগী হলে এবং প্রয়োজনীয় সংস্কার ও মসজিদ সংলগ্ন এলাকা ঘিরে সৌন্দর্য বর্ধন কাজ করা গেলে পর্যটকদের উপচে পড়া ভিড় আরো বাড়বে।
ঢাকা-খুলনা মহাসড়কের ভাঙ্গা উপজেলার পুলিয়া বাসস্ট্যান্ড থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার দক্ষিণে মসজিদটি অবস্থিত। যে কেউ অটো ভ্যানে মসজিদটি দেখতে আসতে পারেন।
মসজিদ তৈরির ইতিহাস থেকে জানা যায়, ১৩৯৩ থেকে ১৪১০ খ্রিষ্টাব্দে বাংলার সুলতান গিয়াস উদ্দিন আজম শাহের আমলে মসজিদটি নির্মাণ করেন মজলিশ আব্দুল্লাহ খান আউলিয়া। স্থানীয়ভাবে এটি ‘মজলিশ আউলিয়া মসজিদ’ নামেই পরিচিত।
মসজিদটি সম্পর্কে জানা যায়, এটি রাজশাহীর বাঘা মসজিদের নির্মাণশৈলীর আদলে ১০টি গম্বুজবিশিষ্ট। এর অভ্যন্তরে পূর্ব দিক থেকে পাঁচটি দরজার মাধ্যমে প্রবেশ করা যায়।
স্বতন্ত্রভাবে দণ্ডায়মান চারটি পাথরের স্তম্ভে গঠিত একটি স্তম্ভ সারি মসজিদের ভেতর দুটি ‘আইল’-এ বিভক্ত করেছে। উত্তর ও পশ্চিম দেয়ালে দুটি করে দরজা রয়েছে। মসজিদের দেয়াল প্রায় দুই মিটার পুরু এবং ভেতরের পরিমাপ ২১.৭৯ মিটার ও ৮.৬০ মিটার। পূর্ব দেয়ালের পাঁচটি দরজা বরাবর পশ্চিম দেয়ালের অভ্যন্তরে পাঁচটি মিহরাব রয়েছে। কেন্দ্রীয় প্রবেশপথের দুই খিলানের মধ্যবর্তী অংশ চৌচালা ভল্ট সদৃশ, অন্যদিকে পার্শ্ববর্তী দরজার সংশ্লিষ্ট অংশ দোচালা ভল্ট সদৃশ।
মসজিদটির নকশায় পোড়ামাটির অলংকার এবং দেয়ালের গায়ে আঙুর লতার মতো নকশা অঙ্কিত।
এই মসজিদটির সঙ্গে রাজশাহীর ‘বাঘা মসজিদ’-এর যথেষ্ট মিল রয়েছে। এই শৈলীগত সাদৃশ্যের জন্য মসজিদটিকে ‘হোসেন শাহী ইমারত’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ। মসজিদটি সাবেক প্রেসিডেন্ট হোসাইন মুহাম্মদ এরশাদের শাসন আমলে প্রথমবারের মতো সংস্কার করা হয়েছিল।
ঐতিহাসিক মসজিদের দক্ষিণ পাশে চির নিন্দ্রায় শায়িত আছেন আউলিয়া মজলিস আব্দুল্লাহ খান। মসজিদের সামনেই রয়েছে মজলিস আউলিয়া আব্দুল্লাহ খানের মাজার। এ ছাড়াও দুটি মাজার রয়েছে। মসজিদের সামনে মস্তান দরবেশ নাজিমউদ্দিন দেওয়ানের মাজার, মসজিদের দক্ষিণ পাশে ফকির ছলিমদ্দিন দেওয়ানের মাজার।
স্থানীয় জনসাধারণের পানীয় জলের সমস্যা নিরসন ও ইবাদতের জন্য মসজিদটির পাশেই ৩২.১৫ একর জমির ওপরে একটি দিঘি ওই সময় খনন করা হয়। মসজিদের সামনের বিশাল এই দিঘিটির কারণে কাগজে-কলমে এলাকার নাম পাথরাইল থাকলেও, ক্রমান্বয়ে এলাকাটির নাম জনশ্রুতিতে ‘দিঘিরপাড়’ নামেই সুপরিচিত হয়ে আছে। তবে দিঘির আকার আর সেরকম নেই। ভরাট হয়ে গেছে বড় একটি অংশ। পাকিস্তান আমলে বিশাল দিঘির একটি অংশ কেটে জনসাধারণের পানীয় জলের সমস্যা দূর করা হয়।
মজলিস আউলিয়া মসজিদের ইমাম ও খতিব হাফেজ মাওলানা মুফতি মোহাম্মদ শিব্বির আহমেদ জানান, মসজিদের ভেতরের মেহরাবের কিছু অংশ সংস্কার করতে হবে। এ ছাড়া মসজিদে এয়ারকুলার স্থাপন করলে দূরের পর্যটক ও মুসল্লিদের জন্য নামাজ পড়া সুবিধাজনক হবে।
তিনি জানান, এখানে প্রতি জুম্মার দিন হাজার হাজার দর্শনার্থীর আগমন ঘটে। তারা ঐতিহাসিক মসজিদটি ঘুরে দেখেন এবং নামাজ পড়েন। তাদের নামাজের জন্য মসজিদের সামনের আরো কিছু জায়গা ভরাট করে নামাজ পড়ার উপযোগী করা দরকার। যে জায়গা আছে, তাতে সংকুলান হয় না।
স্থানীয় বাসিন্দা আউয়াল মাতুব্বর জানান, মসজিদের এলাকায় একটি টিমের ছাপরা ঘরে মাদরাসা রয়েছে। মাদরাসাটি মসজিদের সামনে দিঘির পাড়ে স্থাপন করলে মসজিদের সামনের এলাকার জায়গা আরো বাড়ত। ফলে শুক্রবার মুসল্লিদের নামাজ পড়ার জায়গার অভাব দূর হতো। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, মসজিদটি এই অঞ্চলের গৌরব। মসজিদের ফ্লোরে টাইলস স্থাপন করলে আমাদের জন্য নামাজ পড়তে সুবিধা হতো।
স্থানীয় বাসিন্দা কুদ্দুস মাতুব্বর জানান, দূরের ভ্রমণ পিপাসু মানুষদের জন্য আমাদের এখানে নতুন একটি গোসলখানা এবং অজুখানা স্থাপন করা হয়েছে। দিঘির পাড়ে বেঞ্চ তৈরি করা হলে, পর্যটকরা এখানে এসে বিশ্রাম নিতে পারতো। এখানে একটি বিশ্রামাগার স্থাপন করা জরুরি।
স্থানীয় ধার্মিক মুসলিমরা এই মসজিদে নামাজ পড়েন। তারা জানান, মসজিদের সামনের অংশে স্টিলের বাউন্ডারি দেওয়া হয়েছে। তবে মসজিদের ছাদের কয়েক জায়গা থেকে ফোঁটা ফোঁটা পানি পরে। পানি যাতে না পড়তে পারে সে জন্য মেরামত ও সংস্কার দরকার। মসজিদকে ঘিরে এখানে একটি প্রজেক্ট হাতে নিলে পর্যটকদের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু হতে পারে।







