আনন্দময় রঙিন রঙে রঙিন বাদ্যে মুখর বৈসাবি
পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রাণের বৈসাবিকে ঘিরে খাগড়াছড়িতে শুরু হয়েছে আনন্দময় রঙিন উৎসব। পার্বত্য জেলা পরিষদের তিন দিনব্যাপী আয়োজনের প্রথম দিনে গতকাল মঙ্গলবার সকালে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রার মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানমালার সূচনা হয়, যা রঙে-রূপে মুখর করে তোলে পুরো শহর।
পার্বত্য জেলা পরিষদ প্রাঙ্গণ থেকে কবুতর ও বেলুন উড়িয়ে শোভাযাত্রার উদ্বোধন করেন পরিষদের চেয়ারম্যান শেফালিকা ত্রিপুরা। এ সময় উপস্থিত ছিলেন পরিষদের মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা মো. নোমান হোসেন, স্থানীয় সরকার বিভাগের উপপরিচালক সাজিয়া তাহের, নির্বাহী কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ আল মাহফুজ এবং অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সাহাদাত হোসেনসহ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।
শোভাযাত্রাটি শহরের প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে টাউন হল প্রাঙ্গণে গিয়ে শেষ হয়। এতে অংশ নেন সব বয়সী হাজারো পাহাড়ি ও বাঙালি নারী-পুরুষ। রঙিন ঐতিহ্যবাহী পোশাক, বৈচিত্র্যময় অলংকার এবং নিজস্ব বাদ্যযন্ত্রের তালে তালে আয়োজনজুড়ে তৈরি হয় অনন্য সাংস্কৃতিক মেলবন্ধন। শোভাযাত্রায় চাকমা, মারমা ও ত্রিপুরা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতি জীবন্ত হয়ে ওঠে।
ছিল নৃত্য-গীত, বর্ণিল সাজসজ্জা এবং ত্রিপুরাদের গরয়া, মারমা সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যবাহী পানি খেলার মনোমুগ্ধকর প্রদর্শনী ও চাকমা নৃত্যশিল্প। বিকেলে দ্বিতীয় পর্বে অনুষ্ঠিত হয় পাজন রান্না প্রতিযোগিতা এবং চাকমা, মারমা ও ত্রিপুরাদের ঐতিহ্যবাহী কোমর তাঁত প্রদর্শনী, যা দর্শনার্থীদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ সৃষ্টি করে। আজ বুধবার রয়েছে চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা, আলোচনাসভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। সমাপনী দিন অনুষ্ঠিত হবে আলোচনাসভা ও পুরস্কার বিতরণী।
জেলা পরিষদের নির্বাহী কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ আল মাহফুজ বলেন, ‘বৈসাবি মূলত ত্রিপুরাদের বৈসু, মারমাদের সাংগ্রাই এবং চাকমাদের বিজুর সম্মিলিত রূপ। এটি আমাদের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও সম্প্রীতির প্রতীক।’ তিনি জানান, এবারের আয়োজনে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে দিনব্যাপী নানা কর্মসূচি রাখা হয়েছে।
জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান শেফালিকা ত্রিপুরা বলেন, ‘এই উৎসব আমাদের সাংস্কৃতিক পরিচয় বহন করে। সব সম্প্রদায়ের অংশগ্রহণে এটি মিলনমেলায় পরিণত হয়, যা সম্প্রীতির বন্ধন আরো সুদৃঢ় করে।
মাহা সাংগ্রাই উদযাপন কমিটির সদস্যসচিব নিয়ং মারমা বলেন, ‘সাংগ্রাই আনন্দ, পরিশুদ্ধি ও নতুন বছরের সূচনার প্রতীক। পানি খেলার মাধ্যমে পুরনো বছরের সব ক্লান্তি ধুয়ে ফেলে নতুন বছরকে স্বাগত জানানো হয়।’
এদিকে ১০ এপ্রিল থেকে শুরু হবে মারমা সম্প্রদায়ের ছয় দিনব্যাপী সাংগ্রাই উৎসব। এ উপলক্ষে থাকবে নানা অনুষ্ঠান, সাংস্কৃতিক পরিবেশনা, ঐতিহ্যবাহী খেলাধুলা, সাংগ্রাই স্নান, পানি উৎসব ‘রি-আকাজা’ এবং বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা।
১২ এপ্রিল থেকে চাকমা সম্প্রদায়ের বিজু উৎসব শুরু হবে নদীতে ফুল ভাসানোসহ বিভিন্ন ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে। ১৩ এপ্রিল থেকে ত্রিপুরাদের বৈসুতে থাকবে ফুল ভাসানো, গরয়া নৃত্যসহ নানা আয়োজন। সপ্তাহজুড়ে চলবে ঐতিহ্যবাহী খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।
এবার পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সংক্ষিপ্ত নাম ‘বৈসাবি’ ব্যবহার না করে পৃথকভাবে বৈসু, সাংগ্রাই, বিজু, পাতা, চৈত্রসংক্রান্তি ও বাংলা নববর্ষ নামে উৎসবগুলো পালনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
উৎসবকে ঘিরে খাগড়াছড়ি শহরজুড়ে বিরাজ করছে আনন্দঘন পরিবেশ। পাহাড়ি জনপদের বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও সম্প্রীতির এই মিলনমেলা প্রতিবছরের মতো এবারও সবার মধ্যে ছড়িয়ে দিচ্ছে উৎসবের রঙিন আবহ।







