আজ অ্যান্টিক বা পুরাকীর্তি দিবস
ঝুম বৃষ্টির এক দুপুরে বাড়ির অন্ধকার চিলেকোঠার এক কোণে ধুলোবালি মাখা একটি পুরনো কাঠের সিন্দুক খুঁজে পেলেন। মরচে ধরা তালাটি ভাঙতেই ভেতর থেকে বেরিয়ে এলো হলদে হয়ে যাওয়া কিছু চিঠি, একটি পিতলের চশমা কিংবা নকশা করা প্রাচীন কোনো পানের বাটা। সেই মুহূর্তে আপনি কিন্তু কেবল একটি বস্তুকে স্পর্শ করছেন না, বরং আপনি স্পর্শ করছেন কয়েক দশক আগের আস্ত একটি সময়কে। সময়ের প্রবাহে যা কিছু হারিয়ে যাওয়ার কথা ছিল, তাকে সযত্নে আগলে রাখার নামই হলো অ্যান্টিক। আজ ৯ এপ্রিল, বিশ্বজুড়ে পালন করা হচ্ছে অ্যান্টিক বা পুরাকীর্তি দিবস। এই দিনটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, নতুনের জোয়ারে গা ভাসানোই সব নয়, বরং যা কিছু পুরনো, যা কিছু ইতিহাসকে সাক্ষী করে বেঁচে আছে, তার কদর করাটাও এক দারুণ শৈল্পিক গুণ।
শতবর্ষের আভিজাত্য আর সংজ্ঞার মারপ্যাঁচ
অ্যান্টিক বা পুরাকীর্তি শব্দটির আভিধানিক অর্থ বেশ গভীর হলেও সংগ্রাহক ও বিশেষজ্ঞদের ভাষায় এর একটি নির্দিষ্ট মানদণ্ড রয়েছে। সাধারণত অন্তত ১০০ বছরের পুরনো কোনো মূল্যবান বা দুষ্প্রাপ্য বস্তুকে আমরা অ্যান্টিক হিসেবে গণ্য করি। তবে এই সংজ্ঞার পেছনে কেবল বয়সের ভার নেই, আছে সেই সময়ের কারুকার্য আর ঐতিহ্যের ছোঁয়া। মানুষ কেন এই ধুলো জমা জিনিসের প্রেমে পড়ে, তার উত্তর হয়তো কেবল যুক্তি দিয়ে দেওয়া সম্ভব নয়। এটি অনেকটা স্মৃতির সিন্দুকে ডুব দেওয়ার মতো এক রোমাঞ্চকর অভিযান। বিশ্বের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা সংগ্রাহকরা আজকের দিনটিকে বেছে নেন তাদের ব্যক্তিগত সংগ্রহশালা পরিষ্কার করতে কিংবা নতুন কোনো দুষ্প্রাপ্য নিদর্শনের খোঁজে বের হতে। এই দিবসটি পালনের মূল উদ্দেশ্য হলো ইতিহাসের সেইসব অবশিষ্টাংশকে বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা করা, যা আমাদের বর্তমান জীবনধারাকে সমৃদ্ধ করে।
জ জড়বস্তুর আড়ালে লুকিয়ে থাকা প্রাণ ও স্পন্দন
পুরাকীর্তি সংগ্রহের নেশা অনেক সময় সাধারণ মানুষের কাছে স্রেফ বিলাসিতা মনে হতে পারে, কিন্তু এর পেছনে রয়েছে ইতিহাসের এক বিশাল ক্যানভাস। একটি পুরনো পকেট ঘড়ি কিংবা সেকেলে টাইপরাইটারের দিকে তাকালে নিবিড়ভাবে অনুভব করা যায় সেই সময়ের মানুষের জীবন কতটা মন্থর অথচ শৈল্পিক ছিল। যারা এই নেশায় বুঁদ হয়ে থাকেন, তারা প্রতিটি জিনিসের মধ্যে এক ধরনের স্পন্দন খুঁজে পান। আজকের এই যান্ত্রিক যুগে যেখানে সবকিছুই প্লাস্টিকের বা কৃত্রিম, সেখানে হাতে তৈরি কাঠের কোনো প্রাচীন আসবাব বা হাতে আঁকা কোনো তৈলচিত্র আমাদের শিকড়ের কথা মনে করিয়ে দেয়। অ্যান্টিক সংগ্রাহকরা বিশ্বাস করেন, প্রতিটি পুরনো জিনিসের নিজস্ব একটি আত্মা থাকে এবং তারা যখন সেই বস্তুটি সংগ্রহ করেন, তখন তারা আসলে ইতিহাসের একটি জীবন্ত খণ্ডকে নিজেদের জীবনের অংশ করে নেন।
ঐতিহ্যের সংরক্ষণ ও বর্তমানের দায়বদ্ধতা
অ্যান্টিক বা পুরাকীর্তি কেবল ব্যক্তিগত শখের বিষয় নয়, এটি বিশ্ব অর্থনীতির একটি বড় অংশ এবং জাতীয় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের এক শক্তিশালী ধারক। সারাবিশ্বে নামী-দামী নিলাম ঘরগুলোতে কয়েকশ বছরের পুরনো জিনিসের মূল্য কখনো কখনো কয়েক মিলিয়ন ডলারে গিয়ে ঠেকে। তবে মুদ্রার এ পিঠের বাইরেও আছে এর এক অন্যরকম গুরুত্ব। অনেক সময় মাটির নিচ থেকে বা প্রাচীন ধ্বংসাবশেষ থেকে উদ্ধার করা এসব নিদর্শন আমাদের পূর্বপুরুষদের জীবনযাত্রা সম্পর্কে এমন সব দুর্লভ তথ্য দেয় যা কোনো পাঠ্যবইয়ে পাওয়া অসম্ভব। পুরাকীর্তি দিবস আমাদের উৎসাহিত করে আমাদের চারপাশের এই অমূল্য সম্পদগুলোকে অবহেলায় নষ্ট না করে যথাযথভাবে জাদুঘর বা ব্যক্তিগত সংগ্রহে সংরক্ষণ করতে। আজকের এই বিশেষ দিনে নিজের ঘরের এক কোণে পড়ে থাকা পুরনো দিনের সেই গ্রামোফোন বা বাবার সেই পুরনো ক্যামেরাটার দিকে একবার তাকালে হয়তো আপনিও অনুভব করবেন এক অদ্ভুত মায়া, যা আপনাকে মুহূর্তেই ফিরিয়ে নিয়ে যাবে ইতিহাসের কোনো এক ধূসর বিকেলে।







