বিল ভরাট করে জমির পরিবর্তন, হুমকিতে পরিবেশ ও মৎস্যসম্পদ
মাধবপুরে ভূমিদস্যুদের দখলে কাটেঙ্গা বিল
হবিগঞ্জের মাধবপুর উপজেলার আন্দিউড়া ইউনিয়নের ঐতিহ্যবাহী কাটেঙ্গা বিল এখন অবৈধ দখল ও ভরাটের কারণে অস্তিত্ব সংকটে। স্থানীয়দের অভিযোগ, একটি প্রভাবশালী ভূমিদস্যু চক্র দীর্ঘদিন ধরে সরকারি এই জলাভূমি দখল করে মাটি ফেলে ভরাট করছে এবং জমির শ্রেণি পরিবর্তনের মাধ্যমে কৃষিজমিতে রূপান্তর করছে। ফলে পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য ও স্থানীয় মৎস্যসম্পদ মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, একসময় বিভিন্ন খাল ও ছড়ার পানি এসে কাটেঙ্গা বিলে জমা হতো এবং পরে ধীরে ধীরে ভাটির দিকে নেমে যেত। কিন্তু বিলের বড় অংশ ভরাট হয়ে যাওয়ায় বর্তমানে সামান্য বৃষ্টিতেই আশপাশের এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হচ্ছে। এতে কৃষিজমি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং কৃষকদের ফসলহানির ঘটনা বাড়ছে।
একসময় দেশীয় বিভিন্ন প্রজাতির মাছের নিরাপদ প্রাকৃতিক আবাসস্থল ছিল কাটেঙ্গা বিল। এলাকার অসংখ্য মানুষ মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করতেন। পাশাপাশি সাতছড়ি জাতীয় উদ্যান থেকে বিভিন্ন প্রজাতির পাখি খাদ্যের সন্ধানে এই বিলে আসত। শীত মৌসুমে অতিথি পাখির উপস্থিতিও ছিল চোখে পড়ার মতো। কিন্তু অবৈধ দখল ও ভরাটের কারণে বিলটির পরিবেশগত ভারসাম্য ও জীববৈচিত্র্য আজ হুমকির মুখে।
কাটেঙ্গা বিল রক্ষা কমিটির আহ্বায়ক ও সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানের সহ-ব্যবস্থাপনা কমিটির (সিএমসি) সভাপতি শফিকুল ইসলাম আবুল বলেন, “এই বিল আমাদের এলাকার ঐতিহ্যের অংশ। ছোটবেলার অনেক স্মৃতি জড়িয়ে আছে এখানে। আগে প্রতি বছর চৈত্র মাসের প্রথম দিনে আশপাশের কয়েকটি ইউনিয়নের মানুষ একসঙ্গে মাছ ধরতে যেতাম। কিন্তু দখলদারদের কারণে বিলটি ধ্বংসের পথে। দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।”
আন্দিউড়া গ্রামের বাসিন্দা রিপন চৌধুরী বলেন, “সঠিক পরিকল্পনা ও সংরক্ষণের মাধ্যমে শ্রীমঙ্গলের বাইক্কা বিলের আদলে কাটেঙ্গা বিলকেও পরিবেশ সংরক্ষণ ও পর্যটনের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত করা সম্ভব। এজন্য বিল এবং এর সঙ্গে সংযুক্ত পানি প্রবেশ ও নিষ্কাশনের খালগুলো পুনঃখনন করা জরুরি।”
ভূমি অফিস সূত্রে জানা গেছে, আন্দিউড়া মৌজার জে.এল. নং-৬৭ এর ৫৩৯৮ দাগভুক্ত ১ নম্বর খতিয়ানের ১১ দশমিক ৪৯ একর আয়তনের কাটেঙ্গা বিল সরকারি সম্পত্তি। প্রতি বছর প্রকৃত মৎস্যজীবীদের কাছে লিজ দেওয়ার জন্য বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হলেও প্রভাবশালী দখলদারদের কারণে গত প্রায় দুই দশক ধরে কোনো মৎস্যজীবী সমিতি বিলটির লিজ নিতে সাহস পায়নি। ফলে সরকার দীর্ঘদিন ধরে রাজস্ব আয় থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে।
স্থানীয়দের দাবি, মাধবপুর উপজেলায় আরও প্রায় ২০টি পুকুর ও জলাশয় দীর্ঘদিন ধরে অবৈধ দখল কিংবা ভরাটের কারণে লিজবিহীন অবস্থায় রয়েছে। তাদের আশঙ্কা, দ্রুত দখলমুক্ত করে সংরক্ষণের কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ না করলে একসময় ঐতিহ্যবাহী কাটেঙ্গা বিল সম্পূর্ণ বিলীন হয়ে যাবে।
এ বিষয়ে মাধবপুর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মুজিবুল ইসলাম বলেন, “জলাভূমি পরিবেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কাটেঙ্গা বিলের অবৈধ দখল ও ভরাটের বিষয়টি আমার জানা নেই। খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”







