গেজেটে শায়েস্তাগঞ্জ, ভোটার তালিকায় এখনো হবিগঞ্জ সদর
৮ বছরেও মেটেনি সীমানা জট, দুই মৌজার বাসিন্দাদের দ্বৈত প্রশাসনিক ভোগান্তি
সরকারি গেজেটে শায়েস্তাগঞ্জ উপজেলার অন্তর্ভুক্ত হলেও জাতীয় পরিচয়পত্র ও ভোটার তালিকায় এখনও হবিগঞ্জ সদর উপজেলার নিজামপুর ইউনিয়নের বাসিন্দা হিসেবে রয়ে গেছেন শায়েস্তাগঞ্জ পৌরসভার বড়চর ও বাগুনীপাড়া মৌজার মানুষ। ফলে ভূমি-সংক্রান্ত সেবা মিলছে শায়েস্তাগঞ্জে, অথচ জন্মনিবন্ধন, নাগরিক সনদসহ বিভিন্ন সরকারি সেবা নিতে যেতে হচ্ছে হবিগঞ্জ সদর উপজেলায়।
দীর্ঘ ৮ বছর ধরে চলে আসা এই প্রশাসনিক জটিলতায় ভোগান্তিতে পড়েছেন দুই মৌজার বাসিন্দারা। গেজেট অনুযায়ী নিজেদের ঠিকানা শায়েস্তাগঞ্জ হলেও ভোটার তালিকায় নাম স্থানান্তর না হওয়ায় নাগরিক সেবা গ্রহণে তৈরি হয়েছে এক ধরনের দ্বৈত ব্যবস্থা। বিষয়টি সমাধানে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ে একাধিকবার লিখিত আবেদন করেছেন এলাকাবাসী। তাদের অভিযোগ, সরকারি সিদ্ধান্ত ও গেজেট বাস্তবায়নে সমন্বয়হীনতার কারণেই বছরের পর বছর ধরে সমস্যাটি ঝুলে আছে।
গেজেটে শায়েস্তাগঞ্জ, ভোটার তালিকায় নিজামপুর- সংশ্লিষ্ট গেজেট সূত্রে জানা যায়, ২০১৮ সালের ২৫ জানুয়ারি স্থানীয় সরকার বিভাগের উপজেলা-১ শাখা থেকে শায়েস্তাগঞ্জ উপজেলা গঠনের চূড়ান্ত গেজেট প্রকাশ করা হয়। এতে শায়েস্তাগঞ্জ পৌরসভাসহ নূরপুর, শায়েস্তাগঞ্জ ও ব্রাহ্মণডোরা ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকা নতুন উপজেলার আওতায় আনা হয়।
একই গেজেটে হবিগঞ্জ সদর উপজেলার ৯ নম্বর নিজামপুর ইউনিয়নের ১৫২ নম্বর এসএ জেএলভুক্ত বড়চর এবং ১৫১ নম্বর এসএ জেএলভুক্ত বাগুনীপাড়া মৌজাকে শায়েস্তাগঞ্জ উপজেলার অন্তর্ভুক্ত করা হয়। পৃথক আরেকটি গেজেটে মৌজা দুটি নিজামপুর ইউনিয়ন থেকে বাদ দেওয়ার নির্দেশনাও দেওয়া হয়। তবে গেজেট প্রকাশের প্রায় আট বছর পরও নির্বাচন কমিশনের ভোটার তালিকায় এর প্রতিফলন ঘটেনি। এখনও বড়চর ও বাগুনীপাড়া মৌজার ভোটাররা নিজামপুর ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের অন্তর্ভুক্ত।
ভূমির কাজ শায়েস্তাগঞ্জে, নাগরিক সনদে হবিগঞ্জ সদরে-প্রশাসনিক এই জটিলতার সবচেয়ে বড় ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে সাধারণ নাগরিকদের। স্থানীয়দের ভাষ্য, জমির নামজারি, খাজনা ও ভূমি উন্নয়ন করসহ ভূমি-সংক্রান্ত কাজ শায়েস্তাগঞ্জ উপজেলা ভূমি অফিসে করা গেলেও জন্মনিবন্ধন, নাগরিক সনদ এবং অন্যান্য দাপ্তরিক কাজে যেতে হয় হবিগঞ্জ সদর উপজেলায়। ফলে একই এলাকার বাসিন্দাদের কখনও শায়েস্তাগঞ্জ, আবার কখনও হবিগঞ্জ সদরে ছুটতে হচ্ছে। এতে সময় ও অর্থের অপচয়ের পাশাপাশি সরকারি সেবা নিতে গিয়ে নানা ধরনের বিড়ম্বনায় পড়তে হচ্ছে তাদের। বড়চর এলাকার বাসিন্দা বীর মুক্তিযোদ্ধা সিদ্দিক আলী বলেন, সরকারি সিদ্ধান্ত ও গেজেট অনুযায়ী আমরা শায়েস্তাগঞ্জের বাসিন্দা। সেখানেই ভূমি উন্নয়ন কর দিচ্ছি। অথচ ভোটার তালিকায় এখনও আগের ইউনিয়নে রাখা হয়েছে। নাগরিক সনদ কিংবা ভোটার তথ্য সংশোধনের প্রয়োজন হলে আমাদের ভোগান্তিতে পড়তে হয়। দ্রুত এ সমস্যার সমাধান চাই। বীর মুক্তিযোদ্ধা ও আবেদনকারী দুদুমিয়া তালুকদার বলেন, গেজেটে যখন বড়চর ও বাগুনীপাড়াকে শায়েস্তাগঞ্জ উপজেলার অংশ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, তখন নির্বাচন কমিশনের তালিকাতেও তার প্রতিফলন থাকা উচিত। এটি শুধু ভোটের বিষয় নয়, আমাদের নাগরিক পরিচয় ও অধিকারও এর সঙ্গে জড়িত।
এলাকাবাসীর পক্ষে সামছুল আলম রিপন বলেন, একই এলাকার মানুষকে দুই উপজেলার অফিসে ঘুরতে হচ্ছে। এটি আমাদের জন্য প্রশাসনিক ভোগান্তি ছাড়া কিছু নয়। গেজেট অনুযায়ী শায়েস্তাগঞ্জ পৌরসভার পূর্ণাঙ্গ নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর মধ্যে দ্রুত সমন্বয় প্রয়োজন।
সীমানা নির্ধারণ না হওয়ায় আটকে ভোটার স্থানান্তর- এ বিষয়ে হবিগঞ্জের জেলা নির্বাচন অফিসার আনোয়ার মাহমুদ বলেন, ভোটার স্থানান্তরের আবেদনগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। তবে শায়েস্তাগঞ্জ উপজেলার আওতাধীন বড়চর ও বাগুনীপাড়া মৌজার সুনির্দিষ্ট সীমানা নির্ধারণ জরুরি। তিনি বলেন, ১২ জুলাই প্রকাশিত গেজেটের আলোকে বড়চর ও বাগুনীপাড়া মৌজা এবং নিজামপুর ইউনিয়নের সীমানা স্পষ্ট করার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে ইতোমধ্যে হবিগঞ্জের জেলা প্রশাসক বরাবর চিঠি পাঠানো হয়েছে।
হবিগঞ্জের জেলা প্রশাসক ড. সরফরাজ জানান, শায়েস্তাগঞ্জ উপজেলার আওতাধীন বড়চর ও বাগুনীপাড়া মৌজার প্রশাসনিক ও সীমানা সংক্রান্ত জটিলতা নিরসনে দ্রুত উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। ইতোমধ্যে উপজেলা নির্বাহী অফিসারকে (ইউএনও) প্রধান করে একটি তদন্ত ও পর্যালোচনা কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির প্রতিবেদন হাতে পেলেই সীমানা সংক্রান্ত চূড়ান্ত কার্যক্রম সম্পন্ন হবে।
তবে গেজেটে অন্তর্ভুক্তির পরও প্রায় আট বছর ধরে কেন ভোটার তালিকা ও নাগরিক সেবার অন্যান্য নথিতে পরিবর্তন আসেনি এবং সীমানা জটিলতা কবে নাগাদ নিরসন হবে এর সুনির্দিষ্ট উত্তর এখনও মেলেনি। এলাকাবাসীর প্রত্যাশা, গেজেটের আলোকে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর মধ্যে দ্রুত সমন্বয় করে বড়চর ও বাগুনীপাড়া মৌজার সীমানা নির্ধারণ এবং ভোটার তালিকা হালনাগাদ করা হবে। এতে দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক জটিলতার অবসান ঘটবে এবং দুই মৌজার মানুষ পাবেন নিজ এলাকার পূর্ণাঙ্গ নাগরিক সেবা।







