বাংলাদেশে চার দশকে ৩৫ হাফেজের বিশ্বজয়
আন্তর্জাতিক হিফজুল কোরআন প্রতিযোগিতায় চার দশকের বেশি সময় ধরে ধারাবাহিক সাফল্য অর্জন করে আসছেন বাংলাদেশের হাফেজরা। ১৯৮২ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত পাওয়া তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, বিভিন্ন দেশের আন্তর্জাতিক হিফজুল কোরআন প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের ৩৫ জন হাফেজ মোট ৪৩টি প্রথম স্থান অর্জন করেছেন। একই হাফেজ একাধিক আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় প্রথম হওয়ায় বিজয়ীর সংখ্যা ৩৫ হলেও প্রথম স্থান অর্জনের সংখ্যা ৪৩।
এ প্রতিবেদনে ‘বিশ্বজয়’ বলতে আন্তর্জাতিক হিফজুল কোরআন প্রতিযোগিতায় প্রথম স্থান অর্জনকে বোঝানো হয়েছে। এ হিসাব তৈরিতে ১৯৯৪ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত ইসলামিক ফাউন্ডেশনের দ্বীনি দাওয়াত ও সংস্কৃতি বিভাগের সংরক্ষিত তথ্যের পাশাপাশি বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত হাফেজদের জাতীয় শিক্ষাবোর্ড হুফ্ফাজুল কোরআন ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ এবং আন্তর্জাতিক কিরাত সংস্থা বাংলাদেশ থেকে পাওয়া তথ্য বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। এসব তথ্য সমন্বয় করে ১৯৮২ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের হাফেজদের মোট ৪৩টি প্রথম স্থান অর্জনের তথ্য পাওয়া গেছে। ১৯৮২ সালের আগে এ ধরনের কোনো সাফল্যের তথ্যও পাওয়া যায়নি।
ইসলামিক ফাউন্ডেশনের দ্বীনি দাওয়াত ও সংস্কৃতি বিভাগের সংরক্ষিত তথ্যে ১৯৯৪ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের হাফেজদের ৩৭টি প্রথম স্থান অর্জনের তথ্য রয়েছে। এর বাইরে ১৯৮২ সালে কারি আবদুল হকের প্রথম স্থান অর্জনের তথ্য পাওয়া গেছে হুফ্ফাজুল কোরআন ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ থেকে। সংস্থাটির চেয়ারম্যান কারি আবদুল হক নিজেও ১৯৮২ সালে লিবিয়ায় অনুষ্ঠিত প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া এবং প্রথম স্থান অর্জনের তথ্য জানিয়েছেন। অন্যদিকে ২০১৪, ২০১৫, ২০২৪ ও ২০২৬ সালের কয়েকটি বিজয়ের তথ্য সরবরাহ করেছে আন্তর্জাতিক কিরাত সংস্থা বাংলাদেশ।
১৯৮২ সালে লিবিয়ায় অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক হিফজুল কোরআন প্রতিযোগিতায় ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে অংশ নিয়ে প্রথম স্থান অর্জন করেন কারি আবদুল হক। হুফ্ফাজুল কোরআন ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ থেকে আন্তর্জাতিক হিফজ প্রতিযোগিতায় প্রথম স্থান অর্জনকারী প্রথম হাফেজ তিনি। এরপর ১৯৯৪ সালে ইরানে প্রথম হন সাখাওয়াত হোসাইন। ১৯৯৬ সালে একই দেশে প্রথম স্থান অর্জন করেন মাহমুদুল হাসান।
১৯৯৯ সালে মিশরে প্রথম হন ইমদাদুল্লাহ এবং ইরানে প্রথম হন ফরিদ আহমদ। ২০০০ সালে মিশরে নাবিল ওয়ালিদ, ২০০১ সালে ইব্রাহিম বিন হেলাল, ২০০২ সালে জর্ডানে হোসাইন আহমাদ এবং ২০০৩ সালে মিশরে আবদুল কাদির প্রথম স্থান অর্জন করেন।
২০০৭ সালে দুবাইয়ে আন্তর্জাতিক হিফজুল কোরআন প্রতিযোগিতায় প্রথম স্থান অর্জন করেন ফজলে রাব্বি আদেল। দুই বছর পর ২০০৯ সালে মিশরেও প্রথম হন তিনি। ২০১০ সালে জর্ডানে প্রথম স্থান অর্জন করেন মো. সাইফুল ইসলাম। ২০১১ সালে ইরানে প্রথম হন হাফেজ সালাহউদ্দিন।
২০১২ সালে সৌদি আরবে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক হিফজুল কোরআন প্রতিযোগিতার পৃথক পৃথক বিভাগে প্রথম স্থান অর্জন করেন মো. তানভীর হোসাইন, এহসান উদ্দিন নোমান ও মুহাম্মদ সাদ সুরাইল। ২০১৩ সালে সৌদি আরবে প্রথম হন মো. ইমাদুল্লাহ। একই বছর জর্ডানে ফারিয়া তাসলিম এবং দুবাইয়ে হাফেজ নাজমুস সাকিব প্রথম স্থান অর্জন করেন। নাজমুস সাকিব পরের বছর সৌদি আরবেও প্রথম হন। পাশাপাশি ওই বছর মিশরে অনুষ্ঠিত ২১তম আন্তর্জাতিক হিফজ প্রতিযোগিতায় প্রথম হন হাফেজ মোহাম্মদ জাকারিয়া।
২০১৫ সালে সুদানেও প্রথম হন নাজমুস সাকিব। একই বছর মিশরে হিফজুল কোরআনের পৃথক পৃথক বিভাগে প্রথম হন নাহিয়ান কায়সার ও মুহিব্বুল্লাহ। জর্ডানে প্রথম হন সাঈদ হাসান। ২০১৬ সালে তুরস্কে হিফজ বিভাগে প্রথম হন আবদুল আখের। একই বছর বাহরাইনে আন্তর্জাতিক হিফজ ও কিরাত প্রতিযোগিতায় প্রথম স্থান অর্জন করেন হাফেজ মোহাম্মদ জাকারিয়া।
২০১৭ সালে সৌদি আরব ও মিশরে অনুষ্ঠিত হিফজুল কোরআন প্রতিযোগিতায় প্রথম স্থান অর্জন করেন আবদুল্লাহ আল মামুন। একই বছর দুবাইয়ে প্রথম হন তারিকুল ইসলাম। ২০১৮ সালে মিশরে প্রথম স্থান অর্জন করেন মুজাহিদুল ইসলাম। ২০১৯ সালে জর্ডানে প্রথম হন মো. সাইফুর রহমান ত্বাকী।
২০২১ সালে ইরানে এবং ২০২৩ সালে দুবাইয়ে প্রথম স্থান অর্জন করেন হাফেজ সালেহ আহমদ তাকরিম। ২০২৪ সালে ইরানে প্রথম হন বশির আহমদ। একই বছর সৌদি আরবে প্রথম হন আনাস বিন আতিক, তুরস্কে মুআজ মাহমুদ, কুয়েতে আনাস মাহফুজ এবং সেনেগালে অনুষ্ঠিত ১১তম আন্তর্জাতিক কোরআন প্রতিযোগিতায় প্রথম স্থান অর্জন করেন হাফেজ আবু রাইহান। মুআজ মাহমুদ ওই বছর সৌদি আরবে হিফজুল কোরআনের ১৫ পারা বিভাগেও প্রথম হন।
২০২৫ সালে মিশরেও প্রথম স্থান অর্জন করেন আনাস বিন আতিক। সর্বশেষ ২০২৬ সালে মালয়েশিয়ায় অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক কোরআন প্রতিযোগিতায় প্রথম হন হাফেজ ইব্রাহিম শেখ। একই বছর সৌদি আরবে ১৫ পারা হিফজ বিভাগে প্রথম স্থান অর্জন করেন হাফেজ মোহাম্মদ নুরুদ্দিন জাকারিয়া।
ফলে ১৯৮২ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন আন্তর্জাতিক হিফজুল কোরআন প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের হাফেজদের ৪৩টি প্রথম স্থান অর্জনের তথ্য পাওয়া যায়। এসব বিজয় এসেছে লিবিয়া, ইরান, মিশর, জর্ডান, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, তুরস্ক, সুদান, কুয়েত, বাহরাইন, সেনেগাল ও মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশের প্রতিযোগিতা থেকে।
অপমানের মন্তব্য থেকে সংকল্প এরপর আন্তর্জাতিক সাফল্য
বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক হিফজ প্রতিযোগিতার সাফল্যের শুরুর সময়ের একটি অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন কারি আবদুল হক। তার বর্ণনা অনুযায়ী, ১৯৮২ সালে লিবিয়ায় প্রথম হওয়ার পর ১৯৮৩ সালে তিনি আরও কয়েকজন বাংলাদেশির সঙ্গে সৌদি আরবে ৩০ পারা হিফজুল কোরআন ও তাফসির প্রতিযোগিতায় অংশ নেন।
সেখানে বাংলাদেশের একজন প্রতিযোগী আরবদের মতো সুন্দরভাবে তাজবিদসহ তেলাওয়াত করতে পারেননি। কারি আবদুল হকের ভাষ্য অনুযায়ী, পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে প্রতিযোগিতার প্রধান বিচারক ড. হাসান বজুদা মন্তব্য করেন, ‘বাঙালিরা বিশুদ্ধভাবে কোরআন পড়তে জানে না।’
আবদুল হক বলেন, ওই মন্তব্যে সেখানে থাকা বাংলাদেশিরা লজ্জিত হন। তার নিজের মধ্যেও বিষয়টি নিয়ে গভীর প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়। তিনি বলেন, ‘ইনশাআল্লাহ একদিন আমরা দেখিয়ে দেব যে, বাঙালিরা বিশ্বমানের তেলাওয়াত করতে জানে।’
তার ভাষ্য, সৌদি আরব থেকে ফিরে তারা এ নিয়ে কাজ শুরু করেন। এরপর ১৯৮৪ সাল থেকে বাংলাদেশের হাফেজরা, বিশেষ করে তার ছাত্ররা আন্তর্জাতিক মঞ্চে ধারাবাহিক সাফল্য পেতে শুরু করেন। ‘আজকের সাফল্য সেই ধারাবাহিকতারই অংশ’—বলেন তিনি।
শিক্ষক-অভিভাবক ও প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত ভূমিকা
বাংলাদেশের হাফেজদের আন্তর্জাতিক সাফল্যের পেছনে শিক্ষক, অভিভাবক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সমন্বিত ভূমিকার কথা উল্লেখ করেছেন কওমি মাদ্রাসা শিক্ষাবোর্ড বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়ার মহাসচিব মাওলানা মাহফুজুল হক। কালবেলাকে তিনি বলেন, ‘আলহামদুলিল্লাহ, আরব দেশ না হওয়া সত্ত্বেও অনারব (আজমি) দেশ হিসেবে বাংলাদেশের কৃতি সন্তানরা বিশ্বমঞ্চে যে সাফল্য অর্জন করছে, তা কোনো আকস্মিক বিষয় নয়। ১৯৮১-৮২ সাল থেকে শুরু করে ২০২৬ সাল পর্যন্ত তাদের এ ধারাবাহিক সাফল্য অব্যাহত রয়েছে।’
একজন সফল হাফেজ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে শিক্ষক ও অভিভাবকের পাশাপাশি মাদ্রাসা বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে বলে মনে করেন তিনি।
মাহফুজুল হক বলেন, ‘অভিভাবকরা যেমন তাদের সন্তানদের হাফেজ হিসেবে গড়ে তুলতে অত্যন্ত দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করছেন, তেমনি এ দেশের শিক্ষকরাও বিশ্ব দরবারে নিজেদের যোগ্যতার অনন্য স্বাক্ষর রেখে চলেছেন। সামগ্রিকভাবে শিক্ষক, অভিভাবক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সমন্বয়ে বাংলাদেশে যে ‘হিফজ শিক্ষাব্যবস্থাপনা’ গড়ে উঠেছে, তা অত্যন্ত সফল এবং কার্যকরী। এই সমন্বিত ব্যবস্থাপনাই মূলত আমাদের ধারাবাহিক সফলতার মূল কারণ।’
একই ধরনের মন্তব্য করে হাফেজদের এ সাফল্য দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় অনন্য প্রভাব ফেলবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন আন্তর্জাতিক কিরাত সংস্থা বাংলাদেশের মহাসচিব মাওলানা সাদ সাইফুল্লাহ মাদানী। তিনি বলেন, ‘বৈশ্বিক মঞ্চে বাংলাদেশি হাফেজদের একের পর এক সাফল্য কোনো কাকতালীয় ঘটনা নয়; বরং এটি বহু বছরের ধারাবাহিক প্রচেষ্টা ও পরিকল্পিত হিফজ শিক্ষাব্যবস্থার ফল। আমরা প্রত্যাশা করি, কোরআন হিফজের এই সাফল্যের ধারা দেশের কোরআন শিক্ষা ও শিক্ষাব্যবস্থার অন্যান্য ক্ষেত্রেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে এবং বাংলাদেশ আরও এগিয়ে যাবে।’
কঠোর অনুশীলন, তাজবিদ ও ওয়াকফ-ইবতিদায় জোর
বাংলাদেশের হাফেজদের আন্তর্জাতিক সাফল্যের পেছনে দীর্ঘ সময়ের অনুশীলন ও তেলাওয়াতের নির্ভুলতার কথা উল্লেখ করেছেন একাধিক বিশ্বজয়ী হাফেজের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান মারকাজু ফয়জিল কোরআন আল ইসলামীর প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক মুফতি মুরতজা হাসান ফয়েজ মাসুম।
কালবেলাকে তিনি বলেন, ‘সাধারণত পৃথিবীর অন্যান্য দেশে হিফজুল কোরআন বিভাগের ছাত্রদের পড়াশোনা শুরু হয় ফজরের পর থেকে। আর বাংলাদেশে এই বিভাগের পড়া শুরু হয় ভোর ৪টা থেকে। ঘুম, খাওয়া এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় কাজের সময় ছাড়া প্রায় রাত ১১টা পর্যন্ত এই পড়া চলতে থাকে। এই জায়গায় আমাদের শিক্ষক-ছাত্ররা অনেক মেহনত করেন। এই হাড়ভাঙা সিস্টেমের কারণে আমাদের ছেলেরা নির্ভুল তেলাওয়াত করেন। যে কারণে ঐতিহাসিকভাবে মেধাবী আরবদেরও পরাজিত করতে সক্ষম হয় তারা।’ তবে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় আরও ভালো ফলের জন্য কিছু বিষয়ে উন্নতির সুযোগ রয়েছে বলেও মনে করেন তিনি।
তার মতে, বাংলাদেশের হাফেজরা অল্প বয়সে হিফজ সম্পন্ন করায় অনেক সময় শ্বাসের দৈর্ঘ্যের কারণে পুরো আয়াত এক নিঃশ্বাসে শেষ করতে পারেন না। আবার আয়াতের অর্থ না বোঝার কারণে কোথায় থামতে হবে এবং কোথা থেকে শুরু করলে ভালো হবে—অর্থাৎ ওয়াকফ ও ইবতিদার বিষয়েও অনেকের দুর্বলতা থাকে। তিনি বলেন, ‘কিছু ক্ষেত্রে শিক্ষকরাও আলেম না হওয়ায় আয়াতের অর্থ ও ওয়াকফ-ইবতিদার বিষয়গুলো যথাযথভাবে বোঝাতে পারেন না।’
তাজবিদের ক্ষেত্রেও আরও মনোযোগ প্রয়োজন বলে মনে করেন মুফতি মাসুম। তিনি বলেন, ‘অনেক শিক্ষার্থী শুধু সুরের দিকে বেশি মনোযোগ দেন। এতে কখনো মাদ ছোট-বড় হয়ে যায়, যা আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।’
তার পরামর্শ, শিক্ষকদের মুখস্থের পাশাপাশি ওয়াকফ ও ইবতিদা এবং তাজবিদের প্রতিও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া উচিত। আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার সুরের দিকে অতিরিক্ত মনোযোগ না দিয়ে এসব মৌলিক বিষয়ের প্রতি গুরুত্ব দিলে বাংলাদেশের হাফেজরা আরও ভালো করবেন বলে তিনি মনে করেন।
বিশ্বজয়ী হাফেজের অভিজ্ঞতায় শিক্ষক-পরিবারের ভূমিকা
আন্তর্জাতিক কোরআন প্রতিযোগিতায় একাধিকবার প্রথম স্থান অর্জনকারী হাফেজ সালেহ আহমদ তাকরীমের অভিজ্ঞতাতে শিক্ষক ও পরিবারের ভূমিকার বিষয়টি উঠে এসেছে। আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় বিজয়ের পেছনে নিজের প্রস্তুতি, শিক্ষক ও পরিবারের ভূমিকা সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি কালবেলাকে বলেন, ‘আমাদের উস্তাদরা আমাদের আকাশচুম্বী স্বপ্ন দেখান এবং মানসিকভাবে শক্তিশালী করে তোলেন। পরিবার থেকেও বাবা-মা সেই স্বপ্নগুলো ধারণ করেন এবং আমাদের যথেষ্ট সহযোগিতা করেন।’
একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন একাধিকবার প্রথম স্থান অর্জনকারী হাফেজ মোহাম্মদ জাকারিয়াও। পাশাপাশি বাংলাদেশি হাফেজদের আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকার কারণ হিসেবে কোরআন মুখস্থের দৃঢ়তা ও তাজবিদের মানের কথাও উল্লেখ করেছেন তিনি। তার ভাষ্য, ‘বাংলাদেশি হাফেজদের কোরআনের ইয়াদ (মুখস্থ) ও তাজবিদের মান ভালো। এ কারণে নির্ভুল তেলাওয়াতের মাধ্যমে আমাদের অনেকে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকেন।’
বিশ্বজয়ীদের জন্য সরকারি উদ্যোগের আহ্বান
বাংলাদেশের হাফেজদের আন্তর্জাতিক সাফল্যের ধারাবাহিকতার কথা উল্লেখ করে তাদের জন্য সরকারি পর্যায়ে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন মাওলানা মাহফুজুল হক। তিনি বলেন, ‘আমার জানা মতে, অন্য কোনো ক্ষেত্রে আমাদের দেশের সন্তানরা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এতটা ধারাবাহিক এবং উচ্চপর্যায়ের সাফল্য অর্জন করতে পারেনি। অথচ অন্যান্য ক্ষেত্রে তুলনামূলক কম সাফল্যের পরও সরকারিভাবে নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘তাই আমি সরকারের কাছে উদাত্ত আহ্বান জানাচ্ছি, ৯০ শতাংশ মুসলিম অধ্যুষিত এই বাংলাদেশে কোরআনের হিফজ প্রতিযোগিতায় বিশ্বজয়ী সন্তানদের ক্ষেত্রেও তারা যেন বিশেষভাবে মনোযোগ দেয়।’
আন্তর্জাতিক সাফল্যে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের ভূমিকা ও উদ্যোগ
আন্তর্জাতিক হিফজুল কোরআন ও কিরাআত প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের হাফেজ ও কারিদের ধারাবাহিক সাফল্যের পেছনে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের বাছাই ও প্রস্তুতি প্রক্রিয়াকেও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন সংস্থাটির দ্বীনি দাওয়াত ও সংস্কৃতি বিভাগের পরিচালক ড. মোহাম্মদ হারুনুর রশীদ।
কালবেলাকে তিনি বলেন, ‘বিগত চার দশক ধরে আন্তর্জাতিক হিফজুল কোরআন এবং কেরাত প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের হাফেজ এবং কারিদের ধারাবাহিক সাফল্যের অন্যতম কারণ হচ্ছে, ইসলামিক ফাউন্ডেশন কর্তৃক আন্তর্জাতিক জ্ঞান ও মানসম্পন্ন হাফেজ এবং কারিদের সমন্বয়ে বিজ্ঞ বিচারক প্যানেল তৈরি করা। নিরপেক্ষভাবে মেধাবী ও উপযুক্ত প্রতিযোগী বাছাই করে সংশ্লিষ্ট দেশে প্রেরণ করা এবং প্রতিযোগিতার বিচারকার্য ও বাছাই পর্ব নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা।’ তিনি বলেন, ‘এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট প্রতিযোগী এবং তাদের ওস্তাদদের ইসলামিক ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে সার্বিক সহযোগিতা প্রদান করা হয়।’
ভবিষ্যৎ উদ্যোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে হারুনুর রশীদ বলেন, ‘আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের হাফেজ এবং কারিদের এ সাফল্যকে ধরে রাখাসহ ভবিষ্যতে আরও সাফল্য অর্জনের জন্য ইসলামিক ফাউন্ডেশনের ওপর অর্পিত দায়িত্ব আমরা সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করে যাব, ইনশাআল্লাহ।’
তিনি জানান, ইসলামিক ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে জাতীয় পর্যায়ে জাতীয় শিশু-কিশোর ইসলামী সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা এবং পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) উদযাপন উপলক্ষে ইসলামী সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়ে থাকে। এ ছাড়া বর্তমান সরকারের মেয়াদে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের সমন্বয় বিভাগ জাতীয় হিফজুল কোরআন প্রতিযোগিতা, জাতীয় সিরাত প্রতিযোগিতা এবং জাতীয় তাফসিরুল কোরআন প্রতিযোগিতা আয়োজনের উদ্যোগ নিয়েছে।
৩৫ হাফেজ, ৪৩ প্রথম স্থান
১৯৮২ সালে লিবিয়ায় কারি আবদুল হকের প্রথম স্থান অর্জনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক হিফজ প্রতিযোগিতায় সাফল্যের যে তথ্য পাওয়া যায়, তা ২০২৬ সালে সৌদি আরবে মোহাম্মদ জাকারিয়ার প্রথম স্থান অর্জন পর্যন্ত বিস্তৃত। এ সময়ে ইরান, মিশর, লিবিয়া, জর্ডান, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, তুরস্ক, সুদান ও কুয়েতসহ বিভিন্ন দেশের আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের হাফেজরা প্রথম স্থান অর্জন করেছেন। ৩৫ জন স্বতন্ত্র হাফেজের মোট ৪৩টি প্রথম স্থান অর্জনের এ হিসাব বাংলাদেশের হিফজ শিক্ষার দীর্ঘদিনের ধারাবাহিক সাফল্যের একটি চিত্র তুলে ধরে।







