বাংলাদেশের আকাশ রক্ষায় পাকিস্তানি যুদ্ধবিমান

দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে এক নতুন সমীকরণ তৈরি হয়েছে। গত ৬ জানুয়ারি ইসলামাবাদে পাকিস্তান বিমান বাহিনীর প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল জাহির আহমেদ বাবর সিধুর সঙ্গে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খানের এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। পাকিস্তানের ইন্টার-সার্ভিস পাবলিক রিলেশনের (আইএসপিআর) পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এই বৈঠকে পাকিস্তানের নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি (চীনের সহযোগিতায়) জেএফ-১৭ থান্ডার মাল্টিরোল যুদ্ধবিমান ক্রয়ের বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। বাংলাদেশের এই সম্ভাব্য সামরিক পদক্ষেপ এবং পাকিস্তানের সাথে বাড়তে থাকা প্রতিরক্ষা সম্পর্ক দিল্লির নীতি নির্ধারকদের মধ্যে গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ইতিমধ্যে জানিয়েছে, তারা এই পরিস্থিতির ওপর তীক্ষ্ণ নজর রাখছে।
যেসব কারণে উদ্বেগে ভারত
বাংলাদেশের পাক যুদ্ধবিমান ক্রয়ের খবরে আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও কৌশলগত ভারসাম্য নিয়ে চরম উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছে নয়াদিল্লি। ভারতের দীর্ঘদিনের উদ্বেগের বিষয় হলো তার পূর্ব এবং পশ্চিম উভয় সীমান্তেই প্রতিকূল পরিবেশ। দিল্লির দাসি ফ্যাসিস্ট হাসিনার আমলে এতদিন ভারত সব সময় বাংলাদেশকে একতরফাভাবে তার বিশ্বস্ত কৌশলগত অংশীদার হিসেবে দেখে এসেছে। কিন্তু বাংলাদেশ যদি পাকিস্তানের তৈরি যুদ্ধবিমান ক্রয় করে এবং পাকিস্তানের সাথে গভীর সামরিক সহযোগিতায় লিপ্ত হয়, তবে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর (যাকে ‘চিকেন’স নেক’ বলা হয়) নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়তে পারে বলে ভারত মনে করছে।
অন্যদিকে, জেএফ-১৭ থান্ডার মূলত পাকিস্তান অ্যারোনটিক্যাল কমপ্লেক্স এবং চীনের চেংদু এয়ারক্রাফট কর্পোরেশনের যৌথ উদ্যোগে তৈরি। ভারত মনে করে, এই যুদ্ধবিমান ক্রয়ের মাধ্যমে বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় চীনের প্রযুক্তিগত আধিপত্য আরও বাড়বে। ভারতের প্রধান দুই প্রতিদ্বন্দ্বী—চীন ও পাকিস্তান—যদি বাংলাদেশের সামরিক আধুনিকায়নে প্রধান ভূমিকা পালন করে, তবে তা দিল্লির জন্য কৌশলগত মাথাব্যথার কারণ হবে।
২০২৫ সালের মে মাসে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে চার দিনের এক সংক্ষিপ্ত কিন্তু তীব্র আকাশযুদ্ধ সংঘটিত হয়। পাকিস্তান দাবি করে, তাদের জেএফ-১৭ এবং জে-১০সি বিমানগুলো ভারতীয় বিমানবাহিনীর তুলনায় উন্নত পারফরম্যান্স দেখিয়েছে। এই জেটগুলো ব্যবহার করে ভারতের বেশ কয়েকটি অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান রাফাল ভূপাতিত করে পাক বিমান বাহিন। তাই বর্তমানে পাকিস্তান বিশ্ববাজারে জেএফ-১৭ কে ‘কমব্যাট-প্রুভেন’ বা যুদ্ধে পরীক্ষিত বিমান হিসেবে প্রচার করছে।বাংলাদেশের মতো প্রতিবেশী রাষ্ট্র যদি এই বিমান কেনে, তবে তা ভারতের আকাশ প্রতিরক্ষা কৌশলের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করবে।
বাংলাদেশ তার ‘ফোর্সেস গোল ২০৩০’-এর আওতায় সামরিক বাহিনীকে আধুনিকায়ন করছে। বর্তমানে বাংলাদেশের কাছে থাকা পুরনো এফ-৭ এবং মিগ-২৯ বিমানগুলো বদলে ফেলার জরুরি প্রয়োজন রয়েছে। জেএফ-১৭ ব্লক ৩ সংস্করণটি ৪.৫ প্রজন্মের সক্ষমতা সম্পন্ন, যাতে আছে উন্নত এইসা রাডার এবং দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র। ভারতের নিজস্ব ‘তেজাস’ কর্মসূচি যখন ইঞ্জিন সংক্রান্ত জটিলতায় কিছুটা ধীরগতিতে চলছে, তখন প্রতিবেশীর হাতে এই প্রযুক্তি পৌঁছানো ভারতের জন্য অস্বস্তির।
পাকিস্তান বর্তমানে জেএফ-১৭ বিমানকে সস্তা কিন্তু কার্যকর বিকল্প হিসেবে বিশ্ববাজারে তুলে ধরছে। দেশটি ইতোমধ্যেই বিশ্বের বেশ কয়েকটি দেশের কাছে এই যুদ্ধবিমান বিক্রি করেছে। নাইজেরিয়া, মায়ানমার এবং আজারবাইজানের পর বাংলাদেশ হতে পারে এর বড় গ্রাহক। পাকিস্তান শুধু বিমান বিক্রি নয়, বরং বাংলাদেশি পাইলটদের প্রশিক্ষণ এবং রাডার সিস্টেম ইন্টিগ্রেশনেও সহযোগিতার প্রস্তাব দিয়েছে।
পাক আইএসপিআরের বিবৃতিতে আরও বলা হয়, বাংলাদেশ বিমানবাহিনী প্রধান পাকিস্তান বিমানবাহিনীর যুদ্ধকালীন রেকর্ডের প্রশংসা করেন এবং তাদের অপারেশনাল দক্ষতা থেকে উপকৃত হওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেন। তিনি বাংলাদেশের পুরনো বিমানবহর রক্ষণাবেক্ষণে সহায়তা এবং আকাশপথে নজরদারি বাড়াতে বিমান প্রতিরক্ষা রাডার সিস্টেমগুলো একীভূত করার ক্ষেত্রে সহযোগিতা চেয়েছেন।
এদিকে, গতকাল শুক্রবার ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সোয়াল জানিয়েছেন, ভারতের জাতীয় নিরাপত্তার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে এমন যেকোনো উন্নয়নের ওপর দিল্লি নজর রাখছে। সরাসরি কোনো প্রতিবাদ না জানালেও, দিল্লির সামরিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ঢাকার এই পদক্ষেপ ভারতের ‘নেইবারহুড ফার্স্ট’ (প্রতিবেশী প্রথম) নীতির জন্য একটি বড় পরীক্ষা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশ কোনো দেশের সাথে সংঘাতের জন্য নয়, বরং নিজস্ব আকাশসীমা রক্ষা এবং সামরিক সক্ষমতা বাড়ানোর তাগিদেই আধুনিক যুদ্ধবিমানের সন্ধান করছে। তবে দক্ষিণ এশিয়ার জটিল সমীকরণে বাংলাদেশের এই ‘পাকিস্তানমুখী’ প্রতিরক্ষা আগ্রহ দিল্লির জন্য কেবল সামরিক নয়, বরং রাজনৈতিক ও কৌশলগত আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।






