ব্রিটেনে ৫ বছরে স্থায়ী হবার সম্ভাবনা যে কারণে এখনও শেষ হয়নি
ব্রিটিশ সরকার শুক্রবার (২১ নভেম্বর) তাদের সর্বশেষ ইমিগ্রেশন বোমা ফাটানোর পর অভিবাসী কমিউনিটিতে একটি শব্দই ছড়িয়ে পড়েছে-আতঙ্ক। দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একটি নতুন ‘অর্জিত বসবাস মর্যাদা’ কাঠামো নিয়ে কাজ শুরু করেছে, যা ব্রিটেনে স্থায়ী হওয়ার প্রচলিত পদ্ধতিকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলবে।
খবরের শিরোনামে যে বিষয়টি সবাইকে ভড়কে দিয়েছে তা হলো, স্বল্প আয়ের কর্মী, বিশেষ করে ২০২২ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে হেলথ ও সোশ্যাল কেয়ার ভিসায় আসা ছয় লাখ ১৬ হাজার মানুষের স্থায়ী হতে এখন অন্তত ১৫ বছর অপেক্ষা করতে হতে পারে।
এই ঘোষণায় দিশেহারা বোধ করছেন অভিবাসীরা। সেখানে প্রায় এক লাখ বাংলাদেশি সহ ১৫ লাখের বেশি মানুষের জন্য এই প্রস্তাবটি প্রচণ্ড হতাশা তৈরি করেছে। ১৫ বছরের সময়সীমা শুধু দীর্ঘ অপেক্ষাই নয়, পাশাপাশি অন্তত ছয় বার ভিসা নবায়নের এক কারিগরি ভোগান্তি।
হাজার হাজার অভিবাসী পরিবার এখন নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছে এই ভেবে যে, কীভাবে তারা এই দীর্ঘ সময়ে ভিসার আকাশচুম্বী ফি জোগাড় করবে, অথবা এই দেড় দশকের মধ্যে যদি স্পন্সর কোম্পানি লাইসেন্স হারায় তবে তাদের কী হবে।
তবে হতাশায় ডুবে যাওয়ার আগে আমাদের একটু পেছনে ফিরে তাকাতে হবে। ওয়েস্টমিনিস্টারের রাজনীতির কলকাঠি নাড়ার দৃশ্য আমি গত দুই দশক ধরে পর্যবেক্ষণ করছি। আমার অভিজ্ঞতা বলছে, এখনই আতঙ্কিত হওয়া অপরিণত সিদ্ধান্ত। আমরা যা দেখছি তা সম্ভবত চূড়ান্ত কোনও নীতি নয়, বরং এটি একটি নির্মম রাজনৈতিক কৌশল।
রাজনৈতিক ধোঁকা বা ‘ব্লাফ’-এর কৌশল
একটি বিষয় আমাদের পরিষ্কার হওয়া দরকার, এটি বর্তমানে কেবলই পরামর্শ বা কনসালটেশন মাত্র, কোনও আইন নয়। বছরের শুরুতে গুঞ্জন ছিল যে, স্থায়ীকরণের পাঁচ বছরের রুট দ্বিগুণ হবে। কেয়ার ওয়ার্কারদের জন্য হুট করে ১৫ বছরের সময়সীমা জুড়ে দেওয়াটা “অ্যাঙ্করিং” নামের একটি ক্লাসিক দর কষাকষির কৌশলের মতো মনে হচ্ছে।
লেবার সরকার খুব ভালো করেই জানে যে এই প্রস্তাবে তীব্র প্রতিক্রিয়া হবে। তারা অভিবাসী কমিউনিটি, মানবাধিকার আইনজীবী এবং এনএইচএস প্রধানদের কাছ থেকে কঠোর প্রতিরোধের আশঙ্কা করছে। তাই ১৫ বছরের মতো অসম্ভব কঠিন একটি সীমা নির্ধারণ করে সরকার আসলে পিছু হটার জায়গা তৈরি রাখছে। যখন পার্লামেন্টে পিটিশন জমা পড়বে এবং ক্যাম্পেইন তুঙ্গে উঠবে, তখন মন্ত্রীরা “সমঝোতা” করে ১০ বছরের সময়সীমায় রাজি হতে পারেন। এতে তারা দেখাতে পারবেন যে, তারা মানুষের কথা শুনেছেন, অথচ আদতে নিয়ম ঠিকই কঠিন করা হলো।
গোলপোস্ট সরানো: সামনে আইনি লড়াই
নতুন পরিকল্পনার সবচেয়ে বিতর্কিত এবং দুর্বল দিক হলো এর ‘রেট্রোস্পেকটিভ’ বা পেছনের তারিখ থেকে কার্যকর হওয়ার বিষয়টি। ২০২২ থেকে ২০২৪ সাল সময়ের ব্রিটেনে গেছেন, তারা একটি নির্দিষ্ট চুক্তির ভিত্তিতেই সেখানে আছেন। তারা কঠোর পরিশ্রম, নিয়ম মেনে চলা এবং পাঁচ বছরে সেটেলমেন্ট পাওয়ার আশাতে ছিলেন। ব্রিটেনের মতো একটি দেশের জন্য পেছনের তারিখে গিয়ে, তাদের ওপর নতুন সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা যেমন অনৈতিক, তেমনি আইনিভাবেও বিপজ্জনক।
এখানে একটি শক্তিশালী নজির রয়েছে যা কমিউনিটিকে আশা জোগাবে। ২০০৮ সালে হাই কোর্ট বিখ্যাত এইচএসএমপি ফোরাম মামলায় সরকারের বিরুদ্ধে রায় দিয়েছিল। বিচারক নিশ্চিত করেছিলেন যে, মানুষ যে নিয়মের ওপর ভিত্তি করে তাদের জীবন সাজিয়েছে, সরকার চাইলেই হুট করে সেই খেলার নিয়ম বা ‘গোলপোস্ট’ সরিয়ে ফেলতে পারে না। আদালত একে “বৈধ প্রত্যাশা” ভঙ্গ করা বলে অভিহিত করেছিল।
যেহেতু বর্তমান কেয়ার ওয়ার্কাররা সরকারের পরিষ্কার প্রতিশ্রুতি জেনেই এসেছেন, তাই ১৫ বছরের এই নিয়ম পেছনের তারিখ থেকে কার্যকর করতে চাইলে জুডিশিয়াল রিভিউ হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। সরকার জানে, আদালতে এই লড়াইয়ে তাদের হেরে যাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।
এখনই কেন এমন হচ্ছে?
সরকারের এমন কঠোর প্রস্তাব আনার কারণ বুঝতে হলে জনমত জরিপের দিকে তাকাতে হবে। রিফর্ম ইউকের ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তায় লেবার সরকার এখন তীব্র চাপের মুখে। ডানপন্থী এই দলটি অভিবাসন কমানোর জন্য আক্রমণাত্মক প্রচারণা চালাচ্ছে। তাই লেবার পার্টিও নিজেকে অভিবাসন বিষয়ে দুর্বল দেখাতে চাইছে না।
সরকারের প্রস্তাবে ভাতানির্ভরদের জন্য ২০ বছর এবং ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়া বা অবৈধদের জন্য ৩০ বছরের অপেক্ষা করার মতো কিছু কঠোর ব্যবস্থার কথা বলা হয়েছে। এতে নির্দিষ্ট একটি ভোটার গোষ্ঠীর কাছে তারা ‘কঠোর’ প্রমাণ হবেন। এটি এমন একটি আখ্যান তৈরি করে যেন ব্রিটেনের সব সমস্যার মূলে অভিবাসন। তবে এটি একটি ঝুঁকিপূর্ণ বাজি। কেয়ার ওয়ার্কাররা সোশ্যাল কেয়ার খাতের মেরুদণ্ড। শাস্তিমূলক সেটেলমেন্ট রুট দিয়ে তাদের জীবন জটিল করে তুললে জনসেবা খাত ধসে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হবে।
শেষ কথা
যদিও খসড়ার শর্তগুলো ভীতিকর—বিশেষ করে নাগরিকত্ব না পাওয়া পর্যন্ত সেটেলড স্ট্যাটাস বা স্থায়ী বসবাসের অনুমতি পাওয়াদের বেনিফিট বন্ধ রাখার বিষয়টি সেখানে অন্তর্ভুক্ত আছে, মনে রাখতে হবে আমরা এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে আছি। সরকারকে মানবাধিকার আইন এবং যুক্তরাজ্যের তীব্র শ্রম ঘাটতির অর্থনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে ভারসাম্য রেখেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে হবে। ব্রিটেনের অভিবাসী কমিউনিটিতে নতুন যুক্ত সদস্যদের প্রতি পরামর্শ হলো: সতর্ক থাকুন, কিন্তু আশা হারাবেন না। এটি দীর্ঘ আইনি দাবা খেলার কেবল প্রথম চাল। সংবাদপত্রের পাতায় বা কনসালটেশন পেপারে যা দেখা যায়, তা খুব কমই অবিকল আইন হিসেবে পাস হয়। প্রচলিত পাঁচ বছরের রুট হুমকির মুখে পড়েছে ঠিকই, কিন্তু এটি টিকিয়ে রাখার লড়াই কেবল শুরু হয়েছে।







