বুনো ফুল দিয়েং জুলকাহ
দেশের স্পর্শকাতর প্রাকৃতিক স্থানগুলোতে পর্যটনশিল্প প্রকৃতিকে হুমকির মুখে ফেলেছে। বন-পাহাড় তথা দেশের এ ধরনের প্রাকৃতিক স্থানে পর্যটন ব্যবসা বা রাজস্ব আয় ব্রিটিশ সরকারের একটি অপতৎপরতা হিসেবে গণ্য হয়। এরই ধারাবাহিকতা আমরা বয়ে চলেছি। কিছু সংবেদনশীল স্থানে পর্যটক নিষিদ্ধ থাকা প্রয়োজন।
আর কোনো কোনো স্থানে পর্যটন হতে পারে সুনিয়ন্ত্রিত স্কুলিং পদ্ধতির মাধ্যমে। পর্যটন স্পটগুলো বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এসবের কোনো তোয়াক্কা করে না। এসব কারণে বর্তমানে বাইক্কা বিল, হাকালুকি হাওর, টাঙ্গুয়ার হাওর বা লাউয়াছড়াসহ অনেক প্রাকৃতিক সংবেদনশীল স্থানের জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়েছে। বিষয়টি খুবই উদ্বেগজনক।
সিলেট বা মৌলভীবাজারে বেড়াতে গেলে পর্যটকদের কাছে যে কয়টি স্থান পরম কাঙ্ক্ষিত থাকে তার মধ্যে অন্যতম লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান। পর্যটন মৌসুমে সেখানে মানুষের ঢল নামে। বন বিভাগ তাতে বেজায় খুশি! টিকিট বাবদ কিছু টাকা আয়-রোজগার হয়। প্রায় ১৮ বছর আগে আমিও একদিন এই বন দেখতে গেলাম।
ঢোকার পথে আমাদের পাশ কাটিয়ে বনের ভেতর ঢুকল ৮-১০টি গাড়ি। তারুণ্যে উদ্দীপ্ত কয়েকটি দলের হল্লা-চিৎকারে প্রকম্পিত হলো পুরো বন এলাকা। এসব অসচেতন মানুষের বাঁদরামো দেখে বানর, হনুমানও ভীত হয়ে বন ছেড়ে পালিয়েছে। মাত্র তিন দশক আগেও লাউয়াছড়া উদ্যানে খুব সহজেই বিভিন্ন প্রাণীর দেখা মিলত। অথচ এখন কোনো প্রাণীর দেখা পাওয়া সৌভাগ্যের ব্যাপার।
ভেতরে আবার কয়েকটি দোকানপাটও গজিয়েছে। অদূরভবিষ্যতে হয়তো দু-একটা মার্কেটও দাঁড়িয়ে যেতে পারে!
যত ভেতরে যাই, ততই মন খারাপ হতে থাকে। যত্রতত্র মানুষের ছুড়ে ফেলা বর্জ্যের ছড়াছড়ি। তবে হাঁটাপথগুলোর দুই পাশে চোখ রাখলে খুব সহজে এই বনের বিশেষত্ব উপলব্ধি করা যাবে। খুব কম বনেই বিভিন্ন উচ্চতার বিচিত্র গাছপালার এমন ঘনত্ব চোখে পড়বে। ভালোভাবে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে সেদিন বেশ কিছু ফুল-ফল ও লতা-গুল্মের সন্ধান পেয়েছিলাম, যার বেশির ভাগই অচেনা। স্নিগ্ধ শোভার একটি ফুল দেখে মন জুড়িয়ে গেল। ঢাকায় ফিরে বই-পুস্তক ঘেঁটে ফুলটির পরিচয় শনাক্ত করি। নাম দিয়েং জুলকাহ। নামটি সম্ভবত আদিবাসীদের দেওয়া। কিন্তু সবকিছু নিশ্চিত হওয়ার পরও একটি বিষয়ে দ্বিধা থেকেই গেল। লতানো ধরনের দীর্ঘ মঞ্জরিদণ্ড দেখে ভেবেছিলাম গাছটিও লতানো জাতের। কিন্তু বইয়ের তথ্য মতে, এই গাছ গুল্ম শ্রেণির। নিশ্চিত হতে দু-তিন বছর পর ডিসেম্বর মাসে আবার সেখানে যাই। অনেক কষ্টে খুঁজে বের করি গাছটি। ভালোভাবে খুঁটিয়ে দেখি। নিশ্চিত হই, এটা আসলে ছোট ধরনের গুল্ম। শুধু মঞ্জরিদণ্ডটিই লতানো এবং ঝুলন্ত স্বভাবের। গাছটির তারকাকৃতির সুদর্শন ফল দেখেও যে কেউ আকৃষ্ট হতে পারে।
দিয়েং জুলকাহ (Clerodendrum wallichii) মূলত সাড়ে তিন মিটার উঁচু গুল্ম ধরনের গাছ। ইংরেজি নাম ব্রাইডাল ভেইল। এই গাছের বাকল লালচে বাদামি, শাখা-প্রশাখা চার কোণাকার। পত্র সরল, প্রতিমুখ ও আয়তাকার। কিনারা অখণ্ডিত বা ঈষৎ দাঁতানো, পত্রবৃন্ত এক থেকে দুই সেন্টিমিটার লম্বা। পুষ্পবিন্যাস সরু ও ঝুলন্ত লম্বাটে দণ্ডে গুচ্ছবদ্ধভাবে বিন্যস্ত। ফুলের রং সাদা, বৃন্ত প্রায় দুই সেন্টিমিটার লম্বা ও সরু। বসন্ত থেকে শীতের প্রথম ভাগ পর্যন্ত ফুল ফোটে। বৃতি নলাকার, সংকুচিত, রক্ত-বেগুনি এবং গভীরভাবে পাঁচ খণ্ডে বিভক্ত। পরাগধানী ছোট ও ডিম্বাকৃতির। ফল ঝুলন্ত ও গোলাকার। বেঁচে থাকার ক্ষেত্রে আর্দ্র ও ছায়াযুক্ত স্থান পছন্দ। হিমালয় অঞ্চল, ভুটান, মালয়, ইন্দোচীন ও ওয়েস্ট ইন্ডিজের কিছু অংশে প্রাকৃতিকভাবে জন্মে। বাংলাদেশের সিলেট, চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে বিস্তৃত। আবাসস্থল ধ্বংসের কারণে বর্তমানে দুর্লভ। আলংকারিক উদ্ভিদ হিসেবে বাগান ও টবে চাষ করা যেতে পারে। বংশবৃদ্ধি বীজ ও শাখা কলমে।







