ধ্বংসস্তূপে সাবেক মন্ত্রীর পরিবারের ১১২ জনের মরদেহ উদ্ধার

ফিলিস্তিনের গাজায় একটি পরিবারের ১১২ সদস্যের লাশ প্রায় তিন বছর পর ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। ২০২৩ সালের নভেম্বরে ইসরায়েলি বিমান হামলায় তারা নিহত হন। গত জুলাই মাসে উদ্ধার করার পর মঙ্গলবার (৪ আগস্ট) তাদের দাফন করা হয়।
গাজা সিটির আবু শারিয়া ও আল-হাসাইনা পরিবারের স্বজনরা ফিলিস্তিনি পতাকায় মোড়ানো মরদেহগুলোর পাশে দাঁড়িয়ে শেষ বিদায় জানান।
হামলায় স্বজন হারানো আমের আবু শারিয়া বলেন, ‘আমরা একসঙ্গে আনন্দ ও কষ্ট— দুটোই অনুভব করছি। তিন বছর পর শহীদদের দাফন করতে পারছি, এটাই স্বস্তি। কিন্তু মনে হচ্ছে, হত্যাকাণ্ডটি যেন আজই ঘটেছে।’
২০২৩ সালের নভেম্বরে গাজার সাবরা এলাকায় ইসরায়েলি যুদ্ধবিমান একটি আবাসিক ব্লকে হামলা চালায়। সেখানে আবু শারিয়া ও আল-হাসাইনা পরিবারের শত শত সদস্য বসবাস করতেন এবং আশ্রয় নিয়েছিলেন।
এই হামলায় ৩০০ জনের বেশি মানুষ নিহত হন। নিহতদের মধ্যে ৪৪ শিশু, ৩৭ নারী এবং ১০ জনের বেশি প্রতিবন্ধী ব্যক্তি ছিলেন। ভবন ধসে পড়ায় অধিকাংশ মরদেহ ধ্বংসস্তূপের নিচেই চাপা পড়ে যায়।
যুদ্ধের শুরুতে প্রয়োজনীয় ভারী যন্ত্রপাতির অভাবে উদ্ধার অভিযান চালানো সম্ভব হয়নি। ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের দাবি, ইসরায়েলের কারণে এসব যন্ত্রপাতি গাজায় প্রবেশও করতে পারেনি।
গত ১৪ জুলাই সীমিত সরঞ্জাম নিয়ে ফিলিস্তিনি সিভিল ডিফেন্স আবারও উদ্ধার অভিযান শুরু করে। বিস্ফোরণের তীব্রতায় মানবদেহের বিভিন্ন অংশ ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকায় উদ্ধারকাজ আরও কঠিন হয়ে পড়ে।
১ আগস্ট পর্যন্ত ১৭ দিনের অভিযানে ১১২ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। কর্মকর্তারা বলছেন, এখনো আরও অনেক মরদেহ ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে আছে।
গাজার সিভিল ডিফেন্সের মুখপাত্র মাহমুদ বাসাল বলেন, ‘অত্যন্ত কঠিন পরিস্থিতিতে ১৭ দিন কাজ করে আমরা ১১২ জনের মরদেহ উদ্ধার করেছি। কিন্তু এখনও হাজারো মানুষ ধ্বংসস্তূপের নিচে পড়ে আছেন। তাদের স্বজনরা এখনো মরদেহ উদ্ধারের অপেক্ষায় আছেন।’
নিহতদের মধ্যে ছিলেন পরিবারের প্রধান বা মুখতার ফাতি আবু শারিয়া। তার বাড়িতে হামলার পর অনেকেই আশ্রয় নেন মুফিদ আল-হাসাইনার বাড়িতে। তিনি ২০১৪ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের গণপূর্ত ও আবাসনমন্ত্রী ছিলেন এবং যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকও ছিলেন।
বেঁচে ফেরা মাহমুদ আল-হাসাইনা জানান, প্রায় ২০০ আত্মীয় ওই বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিলেন। তারা ভেবেছিলেন, বাড়িটি নিরাপদ থাকবে। কিন্তু সেটিতেও বোমা হামলা হয়। এতে সাবেক মন্ত্রীসহ আশ্রয় নেওয়া প্রায় সবাই নিহত হন।
তিনি বলেন, ‘ইসরায়েলের শিশু, নারী, কোনো বাড়ি বা মানবিকতার কোনো কিছুরই সম্মান দেখায়নি। তারা সবাইকে লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে।’
হামলার সময় মাহমুদ আল-হাসাইনা সেখানে ছিলেন না। তবে তার ছেলে আহত হন। এ ছাড়া ভাই, দুই বোন, তাদের সন্তানসহ অসংখ্য আত্মীয়কে তিনি হারিয়েছেন।
তিনি বলেন, ‘প্রতিবার একটি মরদেহ উদ্ধার হলে বিদেশে থাকা স্বজনরা ফোন করে কান্না করতেন। যেন আমাদের ক্ষত বারবার নতুন করে খুলে যেত।’
গাজার নিখোঁজ ব্যক্তিবিষয়ক সরকারি কমিটির প্রধান ওমর নোফাল জানান, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ছয় হাজার মানুষ আনুষ্ঠানিকভাবে নিখোঁজ হিসেবে নিবন্ধিত হয়েছেন। তবে প্রকৃত সংখ্যা প্রায় ১৫ হাজার হতে পারে। তাদের অনেকেই এখনো ধসে পড়া ভবনের নিচে চাপা পড়ে আছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ফিলিস্তিনের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ইসরাইলের হামলায় ৭৩ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত এবং ১একলাখ ৭০ হাজারের বেশি আহত হয়েছেন। এ ছাড়া এখনো হাজারো মানুষ ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে আছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।






