ইতিহাসে পহেলা রমজানে আন্দালুস বিজয় ও মসজিদে নববিতে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা
পবিত্র রমজান মাস মুসলিম উম্মাহর এটি ‘মহা বিজয়ের মাস’ হিসেবেও স্বীকৃত। নবুয়তের যুগে ঐতিহাসিক বদর যুদ্ধের মাধ্যমে এই মাসেই ইসলামের প্রথম বিজয় এসেছিল। রমজানেই মক্কা বিজয়ের মাধ্যমে চূর্ণ হয়েছিল আরবের দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত পৌত্তলিকতা।
খেলাফতের যুগে পারস্য বিজয়ের অন্যতম সোপান কাসিদিয়া যুদ্ধ কিংবা পরবর্তীতে তাতারদের দর্প চূর্ণকারী আইন জালুত যুদ্ধ—সবই ছিল রমজানের অমর উপাখ্যান।
তবে এই সোনালি ইতিহাসের পাতায় ‘আন্দালুস’ বা স্পেন বিজয়ের গল্পটি সবচেয়ে বিয়োগান্তক। ৯১ হিজরির পহেলা রমজানে একটি ছোট এবং সতর্ক সামরিক অভিযানের মাধ্যমে যে পথচলা শুরু হয়েছিল, তা পরবর্তী ৮০০ বছর ইউরোপের বুকে মুসলিম সভ্যতার বাতিঘর হয়।
মুসা ইবনে নুসাইরের দূরদর্শিতা
আফ্রিকায় ইসলামি শাসন সুসংহত হওয়ার পর মুসলিম সেনাপতি মুসা ইবনে নুসাইরের দৃষ্টি পড়েছিল ভূমধ্যসাগরের ওপারের ভূখণ্ড আন্দালুসের দিকে। তৎকালীন আন্দালুস ছিল গথিক রাজা ‘লড্রিক’-এর (Loderick) শাসনাধীন।
লড্রিকের জুলুম, মাত্রাতিরিক্ত কর এবং দাসত্বে সাধারণ মানুষ ছিল অতিষ্ঠ। ঠিক সেই সময়ে স্পেনের সেউটা (Ceuta) অঞ্চলের গভর্নর জুলিয়ান রাজা রড্রিকের ওপর ব্যক্তিগত প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য (তার কন্যার শ্লীলতাহানির কারণে) মুসলিমদের সাহায্য প্রার্থনা করেন।
সুযোগটি চমৎকার হলেও মুসা ইবনে নুসাইর কোনো হঠকারী সিদ্ধান্ত নেননি। তিনি উমাইয়া খলিফা ওয়ালিদ ইবনে আব্দুল মালিকের অনুমতি চাইলেন। খলিফা সতর্ক বার্তা পাঠিয়ে লিখলেন, “প্রথমে ছোট ছোট সেনাদল পাঠিয়ে ভূমিটি পরীক্ষা করো। উত্তাল সমুদ্রের ঢেউয়ের মুখে মুসলিমদের জীবনকে ঝুঁকিতে ফেলো না।”
তারিফ ইবনে মালেক
খলিফার নির্দেশ পালন করতে মুসা ইবনে নুসাইর ৫০০ সৈন্যের একটি ছোট বিশেষ দল গঠন করেন, যার মধ্যে ১০০ জন ছিলেন অশ্বারোহী আর ৪০০ জন পদাতিক। এই দলের নেতৃত্বে দেওয়া হয় বার্বার বংশোদ্ভূত অত্যন্ত সাহসী ও ধর্মপ্রাণ যোদ্ধা তারিফ ইবনে মালেককে (যাঁর ডাকনাম ছিল আবু জুরআ)।
৯১ হিজরির রমজান মাসে (৭১০ খ্রিষ্টাব্দের জুলাই) চারটি জাহাজে চড়ে তারিফ ও তার বাহিনী সমুদ্র পাড়ি দেন। তারা আইবেরীয় উপদ্বীপের একেবারে দক্ষিণ প্রান্তে ‘পালোমা’ নামক একটি দ্বীপে অবতরণ করেন। ইতিহাস সেই বীর সেনাপতির নামকে অমর করে রাখতে দ্বীপটির নাম বদলে দেয়; যা আজ অবধি আমাদের কাছে ‘জাজিরাতু তারিফ’ বা ‘তারিফা দ্বীপ’ নামে পরিচিত।
তারিফ ইবনে মালেকের এই অভিযানটি ছিল মূলত একটি ‘রেকি’ বা গোয়েন্দা অভিযান। এর লক্ষ্য ছিল তিনটি:
১. প্রতিরক্ষা যাচাই: দক্ষিণ উপকূলে অতর্কিত হামলা চালিয়ে তিনি দেখলেন গথিকদের প্রতিরোধ ব্যবস্থা অত্যন্ত নড়বড়ে।
২. তথ্য সংগ্রহ: তিনি অঞ্চলের ভৌগোলিক গঠন, শত্রুর অবস্থান এবং রাজা রড্রিকের প্রতি জনগণের ক্ষোভের মাত্রা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করেন।
৩. সাফল্যের নিশ্চয়তা: কোনো বড় ক্ষয়ক্ষতি ছাড়াই প্রচুর গনিমত নিয়ে তিনি ফিরে আসেন, যা প্রমাণ করে যে আন্দালুস জয়ের জন্য একটি উর্বর ভূমি।
এই অভিযানের সাফল্যের এক বছর পর অর্থাৎ ৯২ হিজরিতে মুসা ইবনে নুসাইর তাঁর প্রধান সেনাপতি তারিক ইবনে জিয়াদকে পাঠান বিশাল বাহিনী দিয়ে। ৯১ হিজরির পহেলা রমজানের সেই ছোট পদক্ষেপটিই ছিল ৯২ হিজরির ঐতিহাসিক আন্দালুস বিজয়ের ভিত্তি।
বালাতুশ শোহাদা
আন্দালুস বিজয়ের ধারাবাহিকতায় ১১৪ হিজরির রমজান মাসে সংঘটিত হয় ইসলামের ইতিহাসের অন্যতম রক্তক্ষয়ী ও ভাগ্যনির্ধারক যুদ্ধ ‘বালাতুশ শোহাদা’ (Battle of Tours)। বর্তমান ফ্রান্সের ট্যুরস এবং পোয়াতিয়ে শহরের মধ্যবর্তী অঞ্চলে উমাইয়া সেনাপতি আব্দুর রহমান আল-গাফেকি এবং ফ্রাঙ্কিশ নেতা চার্লস মার্টেলের বাহিনীর মধ্যে এই যুদ্ধ হয়।
টানা কয়েকদিন বীরত্বের সঙ্গে লড়াই করার পর যুদ্ধের এক পর্যায়ে মুসলিম বাহিনীর পেছনের সারিতে বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। গুজব ছড়িয়ে পড়ে যে তাদের সংগৃহীত গনিমত হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে। এই বিশৃঙ্খলার সুযোগে সেনাপতি আব্দুর রহমান আল-গাফেকি শাহাদাত বরণ করেন। (ইমাম জাহাবি, সিয়ারু আলামিন নুবালা, ৫/৩২৩, মুয়াসসাসাতুর রিসালাহ, বৈরুত, ১৯৮৫)
সেনাপতির মৃত্যুতে মুসলিম বাহিনী পিছু হটতে বাধ্য হয়। এই যুদ্ধে অসংখ্য মুসলিম সৈন্য শহীদ হওয়ায় একে ‘শহীদদের চত্বর’ বা বালাতুশ শোহাদা বলা হয়।
মসজিদে নববিতে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড
পহেলা রমজানের ইতিহাসে বিজয়ের আনন্দের পাশাপাশি একটি গভীর শোকের ঘটনাও রয়েছে। ৬৫৪ হিজরির (১২৫৬ খ্রিষ্টাব্দ) পহেলা রমজানে মদিনার মসজিদে নববিতে এক ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ঘটে। ইতিহাসবিদদের মতে, মসজিদের এক খাদেম অসাবধানতাবশত প্রদীপ জ্বালিয়ে রেখে যাওয়ায় আগুনের সূত্রপাত হয় এবং তা মুহূর্তেই পুরো মসজিদে ছড়িয়ে পড়ে।
এই আগুনে মসজিদে নববির ছাদ ধসে পড়ে এবং আল্লাহর রাসুল (সা.)-এর আমলের বহু পবিত্র নিদর্শনাদি পুড়ে ছাই হয়ে যায়। উমাইয়া ও আব্বাসীয় খলিফাদের তৈরি করা কারুকার্যখচিত মিম্বর, দরজা, মূল্যবান পাণ্ডুলিপি এবং লাইব্রেরি এই আগুনে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
এমনকি হুজরা মোবারকের গিলাফ এবং তার একাংশ এই অগ্নিকাণ্ডের কবলে পড়ে। মদিনাবাসীর জন্য এটি ছিল ইতিহাসের অন্যতম এক ট্র্যাজেডি। সূত্র: আল–জাজিরা ডটনেট






