কোরআনের বাণী
যেদিন আতঙ্কে কেঁপে উঠবে সমগ্র সৃষ্টি
আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআনে ইরশাদ করেন, يَا أَيُّهَا النَّاسُ اتَّقُوا رَبَّكُمْ إِنَّ زَلْزَلَةَ السَّاعَةِ شَيْءٌ عَظِيمٌ
সরল অনুবাদ: ‘হে মানুষ! তোমরা তোমাদের রবকে ভয় করো (তাঁর তাকওয়া অবলম্বন করো)। নিশ্চয়ই কিয়ামতের প্রকম্পন এক ভয়ংকর ব্যাপার। ’ (সুরা : হজ, আয়াত : ১)
সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা :
এই আয়াতে আল্লাহ তাআলা সমগ্র মানবজাতিকে সম্বোধন করে তাঁর তাকওয়া অবলম্বনের নির্দেশ দিয়েছেন। কারণ, কিয়ামত এমন এক মহাভয়ংকর ঘটনা, যার আতঙ্কে মানুষের স্বাভাবিক বোধবুদ্ধি, স্থিরতা ও সাহস বিপর্যস্ত হয়ে পড়বে। পৃথিবীর পরিচিত পরিবেশ, মানুষের পার্থিব শক্তি কিংবা সম্পদ—কোনোটিই সেদিন আল্লাহর সামনে জবাবদিহি থেকে কাউকে রক্ষা করতে পারবে না। তাই কিয়ামতের ভয়াবহতা স্মরণ করিয়ে দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আল্লাহ মানুষকে তাকওয়া অবলম্বনের নির্দেশ দিয়েছেন, যাতে তারা দুনিয়াতেই নিজেদের জীবনকে সংশোধন করে পরকালের প্রস্তুতি গ্রহণ করে।
কিয়ামতের ভয়াবহতা সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর বর্ণনা
বিশিষ্ট সাহাবি আবু সাঈদ খুদরি (রা.) থেকে বর্ণিত দীর্ঘ একটি হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) কিয়ামতের এই আয়াতের ভয়াবহতা ব্যাখ্যা করেছেন। বর্ণনায় এসেছে, এক সফরে এই আয়াত নাজিল হলে রাসুলুল্লাহ (সা.) উচ্চকণ্ঠে তা তিলাওয়াত করেন। তাঁর কণ্ঠ শুনে সাহাবায়ে কেরাম তাঁর কাছে সমবেত হন। তখন তিনি তাঁদের জিজ্ঞেস করেন, ‘তোমরা কি জানো, এই দিনটি কেমন দিন?’ সাহাবায়ে কেরাম আরজ করলেন, ‘আল্লাহ ও তাঁর রাসুলই সর্বাধিক জ্ঞাত।
রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁদের জানান, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলা আদম (আ.)-কে সম্বোধন করে জাহান্নামের উপযুক্ত লোকদের আলাদা করতে বলবেন। আদম (আ.) জানতে চাইবেন, কতজনকে আলাদা করতে হবে? তখন তাঁকে জানানো হবে, প্রতি এক হাজারের মধ্যে ৯৯৯ জনকে জাহান্নামের জন্য আলাদা করতে হবে। এই সংবাদ শুনে সাহাবায়ে কেরাম অত্যন্ত ভীত হয়ে পড়েন। তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁদের ব্যাখ্যা করেন, ওই বিপুল সংখ্যার মধ্যে ইয়াজুজ-মাজুজের অংশ থাকবে এবং মুসলিম উম্মাহর তুলনামূলকভাবে অল্পসংখ্যক মানুষ সেই হিসাবের অন্তর্ভুক্ত হবে। (তিরমিজি, হাদিস : ৩১৬৯; সহিহ ইবনে হিব্বান, হাদিস: ৭৩৫৪)
কিয়ামতের ভয়াবহ প্রকম্পন
কিয়ামতের প্রকম্পন কখন সংঘটিত হবে—পৃথিবী ধ্বংস হওয়ার আগে, নাকি পুনরুত্থান ও হাশরের ময়দানে সমবেত হওয়ার পর—এ বিষয়ে মুফাসসিরদের মধ্যে একাধিক ব্যাখ্যা পাওয়া যায়।
১. প্রথমবার শিঙায় ফুঁক দেওয়া : আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘আর শিঙায় ফুঁক দেওয়া হবে, ফলে আসমানসমূহ ও জমিনে যারা আছে, তারা সবাই অচেতন হয়ে পড়বে, তবে আল্লাহ যাদের ইচ্ছা করেন তারা ছাড়া। তারপর আবার তাতে ফুঁক দেওয়া হবে, তখনই তারা দাঁড়িয়ে তাকাতে থাকবে।’ (সুরা : জুমার, আয়াত : ৬৮)
এই আয়াত থেকে বোঝা যায়, প্রথম ফুঁকে আল্লাহর ইচ্ছানুযায়ী সৃষ্টিজগতের বিদ্যমান ব্যবস্থা বিপর্যস্ত হবে এবং একপর্যায়ে বর্তমান জগতের অবসান ঘটবে। এরপর দ্বিতীয়বার ফুঁক দেওয়ার মাধ্যমে মানুষ পুনরুত্থিত হবে এবং আল্লাহর সামনে উপস্থিত হবে। কোরআনের অন্য আয়াতেও পৃথিবী ও পাহাড়ের ভয়াবহ পরিবর্তনের বিবরণ এসেছে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘যখন শিঙায় একবার ফুঁক দেওয়া হবে, আর পৃথিবী ও পর্বতমালাকে তুলে নিয়ে এক আঘাতে চূর্ণবিচূর্ণ করে দেওয়া হবে, সেদিন মহা ঘটনাটি সংঘটিত হবে।’ (সুরা : হাক্কাহ, আয়াত : ১৩–১৫)
২. পুনরুত্থানের পরের ভয়াবহতা: কিছু মুফাসসিরের মতে, সুরা হজের প্রথম আয়াতে বর্ণিত কিয়ামতের প্রকম্পন বলতে হাশরের ময়দানে সংঘটিত ভয়াবহ পরিস্থিতিকে বোঝানো হয়েছে। এ ব্যাখ্যার পক্ষে আদম (আ.)-কে তাঁর বংশধরদের মধ্য থেকে জাহান্নামের উপযুক্ত লোকদের পৃথক করার নির্দেশসংক্রান্ত হাদিসকে দলিল হিসেবে উপস্থাপন করা হয়।
হাদিসে ইরশাদ হয়েছে, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলা আদম (আ.)-কে সম্বোধন করবেন এবং তাঁর বংশধরদের মধ্য থেকে জাহান্নামের জন্য নির্ধারিত অংশ পৃথক করার নির্দেশ দেবেন। এই ঘোষণা মানুষের মধ্যে গভীর আতঙ্ক সৃষ্টি করবে। এ সময় মানুষের সামনে তাদের চূড়ান্ত পরিণতির ভয়াবহতা স্পষ্ট হয়ে উঠবে। দুনিয়ার জীবন, সম্পদ, ক্ষমতা ও প্রভাবের মোহ তখন কোনো কাজে আসবে না। প্রত্যেককে নিজের ঈমান, আমল ও আল্লাহর কাছে জবাবদিহির বিষয়টি উপলব্ধি করতে হবে। (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৩১৭০)
আয়াতের ব্যাখ্যায় দুটি মত
প্রথম মত: কিয়ামতের প্রকম্পন বলতে পৃথিবী ধ্বংস হওয়ার পূর্ববর্তী বা ধ্বংসের সূচনাকালীন ভয়াবহ কম্পন ও বিপর্যয়কে বোঝানো হয়েছে। এ সময় পৃথিবী, পাহাড়-পর্বত ও সমগ্র জগতের বর্তমান ব্যবস্থা ভেঙে পড়বে।
দ্বিতীয় মত: আয়াতে বর্ণিত প্রকম্পন বলতে পুনরুত্থান ও হাশরের ময়দানে সংঘটিত ভয়াবহ পরিস্থিতিকে বোঝানো হয়েছে। আদম (আ.)-কে তাঁর বংশধরদের মধ্য থেকে জাহান্নামের উপযুক্ত লোকদের পৃথক করার নির্দেশসংক্রান্ত হাদিস এ ব্যাখ্যার অন্যতম ভিত্তি। কিছু আলেমের ব্যাখ্যায় এ দুই মতের মধ্যে সমন্বয়ের সুযোগ রয়েছে। কারণ, কিয়ামতের পূর্বে পৃথিবীর ভয়াবহ পরিবর্তন এবং পুনরুত্থানের পর হাশরের ময়দানে মানুষের আতঙ্ক—দুটিই কোরআন ও হাদিসে বর্ণিত পৃথক ভয়াবহ ঘটনা।
কিয়ামতের ভয়াবহতা স্মরণ করিয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্য
১. তাকওয়া অবলম্বন করা: আল্লাহর আদেশ পালন করা এবং তাঁর নিষেধ থেকে বিরত থাকাই তাকওয়ার মূল শিক্ষা।
২. দুনিয়ার জীবনকে চূড়ান্ত মনে না করা: পার্থিব জীবন ক্ষণস্থায়ী। তাই দুনিয়ার সাফল্যের পাশাপাশি আখিরাতের মুক্তির জন্যও প্রস্তুতি নিতে হবে।
৩. ঈমান ও নেক আমলে যত্নবান হওয়া: কিয়ামতের ভয়াবহতা স্মরণ মানুষকে নামাজ, রোজা, দান-সদকা, উত্তম চরিত্র ও মানুষের অধিকার রক্ষায় সচেতন করে।
৪. গুনাহ থেকে তওবা করা: মানুষ ভুল করতে পারে, কিন্তু ভুলের ওপর অবিচল থাকা উচিত নয়। আন্তরিক তওবা করে আল্লাহর দিকে ফিরে আসতে হবে।
৫. আল্লাহর রহমতের আশা রাখা: কিয়ামতের ভয়াবহতা স্মরণ করার অর্থ আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হওয়া নয়। বরং ভয় ও আশার সমন্বয়ে জীবন পরিচালনা করাই মুমিনের বৈশিষ্ট্য।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে যথাযথভাবে তাকওয়া অবলম্বন করার, কিয়ামতের ভয়াবহতা থেকে নিরাপদ থাকার এবং তাঁর সন্তুষ্টি অর্জনের তাওফিক দান করুন। আমিন।







