যেসব কারণে মানুষ দুনিয়া ও আখিরাতে পিছিয়ে থাকে
আমরা প্রত্যেকেই চাই যে আমাদের ঈমান-আমল সুন্দর হোক। দুনিয়া ও আখিরাত হালালভাবে সুসজ্জিত হোক। কিন্তু আমরা সে মোতাবেক পদক্ষেপ নিতে পারি না। কারণ আমাদের বেশির ভাগেরই সমস্যা হলো আমাদের একটি মাইন্ড সেট। তা হলো যে কাজ শুরু করার ক্ষেত্রে আমাদের চিন্তা হলো—‘আজ না, কাল থেকে শুরু করব। কাল থেকে ঠিক মতো নামাজ পড়ব।
নতুন নতুন স্কিল শিখব কিংবা হালাল কোনো ব্যবসায় নামব।’ কিন্তু বাস্তবতা হলো বেশির ভাগ মানুষের ক্ষেত্রেই সেই কাল আর কোনো দিনও হয়ে ওঠে না। নিম্নে কোরআন-হাদিসের আলোকে আমাদের পিছিয়ে থাকার কিছু কারণ ও প্রতিকার তুলে ধরা হলো—
সময়কে হালকাভাবে নেওয়া: সময় খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আল্লাহ তাআলা সুরা আল-আসরের শুরুতেই সময়ের শপথ করেছেন। তারপর বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই মানুষ ক্ষতির মধ্যে আছে। তবে তারা ব্যতীত, যারা ঈমান আনে, সৎকর্ম করে, পরস্পরকে সত্যের উপদেশ দেয় এবং ধৈর্যের উপদেশ দেয়।’ (সুরা : আসর, আয়াত : ১-৩)
এই সুরা দ্বারা বোঝা যায়, যে জাতি বা ব্যক্তি সময়ের মূল্য বোঝে না, তার জন্য পিছিয়ে পড়া স্বাভাবিক। সময় এমন এক পুঁজি, যা খরচ হয়ে গেলে আর ফেরত পাওয়া যায় না। তাই সময় থাকতে তা কাজে লাগানো উচিত। কোনো নেক কাজ করার ক্ষেত্রে ‘আগামী কাল’কের জন্য বা ‘পরে করার’ অপেক্ষা না করে, আজ থেকেই শুরু করা উচিত।
গুনাহের অভ্যাস ও তাওবা বিলম্বে
করা : অনেকেই ভাবে, এখন যৌবন, এই বয়সে একটু পাপ করে নিই, পরে ভালো করে তাওবা করব। এই চিন্তাই মানুষকে আটকে রাখে। গুনাহ যত দীর্ঘ হয়, অন্তর তত ভারী হয় এবং ভালো কাজের প্রতি আগ্রহ কমে যায়। হাদিস শরিফে ইরশাদ হয়েছে, ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত, মহানবী (সা.) বলেছেন, কিয়ামত দিবসে পাঁচটি বিষয় সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ হওয়ার আগ পর্যন্ত আদম সন্তানের পদদ্বয় আল্লাহর নিকট থেকে সরতে পারবে না। তার জীবনকাল সম্পর্কে, কিভাবে অতিবাহিত করেছে? তার যৌবনকাল সম্পর্কে, কী কাজে তা বিনাশ করেছে; তার ধন-সম্পদ সম্পর্কে, কোথা হতে তা উপার্জন করেছে এবং তা কী কী খাতে খরচ করেছে এবং সে যতটুকু জ্ঞান অর্জন করেছিল সে মোতাবেক কী কী আমল করেছে। (তিরমিজি, হাদিস : ২৪১৬)
তাই মুমিনের উচিত গুনাহ ত্যাগ করা এবং গুনাহ হয়ে গেলে তাৎক্ষণিক তাওবা করা।
অলসতা ও অক্ষমতার অজুহাত: অলসতা আর অক্ষমতা এক জিনিস নয়, তবু মানুষ প্রায়ই একটিকে অন্যটির আড়ালে লুকায়। অথচ কল্যাণ লাভের ক্ষেত্রে অলসতা করা বোকামি। মুমিনের উচিত মহান আল্লাহর কাছে অলসতা ও অক্ষমতা থেকে আশ্রয় চাওয়া এবং কল্যাণ লাভে আগ্রহী হওয়া। নবী (সা.) বলেন, শক্তিশালী মুমিন দুর্বল মুমিনের চেয়ে উত্তম এবং আল্লাহর নিকট অধিক প্রিয়। অবশ্য উভয়ের মধ্যেই কল্যাণ রয়েছে। তুমি তোমার জন্য উপকারী জিনিসের আকাঙ্ক্ষা করো; আল্লাহর সাহায্য চাও এবং কখনো অক্ষমতা প্রকাশ কোরো না। তোমার কোনো ক্ষতি হলে বলো না, যদি আমি এভাবে করতাম, বরং তুমি বলো, আল্লাহ যা নির্ধারণ করেছেন এবং তিনি যা চান তাই করেন। কেননা ‘লাও’ (যদি) শব্দটি শয়তানের তৎপরতার দ্বার খুলে দেয়। (ইবনে মাজাহ, হাদিস : ৭৯)
অতএব, অলসতা ও অক্ষমতার অজুহাতে শয়তানকে সুযোগ দেওয়া যাবে না।
ভুল সঙ্গ ও পরিবেশ: মানুষ পরিবেশের প্রভাবে বদলায়। যে সভায় গিবত ও অনর্থক কথা বেশি হয়, সেখানে বসে থাকলে মন ধীরে ধীরে সেই রঙে রঙিন হয়। আবার যাদের সঙ্গে থাকলে কোরআন, নামাজ ও সৎ কাজের কথা ওঠে, তাদের সঙ্গ অন্তরকে জাগিয়ে রাখে। মহানবী (সা.) বলেন, মানুষ তার বন্ধুর রীতিনীতির অনুসারী হয়। কাজেই তোমাদের প্রত্যেকেই যেন লক্ষ করে, সে কার সঙ্গে বন্ধুত্ব করছে। (আবু দাউদ, হাদিস : ৪৮৩৩)
ভুল তাওয়াক্কুল: কিছু মানুষ তাওয়াক্কুলকে বোঝে চেষ্টা ছাড়ার নাম হিসেবে। অথচ ইসলামের শিক্ষা উল্টো। আনাস ইবনে মালিক (রা.) বলেন, কোনো একজন লোক বলল, ‘হে আল্লাহর রাসুল (সা.)! আমি কি সেটা (উট) বেঁধে রেখে আল্লাহর ওপর ভরসা করব, না বাঁধন খুলে রেখে আল্লাহর ওপর ভরসা করব?’ তিনি বললেন, ‘তুমি সেটা বেঁধে রেখে আল্লাহর ওপর ভরসা করবে।’ (তিরমিজি, হাদিস : ২৫১৭)
নিরাশা ও ব্যর্থতার ভয়: অনেকে মনে করে, আমি এত বড় গুনাহগার, আল্লাহ কি আমায় মাফ করবেন? (নাউজুবিল্লাহ!)। এই নিরাশা শয়তানের সবচেয়ে কার্যকর অস্ত্র। এটাকে প্রশ্রয় দেওয়া যাবে না। আল্লাহ বলেন, ‘হে আমার বান্দাগণ, যারা নিজেদের ওপর বাড়াবাড়ি করেছ, তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। অবশ্যই আল্লাহ সব পাপ ক্ষমা করে দেবেন। নিশ্চয়ই তিনি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।’ (সুরা : যুমার, আয়াত : ৫৩)
অতএব, আল্লাহর রহমত থেকে কোনো অবস্থায়ই নৈরাশ হওয়া যাবে না। দ্বিনি বিষয় হোক কিংবা দুনিয়াবি কল্যাণকর বিষয়—সব কিছুতে মহান আল্লাহর সাহায্য প্রার্থনা করতে হবে। কোরআন-হাদিসের নির্দেশনা মানতে হবে। অলসতা ত্যাগ করে সময়মতো পদক্ষেপ নিতে হবে। সফলতা দেওয়ার মালিক মহান আল্লাহ। কারো কারো ক্ষেত্রে এই সফলতা টাকা-পয়সার অঙ্ক হয়ে দেখা না দিলেও তাদের ওপর মহান আল্লাহর রহমত সর্বাবস্থায় থাকবে।
মহান আল্লাহ আমাদের সময়ের মূল্য বোঝার, তাওবার মাধ্যমে গুনাহের পথ থেকে দ্রুত ফেরার এবং ভালো কাজে অবিচল থাকার তাওফিক দান করুন। আমিন।







