কৃপণতার অন্ধকার ও দানের আলো
মানুষের চরিত্রের ভেতরে কিছু প্রবণতা আছে, যা তাকে ধীরে ধীরে সংকীর্ণ করে ফেলে। হৃদয়কে ছোট করে, দৃষ্টিকে সীমাবদ্ধ করে এবং সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়। কৃপণতা তেমনই এক ব্যাধি। এটি শুধু সম্পদ না দেওয়ার নাম নয়; বরং এটি এক ধরনের মানসিক দারিদ্র্য, যেখানে মানুষ আল্লাহর দেওয়া নেয়ামত থাকা সত্ত্বেও তা ব্যয় করতে কুণ্ঠিত হয়।
ইসলাম এই অহেতুক কৃপণতাকে কখনো সমর্থন করে না; বরং উদারতা, দানশীলতা ও ভারসাম্যপূর্ণ ব্যয়ের শিক্ষা দেয়।
পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ তাআলা স্পষ্টভাবে সতর্ক করেছেন—
وَلَا يَحْسَبَنَّ الَّذِينَ يَبْخَلُونَ بِمَا آتَاهُمُ اللَّهُ مِن فَضْلِهِ هُوَ خَيْرًا لَّهُم ۖ بَلْ هُوَ شَرٌّ لَّهُمْ
“যারা আল্লাহ তাদের অনুগ্রহ করে যা দিয়েছেন, তা নিয়ে কৃপণতা করে, তারা যেন মনে না করে যে এটা তাদের জন্য কল্যাণকর; বরং এটা তাদের জন্য অকল্যাণকর।” (সুরা : আলে ইমরান, আয়াত : ১৮০)
এই আয়াত কৃপণতার অন্তর্নিহিত ক্ষতিকে উন্মোচন করে। মানুষ মনে করে, সম্পদ আঁকড়ে ধরলে তা রক্ষা পাবে; অথচ কোরআন বলছে, এই কৃপণতাই তার জন্য বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়াবে।কারণ সম্পদ নিজেই উদ্দেশ্য নয়; এটি একটি আমানত, যার সঠিক ব্যবহারই প্রকৃত সফলতা।
আরেক জায়গায় মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বলেন—
وَلَا تَجْعَلْ يَدَكَ مَغْلُولَةً إِلَىٰ عُنُقِكَ وَلَا تَبْسُطْهَا كُلَّ الْبَسْطِ
“তুমি তোমার হাত গলায় বেঁধে রেখো না (অর্থাৎ কৃপণ হয়ো না), আবার একেবারে পুরোপুরি খুলেও দিয়ো না (অপব্যয়ও করো না)।” (সুরা বনি ইসরাইল, আয়াত : ২৯)
এখানেই ইসলামের সৌন্দর্য। এটি চরম পন্থা পছন্দ করে না।
যেমন অপচয় নিন্দিত, তেমনি কৃপণতাও নিন্দিত। ইসলাম মানুষকে শিখিয়েছে একটি মধ্যপন্থা, যেখানে ব্যয় হবে প্রয়োজন অনুযায়ী, কিন্তু হৃদয় থাকবে উদার।
রাসুলুল্লাহ (সা.) কৃপণতার ভয়াবহতা সম্পর্কে আরো কঠোর ভাষায় সতর্ক করে বলেছেন,
وَاتَّقُوا الشُّحَّ فَإِنَّ الشُّحَّ أَهْلَكَ مَنْ كَانَ قَبْلَكُمْ حَمَلَهُمْ عَلَى أَنْ سَفَكُوا دِمَاءَهُمْ وَاسْتَحَلُّوا مَحَارِمَهُمْ
“তোমরা কৃপণতা থেকে সাবধান হও। কেননা এ কৃপণতাই তোমাদের আগেকার কাওমকে ধ্বংস করেছে। এ কৃপণতা তাদের খুন-খারারি ও রক্তপাতে উৎসাহ জুগিয়েছে এবং হারাম বস্তুসমূহ হালালজ্ঞান করতে প্রলোভন দিয়েছে।” (মুসলিম, হাদিস : ২৫৭৮)
এই হাদিস আমাদের একটি গভীর সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করায়; কৃপণতা শুধু ব্যক্তিগত দোষ নয়; এটি সামাজিক বিপর্যয়েরও কারণ হতে পারে। যখন মানুষ নিজের স্বার্থকে সব কিছুর ওপরে স্থান দেয়, তখন ন্যায়-অন্যায় বোধ ম্লান হয়ে যায়।
অন্য এক হাদিসে রাসুল (সা.) বলেন,
السَّخِيُّ قَرِيبٌ مِنَ اللَّهِ قَرِيبٌ مِنَ الْجَنَّةِ قَرِيبٌ مِنَ النَّاسِ بَعِيدٌ مِنَ النَّارِ وَالْبَخِيلُ بَعِيدٌ مِنَ اللَّهِ بَعِيدٌ مِنَ الْجَنَّةِ بَعِيدٌ مِنَ النَّاسِ قَرِيبٌ مِنَ النَّارِ وَلَجَاهِلٌ سَخِيٌّ أَحَبُّ إِلَى اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ مِنْ عَابِدٍ بَخِيلٍ ” .
“দানশীল ব্যক্তি আল্লাহ্ তাআলার নিকটবর্তী, জান্নাতের নিকটবর্তী, মানুষের নিকটবর্তী এবং জাহান্নাম হতে দূরবর্তী। কৃপণ ব্যক্তি আল্লাহ্ তাআলা হতে দূরবর্তী, জান্নাত হতে দূরবর্তী, মানুষের নিকট হতেও দূরবর্তী, কিন্তু জাহান্নামের নিকটবর্তী। আল্লাহ তাআলার নিকটে কৃপণ আলেম ব্যক্তির চেয়ে মূর্খ দানশীল ব্যক্তি বেশী প্রিয়।” (তিরমিজি, হাদিস: ১৯৬১)
এই বাণীতে দানশীলতা ও কৃপণতার পরিণতি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে। কৃপণতা মানুষকে আল্লাহ থেকে দূরে সরিয়ে দেয়, কারণ সে আল্লাহর দেওয়া নেয়ামতের যথাযথ কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে না।
প্রকৃতপক্ষে, কৃপণতার মূল কারণ হলো; রিজিকের ব্যাপারে অবিশ্বাস এবং ভবিষ্যতের ভয়। অথচ একজন মুমিন জানে, রিজিকের মালিক আল্লাহ। পবিত্র কোরআনুল কারীমে বলা হয়েছে—
وَمَا أَنفَقْتُم مِّن شَيْءٍ فَهُوَ يُخْلِفُهُ
“তোমরা যা কিছু ব্যয় করো, তিনি তার পরিবর্তে (আরও) দিয়ে দেন।” (সুরা : সাবা আয়াত : ৩৯)
এই বিশ্বাস যখন হৃদয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়, তখন দান করা কঠিন থাকে না। বরং মানুষ উপলব্ধি করে, সে যা দিচ্ছে, তা হারাচ্ছে না; বরং সংরক্ষণ করছে আখিরাতের জন্য।
তবে ইসলাম অন্ধভাবে ব্যয় করার শিক্ষা দেয় না। দান হবে হালাল উপার্জন থেকে, যথাযথ স্থানে এবং আন্তরিক নিয়তে। একই সঙ্গে নিজের ও পরিবারের প্রয়োজন উপেক্ষা করে দান করাও ইসলাম সমর্থন করে না। এ কারণেই পবিত্র কোরআন ভারসাম্যের শিক্ষা দিয়েছে; না কৃপণতা, না অপচয়।
আমাদের সমাজে অনেক সময় দেখা যায়, মানুষ বিলাসিতায় খরচ করতে কুণ্ঠিত হয় না, কিন্তু গরিব-দুঃখীর হক দিতে সংকোচ বোধ করে। আবার কেউ কেউ আত্মীয়-স্বজনের প্রয়োজনেও সাহায্য করতে চায় না। এই মনোভাবই কৃপণতার প্রকৃত রূপ, যা ইসলামের দৃষ্টিতে নিন্দনীয়।
অতএব, একজন মুমিনের কর্তব্য হলো; নিজের অন্তরকে কৃপণতার এই রোগ থেকে মুক্ত করা। আল্লাহর দেওয়া নেয়ামতের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা দানের মাধ্যমে, সহমর্মিতার মাধ্যমে, মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মাধ্যমে। কারণ, সম্পদ মানুষের মর্যাদা নির্ধারণ করে না; বরং সে সম্পদ কীভাবে ব্যয় করে, সেটিই তার প্রকৃত পরিচয় তুলে ধরে।
কাজেই অহেতুক কৃপণতা মানুষকে নিরাপত্তা দেয় না, বরং তাকে সংকীর্ণতা ও অশান্তির দিকে ঠেলে দেয়। আর উদারতা মানুষকে প্রশান্তি দেয়, ভালোবাসা এনে দেয় এবং আল্লাহর নৈকট্যের পথে এগিয়ে দেয়। তাই কৃপণতা নয়, উদারতাই হোক আমাদের জীবনের নীতি।







