মহাস্থানগড়ে মিলল সুলতানি আমলের নিদর্শন
বগুড়ার মহাস্থানগড় দুর্গনগরীতে বাংলাদেশ ও ফ্রান্সের যৌথ পরীক্ষামূলক খননে পাওয়া গেছে অন্তত ৬০০ বছরের পুরোনো ইটের তৈরি অবকাঠামো, মাটির থালাসহ বিভিন্ন ধরনের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন। ওই দুর্গনগরীর দক্ষিণে তাম্রদুয়ার এলাকায় খননে দুই দেশের প্রত্নতাত্ত্বিকরা একটি কূপও পেয়েছেন।
মহাস্থানগড় জাদুঘরের কাস্টোডিয়ান রাজিয়া সুলতানা জানান, এর আগেও বৈরাগী ভিটাসহ বিভিন্ন এলাকায় যৌথ খননে পাওয়া যায় ইটের তৈরি নানা ধরনের অবকাঠামো, কূপ, মাটির গুটিকা, নর্দান ব্ল্যাক পলিশড ওয়ার (এনবিপিডব্লিউ), পোড়া মাটির ফলক, পটারিসহ নানা ধরনের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন।
রাজিয়া সুলতানা বলেন, ‘১০ নভেম্বর শুরু হয় এ পরীক্ষামূলক খনন। এতে পাওয়া নিদর্শনগুলোর মধ্যে বেশির ভাগই পটারি। তবে অন্যান্য নিদর্শনও আছে, তবে তা সংখ্যায় খুবই কম।’ দুই দেশের এ খনন দলে রয়েছেন ৭ জন প্রত্নতাত্ত্বিক। বাংলাদেশ দলে আছেন রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের আঞ্চলিক পরিচালক এ কে এম সাইফুর রহমান ও রাজিয়া সুলতানা। ফ্রান্সের দলে আছেন কলিন লিফ্রাঙ্কসহ ৫ জন। এ দলের পরিচালক কলিন লিফ্রাঙ্ক ও তার সহকর্মীরা পরীক্ষামূলকভাবে বিভিন্ন স্থানে খনন করেছেন ৬টি ট্রেঞ্চ।
কলিন লিফ্রাঙ্ক জানান, খননে দুটি কূপ, কয়েকটি মাটির গুটিকা, পুনরায় ব্যবহার্য ইটের তৈরি মেঝে আর বিপুলসংখ্যক পটারি পাওয়া গেছে। তবে একটি ট্রেঞ্চে পাওয়া গেছে প্রায় অক্ষত একটি মাটির থালা।
তিনি আরও জানান, এবার খননে কয়েক টুকরা এনবিপি পাওয়া গেলেও সেসব মাটির উপরি ভাগে থাকায় অনুমান করা হচ্ছে, এনবিপিগুলো অন্য জায়গা থেকে আনা। পরীক্ষামূলক এ খনন নতুন করে পরিকল্পনা তৈরিতে সহায়তা করতে পারে জানিয়ে কলিন লিফ্রাঙ্ক বলেন, ‘মহাস্থান সাইট অনেক বড় আর সে কারণে পরিকল্পিত খনন জরুরি। এতে করে গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে বেশি আর সঠিক ইতিহাসও জানা যায়।’
প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের রাজশাহী ও রংপুর অঞ্চলের দায়িত্বে থাকা আঞ্চলিক পরিচালক এ কে এম সাইফুর রহমান জানান, এ পরীক্ষামূলক খননে পাওয়া তথ্যের ওপর ভিত্তি করে আগামীতে খননের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
এ খননের সঙ্গে সম্পৃক্ত প্রত্নতাত্ত্বিকরা জানান, যেসব নিদর্শন পাওয়া গেছে তার একটি বড় অংশ সুলতানি আমলের। তবে ইট, এনবিপিসহ আরও প্রাচীন নিদর্শন আছে কিন্তু তা অন্য স্থান থেকে আনা হয়েছে। তবে রিং ওয়েল বা কূপগুলো মাটির খুব বেশি নিচে না হলেও যেখানে তৈরি হয়েছে, যেখানে-সেখানেই পরিত্যক্ত হয়েছে।
পরীক্ষার আগে খননে পাওয়া পটারি, মাটির গুটিকা ও অন্য নিদর্শনগুলো কোন আমলের এ বিষয়টি বলা কঠিন জানিয়ে প্রত্নতাত্ত্বিকরা বলছেন, এসব নিদর্শন আগেও পাওয়া গেছে। কিন্তু কোন জায়গায় কী অবস্থায় পাওয়া গেল এ মুহূর্তে সেটি গুরুত্বপূর্ণ।
মহাস্থান দুর্গনগরীতে বিভিন্ন সময় খননে নানা ধরনের নিদর্শনের সঙ্গে ধাতব ও পাথরে তৈরি নানা ধরনের সামগ্রী পাওয়া গেলেও এ খননে ধাতব কোনো নিদর্শন পাওয়া যায়নি। বেশির ভাগ নিদর্শনই পাওয়া গেছে ২ মিটারের মধ্যেই। দেয়াল ও মেঝেগুলোর আর কোনো লিংক পাওয়া গেছে কি না, এ প্রশ্নের জবাবে কলিন লিফ্রাঙ্ক ও রাজিয়া সুলতানা জানান, খনন যেহেতু পুরোপুরি করা হয়নি, সে কারণে বোঝা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে তবে গাঁথুনির ধারাবাহিকতা থেকে অনুমান করা যায়, ট্রেঞ্চের বাইরে মাটির নিচে দেয়ালের খানিকটা আছে। দক্ষিণ এশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ এ প্রত্নতাত্ত্বিক সাইটে বাংলাদেশ ও ফ্রান্স বিভিন্ন সময় যৌথ খননে পেয়েছে যিশুখ্রিষ্টের জন্মেরও বহু বছর আগে তৈরি মাটির চুলা, এনবিপিসহ নানা ধরনের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন।
প্রত্নতাত্ত্বিকরা মনে করেন, দেশের সবচেয়ে প্রাচীন এ সাইটটি সঠিকভাবে খনন করা গেলে ইতিহাস ও ঐতিহ্য সম্পর্কে জানা যাবে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য।







