মুহাম্মদ (সা.)-এর বর্ণনায় কিয়ামত-পূর্ব সমাজচিত্র
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উম্মতের ভবিষ্যৎ অবস্থা সম্পর্কে হাদিসে বহু গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ দিয়েছেন। যেগুলো শুধু কিয়ামতের আলামতই নয়, বরং প্রত্যেক যুগের মানুষের জন্য সতর্কবার্তা ও আত্মসমালোচনার আয়নাও বটে। মানুষের জ্ঞানচর্চা, সময়ের বরকত, সামাজিক শান্তি ও মানবিক নিরাপত্তা যখন ক্রমশ দুর্বল হতে থাকে, তখন তা আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বর্ণিত নিদর্শনের সঙ্গে আশ্চর্যভাবে মিলে যায়। এমনই এক গভীর তাৎপর্যপূর্ণ হাদিসে তিনি কিয়ামতের পূর্ববর্তী সমাজচিত্র আমাদের সামনে তুলে ধরেছেন।
যা আজকের বাস্তবতার সঙ্গে বিস্ময়করভাবে সাদৃশ্যপূর্ণ। হাদিসে বর্ণিত হয়েছে-
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ قَالَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم لاَ تَقُومُ السَّاعَةُ حَتَّى يُقْبَضَ الْعِلْمُ وَتَكْثُرَ الزَّلَازِلُ وَيَتَقَارَبَ الزَّمَانُ وَتَظْهَرَ الْفِتَنُ وَيَكْثُرَ الْهَرْجُ وَهُوَ الْقَتْلُ حَتَّى يَكْثُرَ فِيكُمْ الْمَالُ فَيَفِيضَ.
আবূ হুরাইরাহ্ (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: ক্বিয়ামাত (কিয়ামত) কায়িম হবে না, যে পর্যন্ত না ইলম উঠিয়ে নেয়া হবে, অধিক পরিমাণে ভূমিকম্প হবে, সময় সংকুচিত হয়ে আসবে, ফিতনা প্রকাশ পাবে এবং হারজ বৃদ্ধি পাবে। হারজ হলো খুন-খারাবী। তোমাদের ধন-সম্পদ এত বৃদ্ধি পাবে যে, উপচে পড়বে। (বুখারি, হাদিস : ১০৩৬)
এই হাদিসে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কিয়ামতের পূর্ববর্তী সময়ের কয়েকটি সুস্পষ্ট চিত্র উল্লেখ করেছেন। যেগুলোকে কিয়ামতের প্রকাশ্য আলামত হিসেবে আমরা জানি। সেগুলো হচ্ছে:
১. ইলম উঠিয়ে নেওয়া হবে
এখানে ইলম উঠে যাওয়ার অর্থ এই নয় যে, কিতাব-পুস্তক হঠাৎ পৃথিবী থেকে হারিয়ে যাবে; বরং প্রকৃত দ্বিনি ইলম বহনকারী আলেমদের ইন্তেকালের মাধ্যমে সমাজ থেকে সহিহ জ্ঞান ক্রমে বিলুপ্ত হয়ে যাবে।ফলে মানুষ অজ্ঞ নেতৃত্বের অনুসরণ করবে, নিজেরা না জেনে ফতোয়া দেবে এবং গোমরাহি ব্যাপক আকার ধারণ করবে।
২. অধিক পরিমাণে ভূমিকম্প হবে
ভূমিকম্পের আধিক্য শুধু প্রাকৃতিক বিপর্যয় নয়; বরং এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে সতর্কবার্তা। মানুষ যখন গুনাহ, জুলুম ও নাফরমানিতে সীমা লঙ্ঘন করে, তখন এ ধরনের ঘটনাবলি তাদেরকে তাওবার দিকে আহ্বান করে এবং আল্লাহর শক্তির কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।
৩. সময় সংকুচিত হয়ে আসবে
সময় সংকুচিত হওয়ার অর্থ হলো; সময়ের বরকত উঠে যাবে। অল্প সময়েই দিন, মাস ও বছর পার হয়ে যাবে; মানুষ অনুভব করবে যে, অনেক কাজ করেও যেন কিছুই করা হয়নি।ব্যস্ততা বাড়বে, কিন্তু ফলপ্রসূতা কমে যাবে।
৪. ফিতনা প্রকাশ পাবে
ফিতনা বলতে আকিদা, চরিত্র, রাজনীতি, সমাজ ও পারিবারিক জীবনে বিভ্রান্তি ও বিশৃঙ্খলাকে বোঝানো হয়েছে। হক ও বাতিলের পার্থক্য অস্পষ্ট হয়ে যাবে, সত্যের পক্ষে দাঁড়ানো কঠিন হবে এবং মিথ্যা নানা রূপে গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠবে।
৫. হারজ বৃদ্ধি পাবে (খুন-খারাবি)
হারজ অর্থ নির্বিচার হত্যা ও রক্তপাত। মানুষ কেন কাউকে হত্যা করছে, নিজেরাও তা স্পষ্টভাবে জানবে না। মানবজীবনের মূল্য তুচ্ছ হয়ে যাবে এবং সামান্য কারণে বড় সহিংসতা সংঘটিত হবে।
৬. ধন-সম্পদের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি
সম্পদ বাড়বে, কিন্তু তাতে বরকত থাকবে না। ধনী মানুষের সংখ্যা বাড়লেও প্রকৃত তৃপ্তি ও নিরাপত্তা কমে যাবে। যাকাত ও সদকা দেওয়ার মতো মানুষ খুঁজে পাওয়া কঠিন হবে, অথচ অন্তরে প্রশান্তি থাকবে না।
মোটকথা এই হাদিস আমাদেরকে কেবল ভবিষ্যতের সংবাদই দেয় না; বরং আত্মশুদ্ধি, ইলমের প্রতি যত্নশীল হওয়া, ফিতনা থেকে বাঁচা এবং মানবিক মূল্যবোধ রক্ষার জন্য এক গভীর সতর্কবার্তা প্রদান করে।






