ঐতিহাসিক ষাট গম্বুজ মসজিদের ইতিহাস ও স্থাপত্যশৈলী
বাংলার স্থাপত্য ইতিহাসে এক বিস্ময়কর নাম ‘ষাট গম্বুজ মসজিদ’। আধুনিক স্থাপত্য যখন জ্যামিতিক নকশায় সীমাবদ্ধ, তখন বাগেরহাটের দক্ষিণ-পশ্চিমে দাঁড়িয়ে থাকা এই প্রাচীন নিদর্শনটি যেন হার মানাচ্ছে আধুনিকতাকেও। ১৫শ শতাব্দীতে নির্মিত এই মসজিদটি কেবল একটি ইবাদতখানা নয়, বরং এটি সুলতানি আমলের শৌর্য, আধ্যাত্মিকতা ও প্রকৌশলবিদ্যার এক অনন্য সংমিশ্রণ।
রহস্যঘেরা ইতিহাস ও নির্মাণশৈলী
মসজিদটির গায়ে কোনো শিলালিপি নেই, নেই নির্মাণের সুনির্দিষ্ট দিনক্ষণ। তবে এর স্থাপত্যশৈলী বলে দেয়—এটি পীর খান জাহান আলীর (রহ.) অমর কীর্তি। জনশ্রুতি আছে, মসজিদের জন্য বিশালাকার পাথরগুলো তিনি অলৌকিক ক্ষমতায় চট্টগ্রাম কিংবা ভারতের উড়িষ্যার রাজমহল থেকে পানিপথে ভাসিয়ে এনেছিলেন। মূলত চুন, সুরকি, কালো পাথর আর ছোট ইটের নিখুঁত গাঁথুনিতে তৈরি এই ইমারতটি মধ্য এশিয়ার তুঘলক স্থাপত্যরীতির কথা মনে করিয়ে দেয়। নাম শুনে যে কেউ মনে করতে পারেন এখানে ৬০টি গম্বুজ আছে। কিন্তু আদতে মসজিদের ছাদজুড়ে আছে ৭৭টি গম্বুজ। এর সাথে চার কোণের মিনারের ওপর আরও ৪টি গম্বুজ মিলিয়ে মোট সংখ্যাটি দাঁড়ায় ৮১-তে। তবুও কেন এর নাম ‘ষাট গম্বুজ’? ঐতিহাসিকদের মতে, ‘ছাদ গম্বুজ’ (ছাদওয়ালা গম্বুজ) থেকে অপভ্রংশ হয়ে এটি ‘ষাট গম্বুজ’ হয়েছে। আবার অনেকের ধারণা, মসজিদের ভেতরে পাথরের তৈরি ৬০টি বিশাল স্তম্ভ বা পিলারের ওপর ছাদটি দাঁড়িয়ে আছে বলেই এর নাম হয়েছে ষাট গম্বুজ।
স্থাপত্যের গহীনে এক ভ্রমণ
মসজিদটি উত্তর-দক্ষিণে ১৬০ ফুট লম্বা এবং দেয়ালে ৮.৫ ফুট পুরুত্বের এক দুর্ভেদ্য কাঠামো। ভেতরে প্রবেশ করলে চোখে পড়বে সারিবদ্ধ পাথরের স্তম্ভ, যা সাতটি লাইনে বিভক্ত। ছাদের মাঝখানের সাতটি গম্বুজ অনেকটা বাংলার চিরাচরিত ‘চৌচালা’ ঘরের চালের মতো, যা একে অন্যান্য মসজিদ থেকে আলাদা করেছে।
মসজিদের চার কোণে রয়েছে চারটি মিনার। এর মধ্যে সামনের দুটির ভেতরে রয়েছে প্যাঁচানো সিঁড়ি, যেখান থেকে একসময় আজান দেওয়া হতো। দক্ষিণ-পূর্ব কোণের সিঁড়িটির নাম ‘রওশন কোঠা’ আর উত্তর-পূর্ব কোণেরটির নাম ‘আন্ধার কোঠা’। পশ্চিম দেয়ালে থাকা ১০টি চমৎকার মিহরাব এবং উত্তর পাশের একটি ছোট দরজা ইঙ্গিত দেয় যে, এটি হয়তো শুধু নামাজ নয়, বরং খান জাহান আলীর দরবার ঘর বা মাদ্রাসা হিসেবেও ব্যবহৃত হতো।
বিশ্ব ঐতিহ্যের স্বীকৃতি ও বর্তমান
১৯৮৫ সালে ইউনেস্কো বাগেরহাট শহরসহ এই মসজিদটিকে ‘বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান’ হিসেবে ঘোষণা করে। বর্তমানে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের অধীনে সংরক্ষিত এই মসজিদ চত্বরেই রয়েছে বাগেরহাট জাদুঘর। সেখানে দেখা মেলে খানজাহান আমলের প্রাচীন মুদ্রা, পোড়ামাটির ফলক এবং দিঘির বিখ্যাত কুমির ‘কালা পাহাড়’ ও ‘ধলা পাহাড়’-এর মমি।
পর্যটকদের হাতছানি
প্রতিদিন দেশ-বিদেশের হাজারো পর্যটক এই প্রাচীন সৌন্দর্য দেখতে ভিড় করেন। ঢাকা বা দেশের যেকোনো প্রান্ত থেকে বাগেরহাট বাসস্ট্যান্ডে নেমে সহজেই ইজিবাইক বা অটোরিকশা করে পৌঁছানো যায় এই মসজিদে। দক্ষিণাঞ্চলের সর্ববৃহৎ ঈদের জামাতও অনুষ্ঠিত হয় এই প্রাঙ্গণে, যেখানে প্রায় অর্ধলাখ মুসল্লি একসঙ্গে সিজদাহ করেন। নামাজ পড়ার জন্য পর্যটক ও স্থানীয়দের বিশেষ সুযোগ থাকলেও দর্শনার্থী হিসেবে প্রবেশের জন্য নির্দিষ্ট ফি ও সময় মেনে চলতে হয়। ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা এই ষাট গম্বুজ মসজিদ শুধু একটি ভবন নয়; এটি আমাদের পূর্বপুরুষদের রুচি, মেধা এবং দীর্ঘ পরিশ্রমের এক জীবন্ত দলিল।







