পাখিরা যেভাবে নির্বাচন করে

পাখিদের জীবনে প্রজনন একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়, আর সেই অধ্যায়ের কেন্দ্রবিন্দু হলো নিরাপদ বাসা। প্রেম, প্রতিযোগিতা ও টিকে থাকার প্রয়োজন মিলিয়ে তারা এমন একটি স্থান খুঁজে নিতে চায়, যেখানে ডিম ও ছানারা নিরাপদে বেড়ে উঠতে পারে। এই নির্বাচন মোটেও এলোমেলো নয়; সহজাত প্রবৃত্তি, পরিবেশগত ইঙ্গিত, খাদ্যের প্রাপ্যতা এবং শিকারির ঝুঁকি—সবকিছু বিবেচনায় নিয়ে পাখিরা নিখুঁত বাসস্থান নির্বাচন করে।
প্রতিটি পাখির প্রজাতির নির্দিষ্ট পরিবেশগত চাহিদা থাকে। যেমন কাঠঠোকরা নরম বা আংশিক পচে যাওয়া গাছ পছন্দ করে, বিশেষ করে হার্টরট ছত্রাকে আক্রান্ত গাছ। এতে গাছের ভেতরের অংশ নরম হওয়ায় গহ্বর খনন সহজ হয়, কিন্তু বাইরের শক্ত স্তর বাসাকে সুরক্ষা দেয়। দাঁড়িয়ে থাকা মৃত গাছ বা স্নাগ তাদের জন্য প্রায়শই আদর্শ। অর্থাৎ, ভেতরে নরম ও বাইরে শক্ত কাঠের সমন্বয় তাদের বাসা নির্মাণে সহায়ক হয়।
খাদ্য ও পানির সহজলভ্যতা বাসা নির্বাচনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত। কীটভোজী পাখি পোকামাকড়সমৃদ্ধ এলাকা খোঁজে, বীজভোজীরা বীজসমৃদ্ধ পরিবেশ বেছে নেয়, আর শিকারি পাখিরা শিকারের উপযোগী খোলা স্থান পছন্দ করে। টাক ঈগল সাধারণত নদী, হ্রদ বা উপকূলের কাছাকাছি লম্বা ও শক্ত গাছে বাসা বাঁধে, যাতে মাছ ধরার সুবিধা থাকে এবং চারপাশ পরিষ্কারভাবে দেখা যায়। তাদের বিশাল ও ভারী বাসা সমর্থন করতে পারে এমন গাছই তারা নির্বাচন করে।
শিকারির ঝুঁকি কমানোও বাসাস্থান নির্বাচনের বড় কারণ। আমেরিকান রবিন সাধারণত ঘন পাতার আড়ালে বা গাছের ডালের মধ্যে মাটি থেকে কিছুটা উঁচুতে বাসা বাঁধে, যাতে মাটির শিকারিরা সহজে পৌঁছাতে না পারে। শহর ও শহরতলির এলাকায় তারা ধারে, ছাদের নিচে বা কৃত্রিম কাঠামোতেও বাসা বাঁধতে অভিযোজিত হয়েছে। বিপদের সময় তারা অ্যালার্ম ডাক দেয় এবং প্রয়োজনে আক্রমণাত্মক আচরণও করে।
অনেক পাখি বাসার চারপাশে নিজস্ব অঞ্চল প্রতিষ্ঠা করে এবং তা রক্ষা করে। এতে খাদ্য ও অন্যান্য সম্পদের ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ থাকে এবং প্রতিযোগিতা কমে। কাকের মতো পাখি লম্বা গাছে বাসা বানিয়ে আশপাশ নজরদারি করে এবং অনুপ্রবেশকারীদের বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মকভাবে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। কিছু পাখি বছরের পর বছর একই স্থানে ফিরে আসে, যদি পূর্বের অভিজ্ঞতা সফল হয়।
কিছু পাখি জটিল বাসা না বানিয়ে ছদ্মবেশের ওপর নির্ভর করে। কিলডিয়ার খোলা ও সমতল জায়গায় মাটিতে অগভীর গর্ত তৈরি করে ডিম পাড়ে। ডিমের দাগ ও রং আশপাশের মাটির সঙ্গে মিশে যায়, ফলে শিকারিদের চোখ এড়ানো সহজ হয়। বিপদের সময় তারা ভাঙা ডানার ভান করে শিকারিকে বাসা থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। তাদের ছানারা অকাল বিকশিত অবস্থায় জন্মায়, ফলে দ্রুত চলাফেরা করতে পারে।
আরও বিস্ময়কর উদাহরণ হলো হোয়াইট টার্ন, যারা প্রায় কোনো বাসাই তৈরি করে না। তারা গাছের খালি ডালের ওপর সরাসরি একটি ডিম পাড়ে। ডিমের রং ও দাগ এমনভাবে থাকে যে দূর থেকে তা সহজে বোঝা যায় না। ছানারা শক্ত নখর নিয়ে জন্মায়, যাতে ডাল আঁকড়ে থাকতে পারে। যদিও এই পদ্ধতি ঝুঁকিপূর্ণ, তবুও তাদের বিশেষ অভিযোজনই তাদের টিকে থাকতে সাহায্য করে।
সব মিলিয়ে বলতে গেলে পাখিদের বাসা বাঁধার স্থান নির্বাচন একটি সুপরিকল্পিত ও কৌশলগত প্রক্রিয়া। খাদ্য, নিরাপত্তা, পরিবেশ ও অভিজ্ঞতার সমন্বয়ে তারা এমন স্থান বেছে নেয়, যা তাদের প্রজনন সাফল্যের সম্ভাবনা সর্বাধিক করে। সহজাত প্রবৃত্তি ও শেখা আচরণের এই সমন্বয়ই পাখিদের টিকে থাকার মূল শক্তি।





