সাদোমে মৃত সাগরের তীরে হারিয়ে যাওয়া নগরী
সাদোম, যা ‘পাপের নগরী’ বা ‘লুত সম্প্রদায়ের জনপদ’ নামেও পরিচিত—একটি প্রাচীন ও ঐতিহাসিক শহর, যার উল্লেখ প্রাচীন ইতিহাস, তাওরাত এবং কোরআনেও পাওয়া যায়। এই জনপদের অধিবাসীরা নৈতিক অবক্ষয় ও সমকামিতাসহ নানা অনাচারে লিপ্ত ছিল। আর এসব পাপাচারের কারণেই আল্লাহ তাদের ধ্বংস করে দিয়েছিলেন।
ইতিহাসবিদদের ধারণা অনুযায়ী, সাদোমের অস্তিত্বকাল আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ৩৫০০ থেকে ১৫৪০ অব্দের মধ্যে।
প্রসিদ্ধ মত অনুযায়ী সাদোম গ্রামটি ছিল বর্তমান মৃত সাগরের দক্ষিণ তীরে অবস্থিত। ধারণা করা হয়, ওই অঞ্চলে একসময় একটি ভয়াবহ ভূমিকম্প সংঘটিত হয়েছিল, যার ফলে ব্যাপক অগ্নিকাণ্ড ও ধ্বংস নেমে আসে। মৃত সাগর অঞ্চল সমুদ্রপৃষ্ঠের অনেক নিচে অবস্থিত এবং এর অতিরিক্ত লবণাক্ত জল জীবের অস্তিত্বের জন্য সম্পূর্ণ অনুপযোগী, যা এই এলাকাকে আরো রহস্যময় করে তুলেছে।
সাদোম গ্রামের কাহিনি
নবী লুত (আ.) ইবরাহিম (আ.)-এর জন্মের বছরেই জন্মগ্রহণ করেন। আল্লাহ তাঁকে তাঁর নিজ সম্প্রদায়ের কাছে নবী হিসেবে প্রেরণ করেছিলেন, কারণ সে জাতি চরম নৈতিক অবক্ষয়ে নিমজ্জিত ছিল এবং প্রকাশ্যে সমকামিতাসহ নানা অনাচারে লিপ্ত। নবী লুত (আ.) তাদের এসব কুকর্ম থেকে বিরত থাকার আহবান জানান এবং আল্লাহর কঠিন শাস্তির ব্যাপারে সতর্ক করে দেন। কিন্তু তাঁর জাতি তাঁর আহবান অগ্রাহ্য করে এবং তাঁকে প্রত্যাখ্যান করে। তখন নবী লুত (আ.) আল্লাহর সাহায্য কামনা করেন।
আল্লাহ তাঁর দোয়া কবুল করে পুরুষের রূপ ধারণকারী দুজন ফেরেশতাকে পাঠান। ফেরেশতারা লুত (আ.)-এর কাছে পৌঁছানোর আগে ইবরাহিম (আ.)-এর কাছে যান এবং তাঁকে সুসংবাদ দেন যে তাঁর স্ত্রী একটি পুত্রসন্তানের জন্ম দেবেন।
পাশাপাশি তারা লুতের জাতির প্রতি তাদের প্রেরণের উদ্দেশ্যও ইবরাহিম (আ.)-কে জানিয়ে দেন। এরপর সেই দুই ফেরেশতা লুত (আ.)-এর গৃহে অতিথি হিসেবে উপস্থিত হন। নবী লুত তাদের সাদরে গ্রহণ করেন।
কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই তাঁর জাতির লোকেরা জানতে পারে যে তাঁর ঘরে অপরিচিত অতিথি এসেছে। তখন তারা কু-উদ্দেশ্যে লুতের বাড়ির চারপাশে জড়ো হয়ে অতিথিদের ক্ষতি করার চেষ্টা করে। এ দৃশ্য দেখে নবী লুত (আ.) অত্যন্ত ভীত ও উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন এবং নিজের জাতির লোকদের কাছে অনুনয়-বিনয় করে বলেন—যেন তারা তাঁর অতিথিদের কোনো ক্ষতি না করে। কিন্তু তারা তাঁর কোনো কথা শোনেনি। পরদিন ভোরে আল্লাহর পক্ষ থেকে এক ভয়াবহ ও ধ্বংসাত্মক শাস্তি নেমে আসে। পুরো গ্রামটি সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস হয়ে যায়। তখন লুত (আ.) সেই এলাকা ত্যাগ করে ইবরাহিম (আ.)-এর সঙ্গে হিজরত করেন।
সাদোমের আবিষ্কার
সাদোম গ্রামটির আবিষ্কারের ঘোষণা দেওয়া হয় ১৫ অক্টোবর ২০১৫ সালে। ওই দিন আমেরিকান বিজ্ঞানীরা ব্রোঞ্জ যুগের একটি প্রাচীন শহরের ধ্বংসাবশেষ আবিষ্কারের কথা জানান।
দীর্ঘ গবেষণা ও প্রত্নতাত্ত্বিক বিশ্লেষণের পর তাঁরা মত প্রকাশ করেন যে এই ধ্বংসাবশেষই ঐতিহাসিক সাদোম ও গোমোরার জনপদ। কারণ এর ভৌগোলিক অবস্থান, কাঠামোগত বৈশিষ্ট্য এবং ধ্বংসের চিহ্নগুলোর সঙ্গে তাওরাত ও কোরআনে বর্ণিত সাদোমের বিবরণের উল্লেখযোগ্য মিল পাওয়া যায়। তবে এই আবিষ্কার কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়, বরং এর পেছনে ছিল প্রায় এক দশকব্যাপী নিরলস গবেষণা ও খননকাজ। ২০০৫ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত চলা এই দীর্ঘ অনুসন্ধান ও প্রত্নতাত্ত্বিক কার্যক্রমের ফল হিসেবেই সাদোম সম্পর্কিত এই গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা সম্ভব হয়।







