সাওমের ইতিহাস: আদম (আ.) থেকে মুহাম্মদ (সা.) পর্যন্ত
রোজা বা সাওম এমন এক ইবাদত, যার শিকড় মানবসভ্যতার সূচনালগ্ন পর্যন্ত বিস্তৃত। এটি শুধু শরিয়তের অংশ নয়; বরং সমগ্র মানবজাতির আধ্যাত্মিক ইতিহাসে এটি আত্মসংযম, কৃতজ্ঞতা ও আল্লাহভীতির এক অমূল্য প্রতীক।
প্রথম রোজাদার: ইমাম সুয়ুতি (রহ.) তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘আল-ওয়াসাইল ইলা মারিফাতিল আওয়াইল’-এ উল্লেখ করেছেন যে মানবজাতির প্রথম রোজাদার ছিলেন আদম (আ.)। তিনি প্রতি মাসে তিন দিন রোজা রাখতেন।
আর তিনি প্রথম রোজা রেখেছিলেন আল্লাহর কাছে তার তাওবা কবুল হওয়ার কৃতজ্ঞতাস্বরূপ। এই বর্ণনাটি ইবনে আসাকির ও খতিব আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদের সূত্রে উল্লেখ করেছেন। ইবনে আবি হাতেমের সূত্রে আরেকটি বর্ণনা পাওয়া যায় যে নুহ (আ.) ছিলেন প্রথম রোজাদার। তিনি প্রতি মাসে তিন দিন রোজা রাখতেন এবং সন্ধ্যার নামাজের পর ইফতার করতেন।
তিনি রোজা রেখেছিলেন মহাপ্লাবনের পর নৌকা থেকে নেমে আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতাস্বরূপ। এরপর নুহ (আ.) রোজা রাখেন তাঁর উদ্ধার ও রক্ষা পাওয়ার আনন্দে। এই ধারাবাহিকতা শেষ পর্যন্ত এসে পূর্ণতা পায় নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর রোজার মাধ্যমে। এ ছাড়া রোজার আরেক রূপও ইতিহাসে বিদ্যমান—‘কথা বলা থেকে বিরত থাকা’।
আল্লাহর নির্দেশে জাকারিয়া (আ.) ও মরিয়ম (আ.) এ ধরনের রোজা পালন করেছিলেন। আল্লাহ তাআলা মরিয়ম (আ.)-এর সম্পর্কে বলেন, ‘অতএব, যদি তুমি কোনো মানুষকে দেখতে পাও, তবে বলো, আমি পরম করুণাময়ের উদ্দেশ্যে নীরব থাকার মানত করেছি, তাই আজ আমি কোনো মানুষের সঙ্গে কথা বলব না।’ (সুরা : মরিয়ম, আয়াত : ২৬)
পূর্ববর্তী জাতিদের রোজা : রোজা শুধু ইসলামী উম্মতের জন্যই নির্ধারিত নয়, বরং এটি পূর্ববর্তী অনেক জাতির ওপরও ফরজ ছিল। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে ঈমানদাররা! তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেমন তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর ফরজ করা হয়েছিল, যাতে তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পারো।’ (সুরা : বাকারাহ, আয়াত : ১৮৩) ইহুদি ও খ্রিস্টানদের বহু গ্রন্থে রোজার উল্লেখ পাওয়া যায়।
তাদের মধ্যে রোজা ছিল তাওবা, দুঃখ বা বিপদের সময়ে আত্মসমর্পণ ও প্রার্থনার এক মাধ্যম। তাওরাতে বলা হয়েছে, মুসা (আ.) ৪০ দিন রোজা রেখেছিলেন। ইহুদিরা পাপ মোচনের উদ্দেশ্যে প্রার্থনার সময় রোজা পালন করত। সারা বছরও তাদের রোজা নির্দিষ্ট ধর্মীয় উপলক্ষ ও অনুষ্ঠানের সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল। খ্রিস্টধর্মেও রোজার অনুশীলন সুস্পষ্ট। ইনজিলে উল্লেখ আছে, ঈসা (আ.) ৪০ দিন রোজা রেখেছিলেন এবং তাঁর শিষ্যরাও তাঁর সঙ্গে রোজা পালন করতেন।
দাউদ (আ.)-এর রোজা সম্পর্কে হাদিস বর্ণিত হয়েছে। আবদুল্লাহ ইবন আমর ইবন আল-আস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) আমাকে বলেছেন, তুমি কি সব সময় রোজা রাখো আর রাতভর নামাজ আদায় করে থাকো? আমি বললাম, হ্যাঁ। তিনি বলেন, এরূপ করলে তোমার চোখ বসে যাবে এবং শরীর দুর্বল হয়ে যাবে। যে বছরজুড়ে রোজা রাখল সে যেন রোজাই রাখল না। আর তুমি প্রতি মাসে তিন দিন করে রোজা রাখো, তাই বছরজুড়ে রোজা রাখা বা বছরজুড়ে রোজা রাখার মতো। তিনি বলেন, আমি এর চেয়ে বেশি সামর্থ্য রাখি। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, তাহলে তুমি দাউদ (আ.)-এর রোজা রাখো। তিনি এক দিন রোজা রাখতেন আর এক দিন রোজা ছেড়ে দিতেন। তিনি শত্রুর সম্মুখীন হলে পলায়ন করতেন না। (বুখারি, হাদিস : ১৮৭৮)
এসব উদাহরণ প্রমাণ করে যে রোজা সব নবী ও জাতির মধ্যে এক অভিন্ন আধ্যাত্মিক অনুশাসন হিসেবে প্রচলিত ছিল। ইসলামের রোজা পূর্ববর্তী জাতিগুলোর রোজার সঙ্গে মূল উদ্দেশ্যে এক—আত্মসংযম, কৃতজ্ঞতা ও তাকওয়া অর্জন। তবে এর পদ্ধতি, সময় ও বিধানিক কাঠামো ইসলামেই প্রথম পূর্ণাঙ্গ ও ভারসাম্যপূর্ণভাবে নির্ধারিত হয়।
ইসলামের আবির্ভাবের পর দ্বিতীয় হিজরিতে (৬২৪ খ্রিস্টাব্দ) রমজান মাসের রোজা ফরজ করা হয়। কোরআনে বলা হয়েছে, ‘রমজান সেই মাস, যাতে কোরআন নাজিল করা হয়েছে, যা মানুষের জন্য হেদায়েত এবং সত্য-মিথ্যার পার্থক্যকারী।’ (সুরা : বাকারাহ, আয়াত : ১৮৫)
আর ইসলামে সর্বপ্রথম রোজা পালনকারী ছিলেন নবী মুহাম্মদ (সা.)। তিনি ছিলেন ইসলামী শরিয়তের আওতায় রোজা রাখার প্রথম ব্যক্তি। রমজানের রোজা ফরজ হওয়ার আগে নবী (সা.) ও তাঁর সাহাবিরা আশুরার দিন এবং প্রতি মাসে তিন দিন করে রোজা রাখতেন। এটি ছিল আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের এক প্রশিক্ষণমূলক ইবাদত, যা পরবর্তী সময়ে রমজানের ফরজ রোজার মাধ্যমে পরিপূর্ণতা লাভ করে। রোজা ইসলামের একটি মৌলিক স্তম্ভ। এটি শুধু খাদ্য ও পানীয় থেকে বিরত থাকার নাম নয়, বরং আত্মশুদ্ধি, ধৈর্য, কৃতজ্ঞতা ও তাকওয়া অর্জনের এক মহৎ উপায়। আল্লাহ তাআলা রোজাকে বান্দা ও প্রভুর মধ্যকার একান্ত ইবাদত হিসেবে বর্ণনা করেছেন, যার প্রতিদান তিনি নিজেই প্রদান করবেন। তাই রোজা শুধু এক মাসের ইবাদত নয়; এটি আত্মসংযম, ধৈর্য ও তাকওয়ার এক অনন্ত শিক্ষা—যা মানুষকে আল্লাহর সান্নিধ্যে নিয়ে যায় এবং হৃদয়কে পরিশুদ্ধ করে।






