শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ৯০তম জন্মবার্ষিকী আজ
বহুদলীয় গণতন্ত্রের রূপকার, বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের জন্মদিন আজ। এ বছর বীরউত্তম খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম এই সংগঠকের ৯১তম জন্মদিন পালন করা হচ্ছে। দিবসটি উপলক্ষে দুদিনের কর্মসূচি ঘোষণা করেছে বিএনপি। বাণী দিয়েছেন দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
জিয়াউর রহমান ১৯৩৬ সালের ১৯ জানুয়ারি বগুড়া জেলার গাবতলীতে জন্মগ্রহণ করেন। তার ডাকনাম কমল। তার বাবা রসায়নবিদ মনসুর রহমান ও মা জাহানারা খাতুন রানী। পাঁচ ভাইয়ের মধ্যে দ্বিতীয়
জিয়াউর রহমান। ১৯৫৩ সালে তিনি তৎকালীন পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সেক্টর কমান্ডার হিসেবে বীরত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন জিয়াউর রহমান। মুক্তিযুদ্ধের একটি স্বতন্ত্র সেক্টরের দায়িত্বে ছিলেন তিনি। তার নামে গড়ে ওঠে জেড ফোর্স।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ২৫ আগস্ট তিনি সেনাবাহিনী প্রধান নিযুক্ত হন। একই বছরের ৭ নভেম্বর রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে অধিষ্ঠিত হন জিয়াউর রহমান। ১৯৭৬ সালের ২৯ নভেম্বর প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হিসেবে নিযুক্ত হন তিনি। ১৯৭৭ সালের ২১ এপ্রিল প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে বিপথগামী একদল সেনা সদস্যের হাতে শাহাদত বরণ করেন এই রাজনীতিক।
শহীদ জিয়া ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) প্রতিষ্ঠা করেন। তার প্রতিষ্ঠিত দল বিএনপি তিনবার রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় ছিল। এই দল প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে দেশে উন্নয়ন ও উৎপাদনের রাজনীতি শুরু করেন তিনি। তবে ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর থেকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার এক অভূতপূর্ব অভ্যুত্থানে মসনদচ্যুত হওয়ার আগ পর্যন্ত শেখ হাসিনার সরকার জিয়াউর রহমানকে নিয়ে ধারাবাহিক বিরুদ্ধপ্রচারণায় লিপ্ত ছিল। শেখ হাসিনা থেকে শুরু করে আওয়ামী লীগের ইউনিয়ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরাও তার মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকে কালিমালিপ্ত করার চেষ্টা করেছে। ‘মু্ক্তিযোদ্ধার ছদ্মাবরণে পাকিস্তানের চর’, ‘জিয়াউর রহমান তার পাপের কারণে হত্যার শিকার হয়েছেন’, ‘চন্দ্রিমা উদ্যানে জিয়ার সমাধিতে তার লাশ নেই’, ‘ধূর্ত এরশাদ লোক দেখাতে একটি বাক্স এনে সেখানে সমাহিত করেন’Ñইত্যাদি ভাষায় জিয়াউর রহমানকে আক্রমণ করা হয়েছে। এমনকি তার রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি বীরউত্তম খেতাব বাতিলের সিদ্ধান্ত নেয় স্বৈরাচার আওয়ামী লীগ সরকার। তবে জিয়াউর রহমানকে ভিলেন বানাতে গিয়ে আওয়ামী লীগ নিজেরাই জাতির কাছে ভিলেনে পরিণত হয়েছে বলে মনে করেন ইতিহাসবিদরা।
এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ সিদ্দিকুর রহমান খান আমার দেশ-কে বলেন, আওয়ামী লীগের শাসনামলে জিয়াউর রহমানকে ইতিহাসের খলচরিত্র হিসেবে উপস্থাপনের সর্বাত্মক চেষ্টা করা হয়েছে। মহান মুক্তিযুদ্ধে তার যে স্বাধীনতার ঘোষণা এবং মুক্তিযুদ্ধের রণক্ষেত্রে যে তার বীরত্বপূর্ণ অবদানÑসেগুলোকে একেবারে ভিন্নভাবে তুলে ধরে তাকে ইতিহাসের খলচরিত্র এবং জোরপূর্বক ক্ষমতা দখলকারী হিসেবে প্রতিপন্ন করার সর্বাত্মক চেষ্টা করা হয়েছে।
অধ্যাপক খান বলেন, আওয়ামী লীগের শাসনামলে অনেক অপচেষ্টা করেও মানুষের মনের মণিকোঠা থেকে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানকে মুছে ফেলা সম্ভব হয়নি। বরং তারা যত অপচেষ্টা চালিয়েছে এ দেশের মানুষের কাছে জিয়াউর রহমান ততটাই সমহিমায় উদ্ভাসিত হয়েছেন। এর নজির আমরা এখন দেখতে পাচ্ছি। আওয়ামী লীগ জিয়াউর রহমানের খেতাব বাতিল; কবর সরিয়ে ফেলার উদ্যোগ নিয়েছিল। পাঠ্যপুস্তক ও দেশের ইতিহাস থেকে তাকে একেবারেই নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার চেষ্টা করেছে তারা। তবে এটা ইতিহাসের রায় যে, যারা জিয়াউর রহমানকে ইতিহাসের খলচরিত্র হিসেবে স্থাপনের চেষ্টা করেছে, সময়ের আবর্তে তারাই ইতিহাসের খলচরিত্রে পরিণত হয়েছে।
সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের অবদান তুলে ধরে ইতিহাসের এই গবেষক বলেন, ‘বাংলাদেশকে অর্থনৈতিকভাবে স্বয়ংসম্পূর্ণ একটা রাষ্ট্রে পরিণত করার জন্য তিনি সর্বাত্মক উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন। বাংলাদেশিদের নতুন জাতীয়তাবাদের পরিচিত করে তিনি ভূখণ্ডভিত্তিক বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের প্রবর্তন করেন। জিয়াউর রহমান ছিলেন বাংলাদেশের প্রথম সর্বজনীন ভোটের ভিত্তিতে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট। তিনি সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানে বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম যুক্তকরণসহ বাংলাদেশকে অর্থনৈতিকভাবে স্বয়ংসম্পূর্ণ করার লক্ষ্যে উৎপাদনের রাজনীতি প্রবর্তন করেন। তার ১৯ দফা বৈজ্ঞানিক কর্মসূচির মাধ্যমে তিনি বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধন করেন।
জিয়াউর রহমান অর্থনীতিতে কৃষির ক্ষেত্রে বিপ্লব সাধন করেন উল্লেখ করে ড. সিদ্দিকুর রহমান আরো বলেন, আমাদের বর্তমান বাংলাদেশের অর্থনৈতিক দুটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হলো পোশাক খাত ও প্রবাসী আয়। শহীদ জিয়া দেশে গার্মেন্ট ইন্ডাস্ট্রি চালু করেন। তারপর বিদেশে শ্রমবাজার উন্মুক্তকরণের মধ্য দিয়ে আজকে বাংলাদেশের অর্থনীতির আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ খাত রেমিট্যান্সের সূচনা করেন। একই সঙ্গে পররাষ্ট্রনীতির মাধ্যমে বাংলাদেশকে একটি মর্যাদাশীল রাষ্ট্র পরিণত করার জন্য তিনি নতুন কূটনৈতিক ব্যবস্থার উন্মোচন করেন।







