Tuesday, 16 October, 2018 | ১ কার্তিক ১৪২৫ বঙ্গাব্দ |
Advertisement

মাদকবিরোধী অভিযান, বন্দুকযুদ্ধ এবং বিভিন্ন প্রসঙ্গ

বিভুরঞ্জন সরকার: গত ১৫ মে থেকে দেশে মাদকবিরোধী অভিযান শুরু হয়েছে। অভিযান শুরু হওয়ার পর ১৩ দিনে (২৬ মে পর্যন্ত) বন্ধুকযুদ্ধে ৬৯ জন নিহত হয়েছে। নিহতদের প্রায় সবাই মাদক ব্যবসায়ী অথবা মাদক চোরাচালানের সঙ্গে জড়িত বলে পুলিশ জানিয়েছে। এটা সবাই স্বীকার করবেন যে দেশে সাম্প্রতিক সময়ে মাদকের সমস্যা ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। সীমান্ত দিয়ে মাদক ঢুকছে অবাধে। মাদক চোরাচালানের সঙ্গে ক্ষমতাবান ব্যক্তিদের পৃষ্ঠপোষকতা আছে। যেকোনও অপরাধমূলক কাজের সঙ্গেই ক্ষমতার প্রত্যক্ষ এবং নিবিড় সম্পর্ক থাকে। ক্ষমতাসীন দলের নেতা কিংবা প্রশাসনের সহায়তা ছাড়া অপরাধ সংঘটন সহজ হয় না। দেশে যে মাদকের অবাধ প্রবাহ চলছে, এর পেছনে শাসক দল, প্রশাসনের জড়িত থাকার অভিযোগ আছে এবং এই অভিযোগ মিথ্যা নয় বলেই সাধারণ ধারণা।
মাদকের সঙ্গে বিপুল অংকের টাকা লেনদেনের সম্পর্ক। এই টাকা যে কত জায়গায় বিলিবণ্টন হয়, তার ভাগ যে কতজন, কতভাবে পান তা আমার জানা না থাকলেও অনেকেরই সেসব জানা। বাংলাদেশে কোনও কিছুই গোপন থাকে না। বিশেষ করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জানার বাইরে কিছু থাকে না। কীভাবে, কোন পথে দেশে মাদক আসে, কারা এর পৃষ্ঠপোষক, কারা ব্যবসায়ী, কারা বহনকারী– সব তথ্যই পুলিশের কাছে আছে। কিন্তু মাদকের বিরুদ্ধে কার্যকর কোনও অভিযান এতদিন হয়নি। কর্তৃপক্ষের টনক নড়েনি। সম্ভবত টাকার কাছে সবকিছু বন্দি হয়ে ছিল।

মাদক ব্যবসার সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা কোটি টাকার মালিক হয়েছে। এই টাকার ভাগ ছড়িয়ে তারা নিজেদের ‘নিরাপদ’ করে তুলেছে। আমাদের সামাজিক মূল্যবোধ নিম্নগামী। টাকা দিয়ে এখন মানুষের মূল্য বিচার করা হয়। কে কীভাবে টাকা উপার্জন করছে সেটা না দেখে টাকাঅলাদের প্রতি আনুগত্য বাড়ছে। নীতিহীনতার এক মহোৎসব চলছে চারদিকে। কিছু মানুষ নীতি কথা বলেন বটে, কিন্তু সেটা মূলত বলার জন্যই বলা। আর সত্যিকার নীতিবান মানুষেরা এখন সমাজে অপাঙক্তেয়, গুরুত্বহীন। এই সুযোগে মাদক ব্যবসার টাকা দিয়ে কেউ কেউ সম্মান কিনছেন, প্রভাব-প্রতিপত্তি সম্পন্ন হয়ে উঠছেন এবং কেউ কেউ বা জনপ্রতিনিধিও হয়ে যাচ্ছেন। ফলে মাদক নিয়ন্ত্রণ করাটা এখন যথেষ্ট কঠিন কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

কিন্তু জাতির ভবিষ্যতের জন্য মাদক এক ভয়াবহ চ্যালেঞ্জ। মাদকের সহজপ্রাপ্যতার কারণে মাদকাসক্ত মানুষের সংখ্যা দেশে ক্রমেই বাড়ছে। বয়সজনিত চপলতা, ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তা, আয়-উপার্জনে বৈষম্য, রাজনৈতিক সংঘাত ইত্যাদি নানা কারণে তরুণ-যুবকদের অনেকেই নেশার জগতে পা রাখছে। নিজের পায়ে নিজে কুড়াল মারছে। দেশে মাদকাসক্ত মানুষের সংখ্যা ৭৫ লাখ থেকে ১ কোটি পর্যন্ত হতে পারে বলে অনুমান করা হয়। মাদকের বিস্তার নিয়ে অনেকেই উদ্বিগ্ন। সরকার বিষয়টির প্রতি এতদিন মনোযোগ না দেওয়ায় মানুষ সরকারের সমালোচনাও করেছে। এই অবস্থায় সরকার মাদকবিরোধী অভিযান শুরু করায় মানুষ স্বস্তি অনুভব করেছে। অনেকে প্রশংসাও করেছে। তবে এই অভিযানের শুরু থেকেই ব্যাপক বন্দুকযুদ্ধের খবরে মানুষের মনে কিছু প্রশ্ন দেখা দিচ্ছে, সন্দেহ তৈরি হচ্ছে। ‘বিচারবহির্ভূত হত্যা’র নিন্দা-সমালোচনা হচ্ছে। রাঘব বোয়ালদের না ধরে চুনোপুঁটিদের হত্যার অভিযোগ উঠছে। পুলিশ যে বন্দুকযুদ্ধের কথা বলছে অনেকের কাছে তা বিশ্বাসযোগ্য হচ্ছে না। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন বলেছেন, ‘আমি বারবার বলছি, আমাদের নিরাপত্তা বাহিনী কোনও অবস্থাতেই তাদের ওপর গুলি করে না, যতক্ষণ পর্যন্ত তারা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি না হয়’।

আমরা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কথায় আস্থা রাখতে পারলে খুশি হতাম। কিন্তু কয়েকটি কারণে তার কথায় আস্থা রাখা যায় না। প্রথমত মাদক ব্যবসায়ীরা যে ‘সশস্ত্র’ এই তথ্য কি নিরাপত্তা বাহিনীর কাছে আগে ছিল না? মাদকের সঙ্গে জড়িতদের তালিকা যখন করা হয়েছে, যখন তাদের ধরার পরিকল্পনা করা হয়েছে, তখন কি তাদের কাছে অস্ত্র থাকার বিষয়টি জানা ছিল? জানা থাকলে অভিযান পরিকল্পনা কি ঠিকভাবে সাজানো হয়েছিল? দেশজুড়ে মাদক ব্যবসায়ীরা এত অস্ত্র নিয়ে কীভাবে নিরাপদে ঘোরাফেরা করতে পারলো?

মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালনার আগে হয়তো এটা ভাবা হয়েছে যে বর্তমান বিচারিক ব্যবস্থায় মাদক নির্মূল সম্ভব হবে না। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী আজ যাদের গ্রেফতার করবে, আইনের ফাঁক গলিয়ে কাল তারা বেরিয়ে আসবে। গ্রেফতার অভিযানকে তখন আইওয়াশ আখ্যা দেওয়া হবে। কিন্তু কর্তৃপক্ষের কঠোর মনোভাব বোঝানোর জন্যই হয়তো মাদকসংশ্লিষ্টদের ‘শেষ’ করে দেওয়ার পরিকল্পনা নিয়েই অভিযানে নামা হয়েছে। বিদেশেও এমন অভিযান পরিচালিত হয়েছে। ফিলিপাইন, থাইল্যান্ড, মেক্সিকোতে মাদকবিরোধী অভিযানে সন্দেহভাজন হাজার হাজার মানুষকে হত্যা করা হয়েছিল। এই পদ্ধতিটিকে কেন অভ্রান্ত ও কার্যকর ধরে নেওয়া হলো তার কোনও বিশ্বাসযোগ্য ব্যাখ্যা কি কারো কাছে পাওয়া যাবে?

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নির্দেশ দিয়েছেন: সংসদ সদস্য, সরকারি কর্মকর্তা পুলিশ, র‌্যাব, সাংবাদিক- যারাই মাদক ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত থাকবে, তাদের ছাড় নয়।

প্রধানমন্ত্রীর এই নির্দেশের যথাযথ বাস্তবায়ন যদি মানুষ শুরু থেকে দেখতে পেতো তাহলে অভিযানের উদ্দেশ্যের সততা নিয়ে তেমন প্রশ্ন উঠতো না। কিন্তু শুরুতেই মানুষ হোঁচট খেয়েছে। মাদক নিয়ে পাবলিক ‘পারসেপশন’ হলো এর সঙ্গে সরকারি দলের কয়েকজন হোমরাচোমরা জড়িত। কোথাও কোথাও হয়তো বিএনপি-জামায়াতও জড়িত। বিশেষ করে কক্সবাজারের আওয়ামী লীগ দলীয় সংসদ সদস্য আব্দুর রহমান বদিকে মাদক ব্যবসার একজন প্রধান পৃষ্ঠপোষক মনে করা হয়। এই আইনপ্রণেতা ‘মাদক সম্রাট’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছেন। অথচ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, ‘বদির বিরুদ্ধে অভিযোগ আছে, তথ্য প্রমাণ নেই’। কারো কাছে তথ্যপ্রমাণ থাকলে তা পুলিশকে দেওয়ারও আহ্বান জানিয়েছেন মন্ত্রী। মন্ত্রীর এই বক্তব্য পুরো অভিযানকেই প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। বদির বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে তা প্রমাণের দায়িত্ব কার? সরকার বা প্রশাসনেরই তো প্রমাণ করার দায়িত্ব? বদির বিরুদ্ধে গণমাধ্যমে অনেক খবর ছাপা হয়েছে। সে সবকে ভিত্তি ধরে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণে বাধা কোথায়? বন্দুকযুদ্ধে যারা নিহত হচ্ছে তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ কি প্রমাণিত?

বদিকে না ধরে যদি কয়েক হাজার ছোট মাদক ব্যবসায়ীকেও ‘হত্যা’ করা হয় তাতে মানুষ খুশি হবে না। বদিকে ছাড় না দিলেই কেবল মানুষ বিশ্বাস করবে মাদকের বিরুদ্ধে সরকার ‘জিরো টলারেন্স’। বদিকে বাঁচিয়ে রেখে আর যাকেই মারা হোক না কেন মানুষের মন গলবে না। এরমধ্যে কক্সবাজার মেরিন ড্রাইভ সড়কে আক্তার কামাল নামক এক মাদক ব্যবসায়ীর গুলিবিদ্ধ লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। কামাল টেকনাফের সাবরাং ইউনিয়ন পরিষদের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য এবং বদির বিয়াই (বড় বোনের দেবর)। বলা হয়েছে, মাদক ব্যবসায়ীদের দুই গ্রুপের গোলাগুলিতে নিহত হয়েছেন কামাল। অর্থাৎ তার মৃত্যুর সঙ্গে পুলিশের কোনও সংশ্লিষ্টতা নেই। কিন্তু আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক ও সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, মাদক ব্যবসায়ী যেই হোক না কেন তার রেহাই নেই। বদির বিয়াই ছাড় পায়নি, অভিযোগ প্রমাণিত হলে বদিও ছাড় পাবে না।

ওবায়দুল কাদেরের এই বক্তব্যেও মানুষ আশ্বস্ত হতে পারছেন না। পুলিশের বক্তব্য অনুযায়ী বদির বিয়াই (বদি নাকি তাকে বিয়াই বলে স্বীকার করেননি) পুলিশের গুলিতে মারা যায়নি। তাই তাকে ‘ছাড়’ না দেওয়ার কৃতিত্ব সরকার দাবি করতে পারে না। আর ‘অভিযোগ প্রমাণ হলে ছাড় পাবে না’- এই বক্তব্যটি এতটাই অনির্দিষ্ট যে তা বাস্তবক্ষেত্রে কোনও অর্থ বহন করে না।

মানুষ মনে করে মাদকের উৎসমূলের নিয়ন্ত্রণ বদি এবং তার মতো আরো কিছু ক্ষমতাবানদের হাতে। উৎসমূল বন্ধ না করে, তাদের আইন ও বিচারের আওতায় না এনে মাদকবিরোধী অভিযান সফল হবে না। কিছু মানুষকে হত্যা করে যেমন জঙ্গিবাদ নির্মূল করা যায় না, তেমনি রাঘব-বোয়ালদের প্রতি চোখ বন্ধ রেখে কিছু চুনোপুঁটি তাড়া করলে, হত্যা করলে কিংবা গ্রেফতার করলে মাদক নির্মূল হবে না। এ ব্যাপারে সরকার আন্তরিক হলে চলমান মাদকবিরোধী অভিযানে যে দুর্বলতাগুলো বিভিন্নজন শনাক্ত করছেন সেগুলো দ্রুত দূর করতে হবে। যারা বন্ধুকযুদ্ধে নিহত হলে মানুষ প্রশ্ন তুলবে না, বরং খুশি হবে– তাদের দিকে চোখ দিতে হবে। মুখ চিনে ব্যবস্থা নিলে মানুষের মনে বিরূপতা বাড়বে। মানুষ মনে করবে, সরকার নিজের ঘর অপরিচ্ছন্ন রেখে বাইরে পরিচ্ছন্নতা অভিযান চালাতে চায়। নিজের ঘর থেকে শুরু না করলে কোনও শুদ্ধি অভিযান সফল হয় না।

মানুষের সমর্থন পেতে হলে তাদের বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জনের বিকল্প নেই।

লেখক: কলামিস্ট




© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত
দৈনিক সিলেট ডট কম
২০১১

সম্পাদক: মুহিত চৌধুরী
অফিস: ২৬-২৭ হক সুপার মার্কেট, জিন্দাবাজার সিলেট
মোবাইল : ০১৭১ ২২ ৪৭ ৯০০,  Email: dainiksylhet@gmail.com

Developed by: