সিলেটের সীমান্ত দিয়ে দেশে ডুকছে মাদক,বেপরোয়া কিশোর গ্যাং: নেপথ্যে প্রভাবশালী চক্র
সিলেটে নানা প্রকার অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে। কোনোটি থানায় রেকর্ড হচ্ছে। আবার অনেকটাই রেকর্ডে আসছে না।
সাম্প্রতিককালে সিলেট সহ সমগ্র বাংলাদেশে মাদক চোরাচালান, চাঁদাবাজি, চুরি, ছিনতাই, খুন, ভূমি দখলসহ ধর্ষণের ঘটনা ঘটে চলছে। সিলেটে কিশোর গ্যাং বেশ সক্রিয়। এছাড়া নারীর প্রতি সহিংসতা, শিশু হত্যার ঘটনাও বাড়ছে।
সিলেটের ডিআইজি বলেন, সিলেটের প্রতিটি থানায় নির্দেশনা রয়েছে অপরাধীদের কোনো ছাড় নেই। তবে আমরা দেখি চাঞ্চল্যকর কোনো অপরাধ বা খুনের ঘটনা পুলিশ ক্লু উদ্ধার বা আসামিকে ধরতে পারল কি না। এ প্রসঙ্গে তিনি হবিগঞ্জের চুনারুঘাটে টমটম চালক আতাউর রহমান (৫৫) হত্যায় জড়িত থাকার অভিযোগে দুই জনকে গ্রেফতার ও টমটম উদ্ধারের কথা জানালেন। আতাউর রহমানকে গত ৮ ফেব্রুয়ারি খুন করে ঘাতকরা টমটম নিয়ে পালিয়ে যায়।
সিলেটের ডিআইজি অফিস সূত্র জানায়, গত বছর সিলেটের চার জেলায় ডাকাতি সংঘটিত হয় ১৩টি, দস্যুতা ৩৮টি, ১৮১ জন খুন, গণধর্ষণের শিকার ৩১ নারী, ৮৬টি চোরাচালান ও ১ হাজার ৬৮১টি মাদক মামলা হয়েছে।
এদিকে সিলেটে বালু ও পাথর পরিবহন মালিক শ্রমিকদের নামে অবৈধ চাঁদাবাজি চলছে। তবে এটি বন্ধের দাবি জানিয়েছেন সিলেট জেলা ট্রাক, পিকআপ, কাভার্ড ভ্যান মালিক সমিতির নেতৃবৃন্দ। তারা বলেন, পরিবহন মালিক ও শ্রমিকদের সুনাম ক্ষুণ্ন করা হচ্ছে। সিলেট চেম্বারের সভাপতি তাহমিন আহমদ বলেছেন পুলিশের উপস্থিতিতেই সবজির বাজারে চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী কার্যকলাপ চলছে। সবজির আড়ৎ ও পণ্যবাহী ট্রাকে ব্যাপক হারে চাঁদাবাজির ঘটনা জাতীয় সংসদেও উত্তাপিত হয়েছে। তবে পুলিশ জানায়, এসব চাঁদাবাজদের ধরতে পুলিশ তৎপর। ট্রাকে চাঁদাবাজির ঘটনায় একজন গ্রেফতার হয়েছে। সুনামগঞ্জের জামালগঞ্জে নৌপথে চাঁদাবাজি বন্ধে মানববন্ধন করেছেন এলাকাবাসী।
অন্যদিকে পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০২৩ সালে সিলেট বিভাগে ১৫ শিশু হত্যার ঘটনা ঘটে। এদিকে গত বছর সিলেট অঞ্চলে ২৩ জন নারী হত্যার শিকার হন। এর মধ্যে ১০ নারী তাদের স্বামীর হাতে খুন হন। তার আগের বছর ২২ সালে ২৮ নারী এবং ২১ সালে খুন হন ১০ জন নারী। সিলেটে নারীর প্রতি সহিংসতার ঘটনা আগে এরূপ ছিল না। তবে জেন্ডারবিষয়ক গবেষণা সহকারী অধ্যাপক আফরোজা সোমা সংবাদমাধ্যমকে বলেছেন, ‘নারীর গড় আয়ু ও সংখ্যা যেমনি বেড়েছে, তেমনি বেড়েছে হত্যাকাণ্ড। তিনি বলেন, নারীর প্রতি সহিংসতা কমাতে হলে বিচার ত্বরান্বিত করতে হবে।
সিলেটে অপরাধ কর্ম বৃদ্ধি সম্পর্কে সমাজবিজ্ঞানী ও বিশিষ্ট ব্যক্তিরা বলেছেন, অপরাধীদের দ্রুত আইনের আওতায় এনে বিচার নিশ্চিত করতে হবে। পুলিশকে যথাযথ দায়িত্ব পালন করতে দিলে সিলেট অপরাধ মুক্ত ব্যতিক্রমী অঞ্চল হতে পারে। তারা মনে করেন, বেশির ভাগ ঘটনা ঘটছে রাজনৈতিক ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ছত্রছায়ায়।
এই অপরাধীরা একেক সময় একেক রাজনৈতিক দলের আশ্রয় প্রশয়ে নানা অপরাধ জড়িয়ে পড়ে। সম্প্রতি পুলিশের হিসেব অনুযায়ী সিলেটে ৬৮১টি মাদক মামলা হয়েছে। আসামি করা হয়েছে সিলেটের চিহ্নিত অপরাধী, অনিক, রহেল, জামাল উদ্দিন, রকি খান, নাহিদ, সারওয়ার, নাজমুলসহ বেশ কয়েকজনকে। এসব মাদক সিলেটের সিমান্তবর্তী দেশ ভারত থেকে অবৈধ পন্থায় নিয়ে আসে ওই প্রভাবশালী চক্র। সিমান্ত ক্রস করার পর ওই চক্রের মাধ্যমে তা চলে যায় দেশের বিভিন্ন প্রান্তে।বিভিন্ন সময় পুলিশ অভিযান দিলেও প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতাদের চাপের কারনে তা আর আলোর মুখ দেখে না।
সিলেটে কিশোর গ্যাং নামটি সাধারণ মানুষের কাছে এক আতঙ্কের নাম। গ্যাংয়ের সদস্যরা তুচ্ছ ঘটনায় খুনাখুনি, ধর্ষণ, চুরি, ছিনতাইসহ মারামারি ও সংঘর্ষের ঘটনা প্রতিনিয়ত ঘটিয়ে যাচ্ছে। কিশোর গ্যাংদের হাতে অনেকটা জিম্মি পাড়া-মহল্লার মানুষ। সিলেট নগরীর ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল এলাকার কয়েকটি বেপরোয়া কিশোর গ্যাংয়ের হাতে অনেক খুনের ঘটনা ঘটতেছে ২০২২ সাল থেকে। এরপর পুলিশ ও র্যাব সাঁড়াশি অভিযান চালিয়ে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্য ১০-১২ জনকে আটক করে। এরপর এলাকা ছেড়ে তারা পালিয়ে গিলেও সম্প্রতি তারা আস্তানা গেড়েছে মেডিক্যাল এলাকায়। মাদক, ছিনতাইসহ নানা অপরাধে জড়িত। ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষ তাদের কাছে জিম্মি।
ছয় থানায় ২২০ জনের তালিকা: সিলেট মহানগর পুলিশের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, কিশোর গ্যাংয়ের অপতত্পরতা থামাতে এসএমপি‘র ছয়টি থানায় তালিকা তৈরি করা হয়েছে ২২০ জন কিশোরের। পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, বিষয়টি তাদের নজরদারিতে রয়েছে। বিভিন্ন এলাকায় পুলিশি টহলও বাড়ানো হয়েছে। তাদের বেশির ভাগেরই বয়স ১৮ বছরের নিচে।
শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. তানজিনা চৌধুরী বলেছেন, কিশোর অপরাধ নির্মূলে অভিভাবকদের আরও সচেতন হতে হবে। বিশেষ করে সন্তানরা কোথায় যায় এবং অনলাইনে তারা কোন বিষয়ে যুক্ত হচ্ছে—সেটি নজরদারিতে রাখার জন্য অভিভাবকদের পরামর্শ দেন তিনি। অভিযোগ উঠেছে, রাজনৈতিক ছায়ায় উঠতি বয়সের কিশোররা সহিংসতাসহ নানা অপকর্মে জড়িয়ে পড়ছে।
কিশোর গ্যাং: ২০২৩ সালে ২ এপ্রিল রাতে রিকাবীবাজার পয়েন্টে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যের হাতে ছুরিকাঘাতে সাংবাদিক পুত্রসহ দুই শিক্ষার্থী গুরুতর আহত হওয়ার ঘটনা বেশ আলোচিত। সূত্র মতে, ২০১৮ সালের শেষদিক থেকে সিলেটে কিশোর গ্যাংয়ের সৃষ্টি। বর্তমানে নগরীর বিভিন্ন এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের উৎপাত অনেক বেশি।







