সাহরি-ইফতারে সময় সচেতনতা আবশ্যক
ইসলাম ইবাদত-বন্দেগিসহ সব বিধানেই অত্যন্ত সাদাসিধা ও সহজ নীতি রেখেছে। নামাজ-রোজা ও হজ-জাকাতের সময়, কিবলা নির্ণয়, চাঁদ দেখা ইত্যাদির বিধান মুশাহাদা তথা প্রত্যক্ষ দর্শনের ওপরই নির্ভরশীল রেখেছে। আর যখন বা যেখানে মুশাহাদার দ্বারা সিদ্ধান্ত নেওয়া অসম্ভব হয়, সেখানে ‘তাহরির’ তথা প্রবল ধারণার ওপর বিধান পালনের সুযোগ আছে। যাতে শিক্ষিত-অশিক্ষিত, শহর বা দূরপল্লী অথবা দ্বীপ বা পাহাড়ের অধিবাসী কিংবা সমুদ্র বা বনাঞ্চলের অভিযাত্রী সবার জন্য হিসাবযন্ত্র ছাড়াই সর্বদা সহজে বিধান পালনের সুযোগ হয়।
তার পরও কেউ যদি সহজে বিজ্ঞানীদের এমন কোনো উদ্ভাবন থেকে এসব ক্ষেত্রে উপকৃত হতে চায় যেগুলোর সঙ্গে ইসলামের সঙ্গে বিজ্ঞানের কোনো সংঘর্ষ নেই, তাহলে তা আল্লাহর নিয়ামত হিসেবে তার যথোপযুক্ত ব্যবহার শরিয়তে নিষিদ্ধ নয়। তবে স্মরণ রাখতে হবে যে এসব ক্ষেত্রে ইসলাম মূল ভিত্তি রেখেছে প্রত্যক্ষ দর্শনের ওপরই। যেহেতু বর্তমানে বিভিন্ন কারণে প্রত্যক্ষ দর্শন অনুপাতে আমল করা কঠিন। তাই উলামায়ে কেরাম হিসাব-নিকাশের আলোকে ক্যালেন্ডার ও সময়সূচি প্রণয়ন করেছেন।
এতে সব মুসলিমের ইবাদতের সময় নিরূপণে সহজ হয়েছে। তা অনুসরণ করে সবাই সঠিকভাবে আমল করা সম্ভব।
রোজার শুরু-শেষের সীমারেখা
রোজা শুরু হয় সুবহে সাদিকের শুরু থেকে, তাই এটি সাহরি খাওয়ার সর্বশেষ সময়। সুবহে সাদিক হলো সূর্যোদয়ের সোয়া ঘণ্টা থেকে দেড় ঘণ্টা আগে সূর্য যখন কোনো এলাকার পূর্ব দিগন্ত থেকে প্রায় ১৮ ডিগ্রি নিচে থাকে, তখন পূর্বাকাশে আড়া-আড়িভাবে চওড়া একটি ক্ষীণ সাদা আভা প্রকাশিত হয়, এই হালকা সাদা আভাটির শুরুই হলো সুবহে সাদিক, তথা সাহরির শেষ সময়।
এটি ফজরের নামাজেরও শুরুর সময়। আর একটি রোজা পূর্ণ হয় তথা ইফতারের সময় হয় সূর্যাস্তের মুহূর্তে অর্থাৎ যখন সূর্যগোলকটির সর্বশেষ কিনারা কোনো এলাকার পশ্চিম দিগন্তের নিচে ডুবে যায়। এটি মাগরিবের নামাজেরও শুরুর সময়। এ হলো শরিয়তের নির্ধারিত সীমারেখা। এর ব্যতিক্রম করা যাবে না।
আজান শেষ হওয়া পর্যন্ত কি সাহরি খাওয়া যায়?
সাহরির খানা দেরিতে খাওয়া মুস্তাহাব। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘তিনটি বিষয় নবী-চরিত্রের অংশ : সময় হওয়ামাত্র ইফতার করা, শেষ ওয়াক্তে সাহরি খাওয়া এবং নামাজে ডান হাত বাঁ হাতের ওপর রাখা।’ (মাজমাউজ জাওয়াইদ, তাবারানির বরাতে : হাদিস ২৬১১)
সুবহে সাদিকের আগে অবশ্যই পানাহার বন্ধ করতে হবে। তাই মসজিদে আজান শুরু হোক বা না হোক, সুবহে সাদিকের সময় হয়ে গেলে পানাহার বন্ধ করতে হবে, নচেৎ রোজা শুদ্ধ হবে না। অনেকে মনে করেন, আজান শেষ হওয়া পর্যন্ত খাওয়া যায়, এটি মারাত্মক ভুল। কেননা আজান যদি সঠিক সময়ে সুবহে সাদিকের পর শুরু হয়, তাহলে আজানের আগেই সাহরির সময় শেষ, এ অবস্থায় আজান শেষ হওয়া পর্যন্ত খেলে রোজা হবে না।
আবার কিছু মুয়াজ্জিনও ভুল করে থাকেন, তাহলো কিছু মানুষ যেহেতু আজানের শেষ পর্যন্ত খেয়ে থাকে, তাই তাঁরা সময়ের আগেই আজান দিয়ে দেন। অথচ সুবহে সাদিকের আগে আজান দেওয়া সহিহ নয়। তাই রোজার হেফাজতের সর্বোত্তম পদ্ধতি হলো সুবহে সাদিকের সামান্য আগে এলান করে দেওয়া যে ‘আর মাত্র এত মিনিট বাকি আছে, এর আগে অবশ্যই খাওয়া শেষ করুন’। অথবা শেষ সময়ে ঘোষণা দেওয়া যে ‘সাহরি খাওয়ার সময় শেষ’। অতঃপর সুবহে সাদিকের সময় হলে আজান দেবে। আজান শুরুর আগেই যেন সবার খাবার খাওয়া শেষ হয়ে যায়।
সাহরি-ইফতারের সময় ও সতর্কতা
সাহরি-ইফতারির ক্যালেন্ডারগুলোতে সাধারণত সাহরির শেষ সময়ের দুই-তিন মিনিট পরে ফজরের আজানের সময় দেওয়া থাকে। আসলে সাহরির সময় শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই আজান দেওয়া যায় এবং ফজরের নামাজ পড়া যায়। দুই-তিন মিনিট দেরি করার প্রয়োজন হয় না। তবে বিভিন্ন ঘড়িতে সামান্য পার্থক্যসহ বিভিন্ন বিবেচনায় সতর্কতামূলক দুই-তিন মিনিট পরে আজান দেওয়া হয়, যাতে আজান শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই যদি কেউ নামাজ শুরু করে, তার ফজরের নামাজটি নিঃসন্দেহে আদায় হয়ে যায়। (মাবসুতে সরখসি : ৩/৭৭)
ইফতারের সময় হয় সূর্যাস্তের মুহূর্তেই অর্থাৎ যখন সূর্যগোলকটির সর্বশেষ কিনারা পশ্চিম দিগন্তের নিচে চলে যায়, তখনই ইফতারের সময় হয়। আর ইফতারের সময় হয়ে গেলে দেরি না করে জলদি ইফতার করা সুন্নত। সূর্যাস্তের পর রাতের অন্ধকার পর্যন্ত দেরি করে ইফতার করতে হাদিস শরিফে নিষেধ করা হয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘মানুষ যত দিন পর্যন্ত তাড়াতাড়ি ইফতার করবে তত দিন কল্যাণের মধ্যে থাকবে।’ (বুখারি, হাদিস : ১৯৫৭)
অপর বর্ণনায় রয়েছে, ‘যত দিন মানুষ তাড়াতাড়ি ইফতার করবে তত দিন ইসলাম বিজয়ী থাকবে। কেননা, ইহুদি-নাসারাদের রীতি হলো দেরিতে ইফতার করা।’(আবু দাউদ, হাদিস : ২৩৫৩)
হ্যাঁ, অবস্থানের উচ্চতা এবং বিভিন্ন ঘড়িতে সামান্য পার্থক্যসহ একাধিক বিষয় বিবেচনায় সতর্কতামূলক এক-দুই মিনিট দেরি করে ইফতার করতে কোনো অসুবিধা নেই, এটি হাদিসের নিষেধাজ্ঞার অন্তর্ভুক্ত নয়। বিশেষত, যারা পাহাড়ে বা উঁচু দালানে অবস্থান করে, তারা সমতলের সময়ের সঙ্গেই ইফতার করবে না, বরং উচ্চতার তারতম্যের কারণে তাদের সূর্যাস্তের সময়ে ব্যবধান হয়ে থাকে, তারা ওই ব্যবধান অতিক্রম হওয়ার পরই ইফতার করবে। (আল মুহিতুল বুরহানি : ৩/৩৩৬)
অবস্থানের উচ্চতার ভিত্তিতে সময়ের পার্থক্য
সমতলের তুলনায় উঁচু জায়গায় সুবহে সাদিক ও সূর্যোদয় আগে হয়ে থাকে, আর সূর্যাস্ত পরে হয়ে থাকে। নিম্নে তালিকাটিতে পার্থক্যের পরিমাণ দেখানো হয়েছে :
৫০ ফুট উচ্চতায় ৩৫ সেকেন্ড পার্থক্য হয়।
১০০ ফুট উচ্চতায় ৫০ সেকেন্ড।
২০০ ফুট উচ্চতায় ১ মিনিট ১০ সেকেন্ড।
৫০০ ফুট উচ্চতায় ১ মিনিট ৫০ সেকেন্ড।
১০০০ ফুট উচ্চতায় ২ মিনিট ৩৬ সেকেন্ড।
২০০০ ফুট উচ্চতায় ৩ মিনিট ৪০ সেকেন্ড।
৫০০০ ফুট উচ্চতায় ৫ মিনিট ৪৮ সেকেন্ড পার্থক্য হয়।
উল্লেখ্য, ২০০০ ফুট উচ্চতা পর্যন্ত সুবহে সাদিকের সময়ে সাধারণত উল্লেখযোগ্য পার্থক্য হয় না। আর এত উঁচু বিল্ডিং বাংলাদেশে সাধারণত নেই। তবে সূর্যাস্ত তথা ইফতারের সময় নির্ধারণে আমাদের উচ্চতার পার্থক্যের বিষয়টি বিবেচনায় রাখা জরুরি। (তাসহিলুল ফলকিয়াত, পৃষ্ঠা-১৯৭)






