সরকারকে চাপে রাখতে চায় বিরোধী জোট
জুলাই সনদ ঘিরে সরকারের ওপর ত্রিমুখী চাপ তৈরি করতে নতুন করে সক্রিয় হচ্ছে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন জোট। জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশ ২০২৫, গণভোট অধ্যাদেশ এবং সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্যদের শপথের বৈধতা নিয়ে হাইকোর্টের রুল জারির পর দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে উত্তাপ ছড়িয়েছে। আদালত, সংসদ ও রাজপথ- তিন ক্ষেত্রেই সমান্তরালভাবে সক্রিয় অবস্থানের কথা জানিয়ে দিয়েছে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো। এরই মধ্যে বিরোধী জোটের নেতারা এ বিষয়ে জরুরি আলোচনা সেরেছেন বলে একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে।
গতকাল বিচারপতি রাজিক আল জলিল ও বিচারপতি মো. আনোয়ারুল ইসলামের হাইকোর্ট বেঞ্চ জানতে চানÑ জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশ, গণভোট অধ্যাদেশের সংশ্লিষ্ট ধারা এবং সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। চার সপ্তাহের মধ্যে রুলের জবাব দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
গতকাল রাষ্ট্রপক্ষে শুনানিতে অংশ নেন অ্যাটর্নি জেনারেলের দায়িত্বে থাকা মোহাম্মদ আরশাদুর রউফ ও অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল অনীক আর হক। রিট আবেদনকারীদের পক্ষে ছিলেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী আহসানুল করিম, সৈয়দ মামুন মাহবুব, ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া ও জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের গাজী কামরুল ইসলাম সজল। রিটের বিপক্ষে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) পক্ষে শুনানি করেন মোহাম্মদ হোসেন এবং জামায়াতে ইসলামীর পক্ষে ছিলেন অ্যাডভোকেট শিশির মনির ও ইমরান এ সিদ্দিক।
গতকাল রুল জারির আগের দিন রাজধানীর বাংলামোটরে আয়োজিত জরুরি সংবাদ সম্মেলনে এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া অভিযোগ করেন, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) আদালতের মাধ্যমে সংস্কার প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করার কৌশল নিচ্ছে। দলটির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, জুলাই সনদ ও গণভোটের যে রায়, যার ভিত্তিতে সরকার গঠন হয়েছে, সেই রায়কে বাতিল করতে আদালতকে ব্যবহারের চেষ্টা চলছে। বিচার বিভাগকে দলীয় স্বার্থে ব্যবহার না করার আহ্বান জানিয়ে তিনি সতর্ক করে বলেন, এ ধরনের পদক্ষেপ রাজনৈতিক অস্থিরতা বাড়াতে পারে।
অন্যদিকে জামায়াতের সহকারি সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, দুই-তৃতীয়াংশ ভোটে পাস হওয়া সংস্কার প্রস্তাব এখন জাতীয় সংসদের বিষয়। ১২ মার্চের অধিবেশনে বিষয়টি আলোচনায় আনা উচিত। অতীতে সংসদীয় বিষয় আদালতে নিয়ে যাওয়ার ফলে রাজনৈতিক সংকট তীব্র হয়েছিল; এবার যেন সেই পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি না ঘটে, সে আহ্বান জানান তিনি।
অ্যাডভোকেট শিশির মনির জানান, দুটি পৃথক রিটে জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশ ২০২৫, গণভোট অধ্যাদেশের নির্দিষ্ট প্রশ্ন ও সংবিধান সংস্কার সভা গঠনের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে। রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত কার্যক্রমে নিষেধাজ্ঞাও চাওয়া হয়েছে। জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক আব্দুল হালিম আমাদের সময়কে বলেন, সরকারকে পছন্দ মতো ফল পাওয়ার উদ্দেশ্যে আদালতকে ব্যবহার করার পুরনো কৌশল পরিহার করতে হবে। যদি জুলাই সনদ বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি থেকে সরে দাঁড়ায়, তবে তা জনগণের প্রত্যাশার পরিপন্থি হবে। পুরাতন ধ্যান-ধারণার রাজনীতি বাংলাদেশে আর চলবে না। আব্দুল হালিম আরও বলেন, সরকারি দল যদি আদালতের ঘাড়ে বন্দুক রেখে জুলাইকে বাতিল করে দিতে চায়, তবে সংসদ ও রাজপথ দুটোই আমাদের খোলা রয়েছে। এখানে আর ফ্যাসিবাদের শাসন কাউকে কায়েম করতে দিব না। আমরা গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় সরকারের অংশীজন হয়ে কাজ করতে চাই। তবে অবশ্যই জনগণের পক্ষেই আমাদের অবস্থান স্পষ্ট থাকবে। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক অধ্যাপক সারোয়ার জাহানের মতে, বিষয়টি এখন কেবল আইনি বিতর্ক নয়; এটি রাজনৈতিক শক্তির অবস্থান নির্ধারণের প্রশ্নে রূপ নিয়েছে। একদিকে আদালতের রুল, আরেকদিকে সংসদে আলোচনার দাবি এবং প্রয়োজনে রাজপথে নামার ইঙ্গিত। ফলে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন প্রশ্নে দেশ একটি সংবেদনশীল রাজনৈতিক পর্যায়ে প্রবেশ করেছে।
গতকাল জামায়াত ও এনসিপির একাধিক শীর্ষব্যক্তি আমাদের সময়কে বলেন, গণভোটের রায়ের ভিত্তিতেই বর্তমান রাজনৈতিক প্রক্রিয়া এগিয়েছে। সেই রায় প্রশ্নবিদ্ধ হলে সরকার ও সংসদের বৈধতাও বিতর্কে পড়তে পারে। তাই এ বিষয়ে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারকে একবিন্দু ছাড় দিতে নারাজ জামায়াত জোট।
এদিকে আগামী চার সপ্তাহের আইনি প্রক্রিয়া, ১২ মার্চের সংসদ অধিবেশন এবং দলগুলোর রাজনৈতিক কৌশলÑ এই তিনটি বিষয়ই নির্ধারণ করবে পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেবে। তবে এটা স্পষ্ট, জুলাই সনদ ইস্যু এখন জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. মাহবুব উল্লাহ বলেন, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন প্রশ্নে দেশের রাজনীতি নতুন এক সংবেদনশীল মোড়ে দাঁড়িয়ে। পরিস্থিতি কোন দিকে গড়ায়, তা নির্ভর করবে আদালতের পরবর্তী পদক্ষেপ, সংসদের অবস্থান এবং রাজনৈতিক দলগুলোর কৌশলের ওপর। তবে স্পষ্টত জুলাই সনদ ইস্যু নিয়ে এখন জাতীয় রাজনীতিতে নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি হবে।
সূত্র:আমাদেরসময়






