দৌলতদিয়া ফেরিঘাট ট্র্যাজেডি: এক দুর্ঘটনা, অজস্র প্রশ্ন
দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে বাস নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পদ্মা নদীতে পড়ে যাওয়ার মর্মান্তিক ঘটনাটি শুধু শোকের নয়, বরং আমাদের সামগ্রিক পরিবহন ব্যবস্থার গভীর সংকটকে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে। প্রাণহানির এই দুর্ঘটনা নতুন নয়—কিন্তু প্রতিবারের মতো এবারও উঠে এসেছে পুরোনো প্রশ্ন: কেন একই ধরনের দুর্ঘটনা বারবার ঘটছে, আর কেনই বা সেগুলো প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া যাচ্ছে না?
ঘটনাটি ঘিরে একাধিক গুরুতর প্রশ্ন এখন জনমনে ঘুরপাক খাচ্ছে। ফেরি পারাপারের সময় যাত্রীদের বাস থেকে নেমে নিরাপদ স্থানে অবস্থান করার সুস্পষ্ট নির্দেশনা থাকলেও বাস্তবে তা মানা হয়নি। প্রশ্ন উঠেছে—যাত্রীরা কেন বাসের ভেতরে অবস্থান করছিলেন? ফেরি কর্তৃপক্ষ, কর্মচারী বা সংশ্লিষ্টরা কেন এ নিয়ম কঠোরভাবে কার্যকর করতে ব্যর্থ হলেন? এটি কি কেবল অবহেলা, নাকি দীর্ঘদিনের অনিয়মই এখন নিয়মে পরিণত হয়েছে?
নিরাপত্তা ব্যবস্থার বিষয়টিও সামনে এসেছে জোরালোভাবে। একটি ফেরিতে শক্তিশালী রেলিং বা প্রতিরোধব্যবস্থা থাকা অত্যাবশ্যক, যাতে যানবাহন কোনোভাবেই পানিতে পড়ে না যায়। সংশ্লিষ্ট ফেরিটিতে যদি এমন ব্যবস্থা পর্যাপ্ত না থাকে, তবে তা কীভাবে চলাচলের অনুমতি পেল? নিয়মিত তদারকি ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে থাকা সংস্থাগুলোর ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। নিরাপত্তা মানদণ্ড উপেক্ষা করে চলাচল করা ফেরিগুলো কি নিয়মিত যাচাই করা হয়?
দুর্ঘটনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে চালকের সক্ষমতা ও বৈধতা। সংশ্লিষ্ট বাসচালকের ড্রাইভিং লাইসেন্স ছিল কিনা, তার দক্ষতা ও শারীরিক অবস্থার যথাযথ যাচাই করা হয়েছিল কিনা—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো স্পষ্ট নয়। অথচ এসব বিষয়ই একটি দুর্ঘটনা প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
প্রতিটি বড় দুর্ঘটনার পরই তদন্ত কমিটি গঠনের প্রচলন থাকলেও সেই তদন্তের ফলাফল সচরাচর জনসমক্ষে প্রকাশ পায় না। এই অস্বচ্ছতা ও গোপনীয়তা জনমনে আস্থাহীনতা তৈরি করছে। কেন তদন্ত প্রতিবেদনগুলো প্রকাশ করা হয় না? কেন দায়ীদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ও দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয় না? জবাবদিহিতা নিশ্চিত না হলে একই ধরনের দুর্ঘটনা বারবার ঘটতেই থাকবে—এমনটাই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ঈদ মৌসুমে অতিরিক্ত যাত্রীচাপ, যানবাহনের অপ্রতুলতা, তদারকির ঘাটতি এবং নিয়ম অমান্যের প্রবণতা—সব মিলিয়ে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বেড়ে যায় বহুগুণ। চলতি বছরেও সড়ক ও নৌপথে দুই শতাধিক মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে, যা আমাদের নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতাকেই স্পষ্ট করে।
তারা বলছেন, শুধু দুর্ঘটনার পর শোক প্রকাশ বা তদন্ত কমিটি গঠনই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন বাস্তবমুখী ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। কঠোরভাবে নিরাপত্তা নীতিমালা বাস্তবায়ন, নিয়মিত মনিটরিং, সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহিতার আওতায় আনা এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধি—এসব পদক্ষেপই পারে এমন দুর্ঘটনা প্রতিরোধ করতে।
দৌলতদিয়ার এই মর্মান্তিক ঘটনা আবারও প্রমাণ করেছে—আমাদের পরিবহন ব্যবস্থায় নিরাপত্তা এখনো অগ্রাধিকারের জায়গায় পৌঁছায়নি। প্রশ্ন একটাই: আমরা কি এবারও আগের মতোই ভুলে যাব, নাকি এই ঘটনাকে শিক্ষা হিসেবে নিয়ে সত্যিকার পরিবর্তনের পথে হাঁটব?








