ট্রাফিক সিগন্যাল থেকে যেভাবে এল লাল কার্ড
আজকের দিনে ফুটবল কিংবা এর মতো আধুনিক দলগত খেলার মাঠে পকেট থেকে রেফারির লাল বা হলুদ কার্ড বের করার দৃশ্যটি স্বাভাবিক। মাঠের চরম উত্তেজনা, ফাউল, রেফারির বাঁশি আর পকেট থেকে বেরিয়ে আসা এক টুকরো রঙিন প্লাস্টিক- ব্যাস, মুহূর্তেই খেলার ভাগ্য বদলে যায়।
কিন্তু এই যে কোনো কথা না বলে, কোনো তর্ক না করে শুধু রঙের ইশারায় খেলোয়াড়কে সতর্ক করা বা মাঠ থেকে বের করে দেওয়ার নিয়ম, এটি কিন্তু ফুটবলের সূচনালগ্ন থেকে ছিল না। ফুটবলের দেড়শ বছরের ইতিহাসে এই কার্ডের সংযোজন তুলনামূলকভাবে নতুন এবং এর পেছনে জড়িয়ে আছে এক নাটকীয় ম্যাচ ও এক ব্রিটিশ রেফারির ট্রাফিক সিগন্যালে আটকে থাকার গল্প।
১৯৭০ সালের আগে ফুটবল মাঠে রেফারিদের কোনো কার্ড ছিল না। কোনো খেলোয়াড় নিয়ম ভঙ্গ করলে রেফারি তাকে মুখে ডেকে সতর্ক করতেন, যাকে বলা হতো ‘অফিসিয়াল কশন’। আর অপরাধ গুরুতর হলে রেফারি তাকে মাঠ থেকে বের হয়ে যাওয়ার নির্দেশ দিতেন।
ততদিন পর্যন্ত ঘরোয়া ফুটবল বা একই ভাষার দুটি দেশের মধ্যে খেলা হলে এই নিয়মে তেমন কোনো সমস্যা হতো না। কিন্তু আন্তর্জাতিক ফুটবলে, যেখানে দুই দেশের ভাষা সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং রেফারির ভাষাও আলাদা, সেখানে তৈরি হতো বিশৃঙ্খলা। রেফারি মুখে কী বলছেন, তা অনেক সময় খেলোয়াড়রা বুঝতেই পারতেন না।
আবার কোনো খেলোয়াড়কে সতর্ক করা হয়েছে কি না, তা গ্যালারিতে থাকা দর্শক কিংবা ধারাভাষ্যকাররাও স্পষ্ট জানতে পারতেন না। এই ভাষাগত জটিলতা ও অস্পষ্টতা চরম রূপ নেয় ১৯৬৬ সালের ইংল্যান্ড বিশ্বকাপে।
১৯৬৬ সালের বিশ্বকাপটি ছিল বিতর্কে ঠাসা। বিশেষ করে ২৩ জুলাই লন্ডনের ওয়েম্বলি স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত স্বাগতিক ইংল্যান্ড এবং আর্জেন্টিনার মধ্যকার কোয়ার্টার ফাইনাল ম্যাচটি ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম ‘কুখ্যাত’ ম্যাচ হিসেবে পরিচিত।
ম্যাচটি পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন জার্মান রেফারি রুডলফ ক্রেইটলেইন। ম্যাচ চলাকালীন আর্জেন্টিনার অধিনায়ক আন্তোনিও রাতিন রেফারির বেশ কিছু সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানান। রাতিন কথা বলছিলেন স্প্যানিশ ভাষায়, আর রেফারি ক্রেইটলেইন বুঝতেন কেবল জার্মান। রেফারি মনে করেছিলেন রাতিন তাকে গালিগালাজ করছেন এবং মাঠে ঔদ্ধত্য দেখাচ্ছেন। ফলে তিনি রাতিনকে মাঠ ছেড়ে চলে যাওয়ার নির্দেশ দেন।
কিন্তু রাতিন মাঠ ছাড়তে অস্বীকৃতি জানান। তিনি বোঝানোর চেষ্টা করেন যে তিনি কেবল রেফারির সঙ্গে কথা বলতে চান। ভাষা না বোঝার কারণে মাঠের মধ্যেই প্রায় নয় মিনিট খেলা বন্ধ থাকে। পুলিশ ডেকে রাতিনকে মাঠ থেকে বের করতে হয়েছিল।
বিতর্ক এখানেই শেষ হয়নি। ম্যাচ শেষে জানা যায়, ইংল্যান্ডের দুই তারকা ফুটবলার ববি চার্লটন ও জ্যাক চার্লটনকেও রেফারি ক্রেইটলেইন ম্যাচের মধ্যে সতর্ক করেছিলেন। কিন্তু খোদ চার্লটন ভাইয়েরাই তা জানতেন না! পরের দিন খবরের কাগজে পড়ে তারা জানতে পারেন যে তারা বুকড হয়েছেন। গ্যালারিতে বসে এই পুরো নাটকীয়তা ও বিশৃঙ্খলা দেখছিলেন ফিফার রেফারি কমিটির তৎকালীন প্রধান ক্যান অ্যাস্টন। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, ফুটবলের শৃঙ্খলা বজায় রাখতে এবং বিশ্বজনীন যোগাযোগের জন্য এই মৌখিক ব্যবস্থার পরিবর্তন জরুরি।
ম্যাচ শেষ করে ক্যান অ্যাস্টন যখন গাড়ি চালিয়ে বাড়ি ফিরছিলেন, তখন লন্ডনের কেনসিংটন হাই স্ট্রিটের একটি ট্রাফিক সিগন্যালে তার গাড়িটি এসে থামে। সিগন্যালের বাতি যখন সবুজ থেকে হলুদ এবং হলুদ থেকে লাল হলো, তখন তার মাথায় হঠাৎ এক বিদ্যুৎচমকের মতো আইডিয়া চলে এল।
তিনি ভাবলেন, ট্রাফিক লাইটের এই রঙ তো পৃথিবীর সব মানুষ বোঝে। এর জন্য কোনো ভাষার প্রয়োজন হয় না। হলুদ বাতি মানে ‘সাবধান হোন’, আর লাল বাতি মানে ‘থামুন বা বিপদ’। তিনি চিন্তা করলেন, এই ধারণাকে ফুটবল মাঠে কাজে লাগানো যায়। রেফারি যদি পকেটে দুটি ভিন্ন রঙের কার্ড রাখেন- হলুদ কার্ড মানে শেষ সতর্কতা এবং লাল কার্ড মানে তাৎক্ষণিক বিদায়- তবে পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তের খেলোয়াড়, দর্শক ও সাংবাদিক এক পলকেই রেফারি কী সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তা বুঝে যাবেন।
অ্যাস্টন তার এই অভিনব প্রস্তাবটি ফিফার কাছে পেশ করেন। ফিফাও বুঝতে পারে যে আন্তর্জাতিক ফুটবলের সৌন্দর্য ও মেজাজ ধরে রাখতে এই নিয়মের কোনো বিকল্প নেই। ফিফা ক্যান অ্যাস্টনের প্রস্তাবটি গ্রহণ করে এবং ১৯৭০ সালের মেক্সিকো বিশ্বকাপে প্রথমবারের মতো লাল ও হলুদ কার্ডের নিয়ম আনুষ্ঠানিকভাবে চালু করা হয়।
ইতিহাসের প্রথম হলুদ কার্ডটি দেখার কীর্তি গড়েন সোভিয়েত ইউনিয়নের মিডফিল্ডার এভজেনি লোভচেভ। মেক্সিকোর বিরুদ্ধে বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচে রেফারি তাকে এই কার্ড দেখান। মেক্সিকো বিশ্বকাপে মোট ৫০টি হলুদ কার্ড দেখানো হয়েছিল। তবে আশ্চর্যের বিষয় হলো, সেই পুরো টুর্নামেন্টে একজন খেলোয়াড়কেও লাল কার্ড দেখতে হয়নি!
বিশ্বকাপের ইতিহাসে প্রথম লাল কার্ডটি দেখতে দর্শকদের অপেক্ষা করতে হয়েছিল ১৯৭৪ সালের পশ্চিম জার্মানি বিশ্বকাপ পর্যন্ত। চিলির খেলোয়াড় কার্লোস ক্যাসজেলি পশ্চিম জার্মানির বিপক্ষে ম্যাচে প্রথম লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়ার রেকর্ডের অধিকারী হন।
ফুটবলে কার্ডের ব্যবহার শুরুর পর খেলার মাঠের চিত্র পুরোপুরি বদলে যায়। খেলোয়াড়রা অনেক বেশি সচেতন হন এবং রেফারিদের নিয়ন্ত্রণও জোরালো হয়। ১৯৯২ সালে আরেকটি নিয়ম করা হয়, যেখানে বলা হয় কোনো খেলোয়াড় পেছন থেকে মারাত্মক ফাউল করলে রেফারি সরাসরি লাল কার্ড দেখাতে পারবেন।
ফুটবলের এই সাফল্য দেখে অন্যান্য খেলাও এই কার্ড পদ্ধতি লুফে নেয়। বর্তমানে রাগবি, হকি, হ্যান্ডবল এবং ক্রিকেটেও বিভিন্ন রঙের কার্ডের ব্যবহার দেখা যায়। এমনকি অলিম্পিকের হাঁটা প্রতিযোগিতাতেও নিয়মভঙ্গের জন্য কার্ডের ব্যবহার রয়েছে।
রেফারি ক্যান অ্যাস্টন ২০০১ সালে মারা যান। কিন্তু ফুটবলে তিনি যে অবদান রেখে গেছেন, তা চিরকাল তাকে স্মরণীয় করে রাখবে। তার এই একটিমাত্র আবিষ্কার ফুটবলকে অনেক বেশি নিয়মতান্ত্রিক ও গোছানো খেলায় পরিণত করেছে। ভাষা, সংস্কৃতি বা জাতীয়তার সীমানা পেরিয়ে ফুটবল যে আজ সত্যিই একটি ‘গ্লোবাল গেম’ বা বৈশ্বিক খেলা হয়ে উঠতে পেরেছে, তার পেছনে ক্যান অ্যাস্টনের ওই ট্রাফিক সিগন্যালে আটকে থাকার মুহূর্তটির অবদান অনস্বীকার্য। সূত্র: বিবিসি স্পোর্ট।







