ইসলামের দৃষ্টিতে গোত্র, বংশ ও দলীয় অন্ধ পক্ষপাত
আসাবিয়্যাত কী? আসাবিয়্যাত শব্দটি আরবি ‘আসব’ ধাতু থেকে এসেছে, যার অর্থ হলো কাউকে ঘিরে রাখা, তার পক্ষে দাঁড়ানো বা তাকে সমর্থন করা। ইসলামী পরিভাষায় আসাবিয়্যাত বলতে বোঝায়— সত্য-মিথ্যা বিবেচনা না করে নিজের গোত্র, বংশ, জাতি, পরিবার, দল বা গোষ্ঠীর পক্ষে অন্ধভাবে পক্ষপাত করা এবং অন্যায়ের ক্ষেত্রেও তাদের সমর্থন করা।
জাহেলী যুগে আসাবিয়্যাতের প্রেক্ষাপট
ইসলাম-পূর্ব আরব সমাজে মানুষের পরিচয়ের মূল ভিত্তি ছিল গোত্র। একজন ব্যক্তি ভালো-মন্দ যাই করুক না কেন, তার গোত্র তাকে সমর্থন করত। তাদের মূলনীতি ছিল “আমার ভাই জালিম হোক বা মজলুম, আমি তার পক্ষেই থাকব।” একটি গোত্রের সদস্য অন্য গোত্রের কাউকে হত্যা করলে বহু বছর ধরে প্রতিশোধের যুদ্ধ চলত। সামান্য ঘটনা থেকেও ভয়াবহ রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ শুরু হতো।
উদাহরণ: বু’আস যুদ্ধ আওস ও খাযরাজ গোত্রের মধ্যে দীর্ঘ যুদ্ধ। দাহিস ও গাবরা যুদ্ধ – একটি ঘোড়দৌড়কে কেন্দ্র করে বহু বছরের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ। এসব যুদ্ধের মূল কারণ ছিল আসাবিয়্যাত বা গোত্রগত অন্ধ পক্ষপাত।
ইসলাম এসে কী পরিবর্তন আনল
ইসলাম ঘোষণা করল, মানুষের মর্যাদার মাপকাঠি বংশ বা জাতি নয়; বরং তাকওয়া। আল্লাহ তাআলা বলেন: “হে মানুষ! আমি তোমাদেরকে এক পুরুষ ও এক নারী থেকে সৃষ্টি করেছি এবং তোমাদেরকে বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে বিভক্ত করেছি যাতে তোমরা পরস্পর পরিচিত হও। নিশ্চয়ই আল্লাহর নিকট তোমাদের মধ্যে সর্বাধিক সম্মানিত সেই ব্যক্তি, যে সর্বাধিক মুত্তাকি।” (আল হুজরাত ৪৯:১৩) এ আয়াত স্পষ্ট করে দেয় যে জাতি, বংশ ও গোত্র পরিচয়ের জন্য; শ্রেষ্ঠত্বের জন্য নয়।
হাদিসে আসাবিয়্যাতের নিন্দা
রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন, “সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয় যে আসাবিয়্যাতের দিকে আহ্বান করে, সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয় যে আসাবিয়্যাতের জন্য যুদ্ধ করে এবং সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয় যে আসাবিয়্যাতের উপর মৃত্যুবরণ করে।” (সুনানে আবু দাউদ) আরেক হাদিসে রাসূল সা. বলেছেন, “এটিকে (গোত্রগত পক্ষপাতকে) ছেড়ে দাও; কেননা এটি দুর্গন্ধময়।” (সহিহ বুখারী ও মুসলিম) এই কথা তিনি বলেছিলেন যখন মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে দলীয় স্লোগান উঠেছিল।
জালিমকে সাহায্য করার প্রকৃত অর্থ
রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: “তোমার ভাইকে সাহায্য কর, সে জালিম হোক বা মজলুম।”
সাহাবিরা জিজ্ঞেস করলেন, মজলুমকে সাহায্য করা বুঝলাম, জালিমকে কীভাবে সাহায্য করব?
তিনি বললেন: “তাকে জুলুম করা থেকে বিরত রাখবে।” (সহিহ বুখারি)
অতএব, অন্যায়ের সমর্থন করা নয়; বরং অন্যায় থেকে ফিরিয়ে আনাই প্রকৃত সাহায্য।
আসাবিয়্যাতের প্রতিক্রিয়া ও ক্ষতিকর প্রভাব
ন্যায়বিচার ধ্বংস হয়: যখন মানুষ সত্যের পরিবর্তে দল বা বংশকে প্রাধান্য দেয়, তখন বিচারব্যবস্থা নষ্ট হয়ে যায়। আল্লাহ বলেন: “কোনো সম্প্রদায়ের প্রতি বিদ্বেষ যেন তোমাদেরকে ন্যায়বিচার না করতে প্ররোচিত না করে।” (আল মায়িদা ৫:৮)
মুসলিম উম্মাহ বিভক্ত হয়: আসাবিয়্যাত মুসলমানদের মধ্যে বিভেদ, হিংসা ও শত্রুতা সৃষ্টি করে।
যুদ্ধ ও রক্তপাতের জন্ম দেয়: জাহেলী যুগের অধিকাংশ যুদ্ধের মূল কারণ ছিল গোত্রবাদ ও অন্ধ পক্ষপাত।
সত্যকে আড়াল করে: নিজ দলের লোক অন্যায় করলেও মানুষ তা সমর্থন করতে শুরু করে।
অহংকার সৃষ্টি করে: বংশ, জাতি বা ভাষার কারণে নিজেকে শ্রেষ্ঠ মনে করা শয়তানি স্বভাব।
রাসূল সা. বলেছেন, “কোনো আরবের উপর অনারবের, অনারবের উপর আরবের, শ্বেতাঙ্গের উপর কৃষ্ণাঙ্গের কিংবা কৃষ্ণাঙ্গের উপর শ্বেতাঙ্গের কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই; শ্রেষ্ঠত্ব কেবল তাকওয়ার দ্বারা।” (মুসনাদে আহমাদ)
আধুনিক যুগে আসাবিয়্যাতের রূপ
বর্তমানে আসাবিয়্যাত শুধু গোত্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর বিভিন্ন রূপ দেখা যায়:
-জাতীয়তাবাদে অন্ধ উগ্রতা
-বংশগৌরব
-রাজনৈতিক দলীয় অন্ধ সমর্থন
-পরিবারপ্রীতি ও স্বজনপ্রীতি
-ভাষাগত বা আঞ্চলিক অহংকার
-মাযহাব বা সংগঠনের নামে অন্যদের অবজ্ঞা
যখন সত্যের চেয়ে দলকে বড় মনে করা হয়, তখনই তা আসাবিয়্যাত হয়ে যায়।
উপসংহার
আসাবিয়্যাত হলো জাহেলী যুগের একটি মারাত্মক ব্যাধি, যা ইসলাম কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছে। মুসলমানের পরিচয় বংশ, গোত্র, জাতি বা দলের মাধ্যমে নয়; বরং ঈমান, তাকওয়া ও ন্যায়পরায়ণতার মাধ্যমে। একজন মুমিন সত্যের অনুসারী হবে, সে সত্য তার নিজের বিরুদ্ধে গেলেও।
আল্লাহ তাআলা বলেন, “হে মুমিনগণ! তোমরা ন্যায়বিচারের উপর দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত থাকো এবং আল্লাহর জন্য সাক্ষ্য দাও, যদিও তা তোমাদের নিজেদের বিরুদ্ধে হয়।” (আন নিসা ৪:১৩৫) সুতরাং, আসাবিয়্যাতের পরিবর্তে ইসলামের শিক্ষা হলো ন্যায়ের পক্ষে থাকা, জুলুমের বিরোধিতা করা এবং তাকওয়াকে মর্যাদার একমাত্র মাপকাঠি হিসেবে গ্রহণ করা। আল্লাহ আমাদেরকে আসাবিয়্যাত থেকে হেফাজত করুন এবং সত্য ও ন্যায়ের উপর অটল থাকার তাওফিক দান করুন। আমীন।







