দক্ষিন সুরমায় ব্যবসায়ী রাজ্জাক হত্যাকাণ্ড: ৮ মাসেও সনাক্ত হয়নি আসামী
সিলেটের দক্ষিণ সুরমা থানা এলাকায় হাজী রাজ্জাক হোসেন (৬৫) নামের এক ব্যক্তিকে নৃশংসভাবে হত্যার আট মাস পেরিয়ে গেলেও মামলার তদন্তে কোনো অগ্রগতি না হওয়ার অভিযোগ উঠেছে। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা (আইও) কোনো যোগাযোগ না করায় তদন্তের নিরপেক্ষতা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আবেদন জানিয়েছেন নিহতের ছোট ভাই মোঃ এমদাদ হোসেন। তিনি মামলাটি পুলিশের পরিবর্তে প্রশাসনের অন্য কোনো বিশেষায়িত সংস্থাকে দিয়ে তদন্তের জোর দাবি জানিয়েছেন।
মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, গত বছরের ৩১ অক্টোবর (৩১/১০/২০২৫ খ্রি.) সকাল অনুমান ১০.১৫ ঘটিকায় দক্ষিণ সুরমা থানাধীন তেলিরাই এলাকার নিজ বাসভবনের ৩য় তলার স্টোর রুম থেকে রক্তাক্ত অবস্থায় হাজী রাজ্জাক হোসেনের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। সুরতহাল প্রতিবেদনে দেখা যায়, নিহতের বুকে, পাজরে ও পেটে ধারালো ছুরি দিয়ে নৃশংস আঘাত করা হয়েছিল, যার ফলে তার নাড়িভুঁড়ি বের হয়ে যায়। এছাড়া সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর বিষয় ছিল, নিহতের পুরুষাঙ্গটি শরীর থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন অবস্থায় মেঝেতে পড়ে ছিল এবং লাশের পাশ থেকে একটি ২২ ইঞ্চি লম্বা রক্তমাখা ছুরি উদ্ধার করা হয়।
ঘটনার পর নিহতের স্ত্রী রোকসানা আক্তার লিপি (৫৫), ছেলে আসাদ হোসেন (২৮) এবং পুত্রবধূ তৌকি আলম চৌধুরী ইমা (২৫) ঘটনাটিকে ‘মানসিক ভারসাম্যহীনতার কারণে আত্মহত্যা’ বলে চালিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন। তবে সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে পুলিশ দেখতে পায়, ভোর ৬:০০ থেকে সকাল ৯:৩০ টার মধ্যে বাইরে থেকে কেউ ওই বাড়িতে প্রবেশ করেনি। ফলে পারিবারিক বা নারীঘটিত কোনো বিরোধের জেরে অজ্ঞাতনামা সহযোগীদের নিয়ে পরিবারের এই সদস্যরা রাজ্জাক হোসেনকে নৃশংসভাবে হত্যা করেছে বলে পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে সন্দেহ করা হয়। পরিবারের কোনো সদস্য বাদী না হওয়ায় দক্ষিণ সুরমা থানার এসআই মোঃ আনোয়ারুল কামাল বাদী হয়ে একটি হত্যা মামলা (মামলা নং- ০১, তারিখ: ০১/১১/২০২৫, জিআর- ১৫৭/২০২৫) দায়ের করেন।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো আবেদনে নিহতের ভাই মোঃ এমদাদ হোসেন উল্লেখ করেন, ঘটনার শুরুর দিকে তারা হতবিহ্বল থাকায় এটি যে একটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড তা বুঝে উঠতে পারেননি। কিন্তু পুলিশ তাদের সাথে কোনো পরামর্শ বা আলাপ-আলোচনার সুযোগ না দিয়ে অতি-উৎসাহী হয়ে অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৩০২/৩৪ ধারায় মামলাটি দায়ের করে।
এমদাদ হোসেনের অভিযোগ, মামলাটি দায়েরের পর দীর্ঘ আট মাস অতিবাহিত হয়ে গেলেও মামলার বর্তমান তদন্ত কর্মকর্তা (আইও) এবিএম শাহ আলম তাকে বা তার পরিবারের অন্য কোনো সদস্যকে আজ পর্যন্ত কোনো জিজ্ঞাসাবাদ করেননি। এমনকি ঘটনার পর তিনি তদন্তস্থলে মাত্র দুই দিন গিয়েছিলেন। তদন্তের এই রহস্যজনক স্থবিরতা এবং আইও সাহেবের কোনো প্রকার অগ্রগতি না জানানোয় পুরো প্রক্রিয়াটি নিয়ে তাদের মনে গভীর সন্দেহের সৃষ্টি হয়েছে।
হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটন এবং দোষীদের আড়াল করার চেষ্টা রুখতে মামলাটি দক্ষিণ সুরমা থানা পুলিশের হাত থেকে সরিয়ে অন্য কোনো নিরপেক্ষ ও দক্ষ তদন্ত সংস্থার (যেমন পিবিআই বা সিআইডি) কাছে হস্তান্তরের জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিকট আকুল আবেদন জানিয়েছেন নিহতের ভাই। এই আবেদনের অনুলিপি সিলেটের বিভাগীয় কমিশনার, জেলা প্রশাসক, পুলিশ কমিশনার ও দক্ষিণ সুরমা থানার অফিসার ইনচার্জসহ (ওসি) সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছেও পাঠানো হয়েছে।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে দক্ষিন সুরমা থানা ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কামরুল হাসান তালুকদার বলেন, ঘটনাটি আমার সময়ে ঘটেনি। তবে মামলার আইও শাহ আলম মামলার তদন্ত কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন। আশা করি খুব দ্রুতই হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটিত হবে।
মামলার কার্যক্রম স্তবির-এমন অভিযোগ অস্বীকার করে মামলার আইও এসআই শাহ আলম বলেন, যথারীতি তদন্ত কার্যক্রম চলছে। এ ঘটনায় নিহত ব্যবসায়ী হাজি আব্দুর রাজ্জাকের পরিবারের একাধিক সদস্যকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। পুরো তদন্ত শেষ করে শীঘ্রই প্রতিবেদন তৈরি করা সম্ভব বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের এডিসি (মিডিয়া) মোঃ মনজুরুল আলম বলেন, যেহেতু বিষয়টি সম্পর্কে আমি এখন অবগত হয়েছি, অবশ্যই মামলাটির বিষয়ে আমি বিস্তারিত খোঁজ নেবো।







