চুরি-ছিনতাইসহ অপরাধ ঠেকাতে গ্রামভিত্তিক পাহারা
রাত গভীর হলেই যখন অধিকাংশ মানুষ ঘুমিয়ে পড়েন, তখন হাতে টর্চ নিয়ে রাস্তায় বেরিয়ে পড়ছেন একদল তরুণ। গ্রামের প্রবেশপথ, মোড় ও অলিগলিতে পালাক্রমে দিচ্ছেন পাহারা। তাদের স্লোগান—‘আপনি ঘুমান, আমরা গ্রাম পাহারা দেব’। সাম্প্রতিক সময়ে চুরি ও অন্যান্য অপরাধ নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে বিয়ানীবাজারের বিভিন্ন এলাকায় তরুণদের এই স্বেচ্ছাসেবী উদ্যোগে স্থানীয়দের মধ্যে ফিরছে স্বস্তি।
অন্যদিকে অপরাধ নিয়ন্ত্রণে পুলিশও নিচ্ছে নতুন কৌশল। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে টহল জোরদার, গুরুত্বপূর্ণ স্থানে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন, অভিযানের সময় বডি ক্যামেরা ব্যবহার, প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি এবং জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত পুলিশি সাড়া নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। পুলিশ বলছে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে জনগণের অংশগ্রহণ গুরুত্বপূর্ণ হলেও কোনো অবস্থাতেই আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া যাবে না।
সাম্প্রতিক কয়েক মাসে বিয়ানীবাজার থানা এলাকায় বেশ কয়েকটি চুরির ঘটনা ঘটেছে। গত সপ্তাহে পৌরশহরের বিভিন্ন গ্রাম থেকে প্রায় ২০টি গ্যাস রাইজার চুরির ঘটনা ঘটে। পাশাপাশি কয়েকটি বাসাবাড়িতেও চুরির অভিযোগ পাওয়া যায়। এসব ঘটনায় নারীসহ অন্তত পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
এ পরিস্থিতিতে অপরাধ প্রতিরোধে স্থানীয় তরুণ-যুবকদের সম্পৃক্ত করার উদ্যোগ নিয়েছেন বিয়ানীবাজার থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আবু জাফর মোহাম্মদ মাহফুজুল কবীর। তিনি গ্রামভিত্তিক সামাজিক সংগঠনগুলোকে এলাকায় নজরদারি বাড়ানোর পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপনে উদ্যোগী হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
এরই মধ্যে বিয়ানীবাজার পৌরশহরসহ উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় স্থানীয় তরুণরা স্বেচ্ছায় রাত জেগে পাহারার দায়িত্ব নিয়েছেন। রাতের বেলায় গ্রামের প্রবেশপথ, গুরুত্বপূর্ণ মোড় ও অলিগলিতে পালাক্রমে অবস্থান করছেন তারা। স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তরুণদের এই উদ্যোগে রাতের নিরাপত্তা নিয়ে মানুষের উদ্বেগ অনেকটাই কমেছে।
পৌরশহরের খাসাড়িপাড়া এলাকায় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে একাধিকবার বৈঠক করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। বৈঠকে এলাকার বিভিন্ন প্রবেশপথ ও গুরুত্বপূর্ণ স্থানে নিয়মিত পাহারার ব্যবস্থা করা হয়েছে। সন্দেহজনক কোনো ব্যক্তি বা পরিস্থিতির দেখা দিলে দ্রুত পুরো এলাকায় খবর পৌঁছে দিতে বিশেষ যোগাযোগব্যবস্থাও চালু করা হয়েছে।
খাসাড়িপাড়ার বাসিন্দা মিজানুর রহমান রুমেল বলেন, “আমাদের গ্রামের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আমরা রাতে পাহারার ব্যবস্থা করেছি। গ্রামের মোড়ে মোড়ে ও প্রবেশপথে পাহারা বসানো হয়েছে। এলাকার লোকজন পালাক্রমে পাহারায় অংশ নিচ্ছেন।”
এদিকে বিয়ানীবাজার পৌরশহরসহ উপজেলার প্রত্যন্ত এলাকায় অপরিচিত ব্যক্তিদের চলাচলের ওপরও নজরদারি বাড়ানোর চেষ্টা করছে পুলিশ। বিশেষ করে রাত ১১টার পর সন্দেহজনকভাবে চলাচলকারী অপরিচিত ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদ ও প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই করা হবে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
তবে পুলিশ বলছে, কাউকে শুধুমাত্র অপরিচিত মনে হলেই হয়রানি করা যাবে না। পরিস্থিতি বুঝে দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে। অপরিচিত ব্যক্তির সঙ্গে শুরুতেই আক্রমণাত্মক না হয়ে অত্যন্ত নম্রভাবে কথা বলার পরামর্শ দিয়েছেন বিয়ানীবাজার থানার ওসি আবু জাফর মোহাম্মদ মাহফুজুল কবীর।
তিনি বলেন, ওই ব্যক্তির বডি ল্যাঙ্গুয়েজ ও আচরণ খেয়াল করতে হবে। তিনি যে উদ্দেশ্যে এসেছেন বলে দাবি করছেন, তার কথাবার্তা ও আচরণ সেই উদ্দেশ্যের সঙ্গে মিলছে কি না, সেদিকে তরুণ-যুবক পাহারাদারদের সতর্ক দৃষ্টি রাখা জরুরি। একই সঙ্গে অযথা কোনো মানুষ যাতে হয়রানির শিকার না হন, সেদিকেও গুরুত্ব দিতে হবে।
পুলিশ সূত্র জানায়, অপরাধ নিয়ন্ত্রণে পুলিশের সাড়া দেওয়ার সময় কমানোর পাশাপাশি গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে টহল জোরদার করা হচ্ছে। অভিযানের সময় বডি ক্যামেরা ব্যবহার, গুরুত্বপূর্ণ স্থানে সিসিটিভি স্থাপন, জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত সাড়া এবং অনলাইনে নজরদারি বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
পুলিশের পাশাপাশি স্থানীয় তরুণদের এই স্বেচ্ছাসেবী পাহারা বিয়ানীবাজারের বিভিন্ন এলাকায় নিরাপত্তা ব্যবস্থায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে। স্থানীয়দের প্রত্যাশা, তরুণদের এই উদ্যোগ শৃঙ্খলাবদ্ধ ও আইনসম্মতভাবে পরিচালিত হবে এবং পুলিশ ও জনগণের সমন্বিত প্রচেষ্টায় এলাকায় অপরাধ নিয়ন্ত্রণ আরও কার্যকর হবে।







