সিলেট অঞ্চলের সাম্প্রতিক বন্যার কারণ ও করণীয়

মোহাম্মদ এমরান হোসেন
ভৌগোলিক অবস্থানগত কারণে বাংলাদেশ প্রায়ই নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগের সম্মুখীন হয়। এগুলোর মধ্যে বন্যা অন্যতম। দুঃখ দারিদ্র্য অভাবের মতো বন্যাও যেন এদেশের মানুষের কাছে নিত্য নৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রায় প্রতিবছরই বন্যার সাথে যুদ্ধ করতে হয় এদেশের মানুষকে। বন্যা দাপটের বছর ১৯৫৪ থেকে ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত প্রায় ৩২টি বড় ধরনের বন্যা আঘাত হেনেছে। এর মধ্যে ১৭টিকে মহাপ্রলয়ংকরী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। বাংলাদেশের ইতিহাসে স্মরণকালের ভয়াবহ বন্যা হয় ১৯৮৮ ও ১৯৯৮ সালে। বিশেষভাবে সিলেট অঞ্চলে ১৯৯৯, ২০০৪, ২০০৭, ২০১৮, ২০১৯ ও ২০২০ সালে উল্লেখযোগ্য বন্যা হয়।
তবে ২০২২ ও ২০২৪ এর বন্যা ব্যতিক্রম, ১২২ বছরের ইতিহাসে সিলেট ও সুনামগঞ্জে এমন বন্যা হয়নি। ২০২২-এ সিলেটের সাথে সড়ক, রেল ও আকাশপথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় এবং ফসল ও মানুষের বাড়িঘর, রাস্তা-ঘাটের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। যা সরাসরি দেশের অর্থনীতিতে বিরুপ প্রভাব ফেলে। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশসহ অন্যান্য দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য স্থানে অতিরিক্ত দাবদাহের সাথে পৃথিবীর সবচেয়ে বৃষ্টিপ্রবণ এলাকা ভারতের চেরাপুঞ্জিতে রেকর্ড পরিমাণ বৃষ্টিপাত হয়। সেখানকার পানি সরাসরি বাংলাদেশের বিভিন্ন নদ-নদী এবং হাওরে এসে মিশে ভৈরব এ মেঘনা হয়ে বঙ্গোপসাগরে চলে যাওয়ার কথা থাকলেও নানা কারণে তা বাধাগ্রস্ত হয় এবং বর্তমানে একদিন একটু ভারী বৃষ্টিপাত হলেই উক্ত পানি উজান থেকে আসা পানির সাথে মিশে কুশিয়ারা এবং সুরমা নদীর দু’ কুল প্লাবিত করে পানি নগরসহ সিলেট বিভাগের একাধিক জেলায় প্রবেশ করে এবং রাতারাতি সিলেট ও সুনামগঞ্জ জেলার অধিকাংশ এলাকা পানির নিচে চলে যায়।
বন্যা সৃষ্টির প্রাকৃতিক কারণ:
বন্যা এবং আকষ্মিক বন্যার কারন এর সাথে এ অঞ্চলের ভৌগলিক অবস্থান ও গঠণ, অমাবস্যা,পূর্ণিমা,বায়ু প্রবাহের দিক, নদী ব্যবস্থার নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। বঙ্গোপসাগর এর প্রেক্ষিতে ফানেল আকৃতির (Funnel Shape) বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান, ভূ-প্রাকৃতিক গঠন বন্যা এবং বন্যা দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ। পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা সহ বিভিন্ন নদীগুলো বাংলাদেশকে আড়াআড়িভাবে অতিক্রম করে বঙ্গোপসাগরে পতিত হয়েছে। প্রধান এ ৩টি নদীর উৎস চীন, নেপাল, ভারত ও ভুটান। কিন্তু এসব নদী প্রবাহের ৮০ শতাংশেরও বেশি পানি বাইরে থেকে আসে এবং বন্যার জন্য দায়ী ৯০ শতাংশ পানিই এ ৩টি নদী নিয়ে উজান থেকে আসে। এ ৩টি নদীর মোট অববাহিকা এলাকার পরিমাণ ১৫,৫৪,০০০ বর্গ কিলোমিটার, যার মাত্র ৭ শতাংশ এলাকা এ দেশে অবস্থিত। বায়ু প্রবাহের দিক: বর্ষার কালে অর্থাৎ মে মাসের শেষ দিকে মৌসুমি বায়ু দিক পরিবর্তন করে দক্ষিণ-পশ্চিম দিক থেকে উত্তরের দিকে প্রবাহিত হয়। ভারত মহাসাগরের দক্ষিণ-পশ্চিম দিক থেকে প্রচুর জ্বলীয়বাষ্প নিয়ে হিমালয় পর্বতমালার দিকে প্রবাহিত হয়। এই দক্ষিণ-পশ্চিম বায়ুপ্রবাহের কারণে ভারতের আসাম, মেঘালয়, মিজোরাম ও সিলেট জেলার বিভিন্ন স্থানে প্রচুর বৃষ্টিপাত হয়। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, বার্ষিক মোট বৃষ্টিপাতের ৭০-৮০ শতাংশ বৃষ্টিপাত বর্ষাকালেই হয়।
বাংলাদেশের নদী ব্যবস্থা:
বাংলাদেশের নদীর অববাহিকাগুলো হলো গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনা। এগুলো বাংলাদেশ, ভারত, ভুটান, নেপাল ও চীনে বিস্তৃত। বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলের পানি সুরমা, কুশিয়ারা, মনু, খোয়াই এ ৪টি নদী দিয়ে প্রবাহিত হয়। ভারতের বরাক নদী বাংলাদেশ সীমান্তের কাছাকাছি জকিগঞ্জের অমলসীদ নামক স্থানে এসে দু’টো শাখায় বিভক্ত হয়ে উত্তরের শাখাটি ‘সুরমা’ আর দক্ষিণের শাখাটি ‘কুশিয়ারা’ নাম ধারণ করে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। মনু ও খোয়াই ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের পাহাড়ী অঞ্চল থেকে নিম্নমুখী প্রবাহ নিয়ে মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ জেলায় প্রবেশ করে কুশিয়ারায় মিলিত হয়েছে। এছাড়াও আরও বেশ কয়েকটি আন্তঃসীমান্ত নদী লংলা, গোয়াইন, পিয়াইন, সারী ইত্যাদি সিলেট অঞ্চলে প্রবাহিত। সিলেট অঞ্চলের নদ-নদীর উৎপত্তিস্থল ভারত হওয়ায় প্রতিবছর ক্যাচমেন্ট এলাকায় ভারী বৃষ্টির কারণে যে পাহাড়ি ঢলের সৃষ্টি হয়, এর সবই চলে আসে বৃহত্তর সিলেট। এতে প্রচুর পরিমাণ পলিমাটিও বাংলাদেশে আসে। বাংলাদেশ নিরাপদ পানি আন্দোলন (বানিপা) এর তথ্য মতে, ভারত থেকে প্রতি বছরে ১.২-২.৪ বিলিয়ন টন পলি নদীবাহিত হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে। বন্যার ফলে নদীর দু’কুল প্লাবিত হয়ে হাওড় সহ নদীগুলোর তলদেশ পলি পড়ে ক্রমান্বয়ে ভরাট হয়ে যাচ্ছে। পূর্বে এ ধরণের বন্যার পানি দ্রুত বৃদ্ধি এবং দ্রুত হ্রাস পেত। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে এ পানি দ্রুত নেমে না যাওয়ায় বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলে দীর্ঘস্থায়ী বন্যা দেখা দিচ্ছে। তাই বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও এর মাধ্যমে ক্ষয়ক্ষতি হ্রাস করার জন্য প্রয়োজন বিদ্যমান আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সাহায্য-সহযোগিতা জোরদার করা।
জলবায়ু পরিবর্তন:
আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, দক্ষিণ এশিয়ার মৌসুমী বৃষ্টিপাত যদিও প্রাকৃতিক বায়ুমন্ডলীয় প্যাটার্ন অনুসরণ করে, তবে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বৈশ্বিক তাপমাত্রা ক্রমাগত বাড়তে থাকায় এটি আরও অনিশ্চিত ও প্রবল হয়ে উঠছে। ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব ট্রপিক্যাল মিটিওরোলজির জলবায়ু বিজ্ঞানী রক্সি ম্যাথিউ কোল বলেন, বঙ্গোপসাগরে শক্তিশালী মৌসুমী বায়ু অনেক বেশি আর্দ্রতা বহন করতে পারে। আমরা এখন যে বিপুল বৃষ্টিপাত দেখছি, তা জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব হতে পারে। দক্ষিণ এশিয়ায় বর্ষা মৌসুম বায়ুতে এল নিনো-লা নিনা আবহাওয়া চক্র, ভারত মহাসাগরীয় ডাইপোলসহ মহাসাগর ও বায়ুমণ্ডলের একাধিক ওভারল্যাপিং প্যাটার্ন লক্ষ্য করা যায়। এই সিস্টেমগুলো বর্তমানে বঙ্গোপসাগরের ওপর দিয়ে শক্তিশালী দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় বায়ু প্রবাহিত করছে। কিন্তু সাম্প্রতিক দশকগুলোতে মৌসুমী বায়ুর ধরন বদলে গেছে। যখন বৃষ্টি হচ্ছে, এটি কয়েক ঘণ্টা থেকে কয়েক দিনের মধ্যে সমস্ত আর্দ্রতা ঢেলে দিচ্ছে। সাধারণ হিসেবে ভারতের চেরাপুঞ্জীতে পুরো বছরে ৫০০০ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়। এত বৃষ্টির পানি ধারণ করার ক্ষমতা বৃহত্তর সিলেট এবং সংলগ্ন এলাকার হাওরগুলোর নেই।
বন্যা সংঘটনের মনুষ্য সৃষ্ট কারণ:
একাধিক দপ্তর কর্তৃক পানি প্রবাহের পথ সংক্ষিপ্ত করে ব্রীজ, কালভার্ট নির্মাণ ছাড়াও পানি চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ করে রাস্তা তৈরী। এছাড়াও মানুষ খাল, বিল, ছোট ছোট নদী ভরাট করে নানা অবকাঠামো/স্থাপনা গড়ে তুলছে। ফলে আস্তে আস্তে নদীর তলদেশে পলি পড়তে থাকে। এর ফলে নদীর পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বাঁধাপ্রাপ্ত হয়। যা বন্যা সৃষ্টির অন্যতম কারণ।
নদী প্রণালীর পরিবর্তন: নদী প্রণালীর কৃত্রিম পরিবর্তন বন্যাকে প্ররোচিত করে। অতিবর্ষণে তীর পৃষ্ঠীয় প্রবাহের দ্বারা শীর্ষ-মৃত্তিকা ক্ষয়িত হয়ে নদীগর্ভে জমা হয়। এইভাবে নদীগর্ভে পলির ক্রমসঞ্চয়ে নদীর নাব্যতা হ্রাস পায়। ফলে, বর্ষাকালে অতিবর্ষণজনিত নদীপ্রণালী ধরে রাখতে সক্ষম হয় না। এমতাবস্থায় নদীর দু’কুল উপছিয়ে যাওয়া পানি নদীর উভয় পার্শ্বের সমতলকে প্লাবিত করে বন্যার তীব্রতা এবং বিস্তারকে বহুলাংশে বৃদ্ধি করে।
বন্যা প্রতিরোধে করণীয়: জলবায়ু পরির্তনের কারণে বাংলাদেশসহ আশেপাশের ক্যাচমেন্ট এলাকায় বৃষ্টিপাতের পরিমাণ বৃদ্ধিসহ অসময়ে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ বেড়েছে। ক্যাপিটাল ড্রেজিংসহ মেইনটেনেন্স ড্রেজিং অব্যাহত রাখলেও আকস্মিক স্থানীয়সহ আশেপাশের কেচমেন্ট এলাকায় ভারী বৃষ্টিপাতের ফলে উজান থেকে আগত বিপুল পানি বাংলাদেশের উজানের নদীগুলোর সীমান্তের শূণ্য পয়েন্ট থেকে ভৈরব(মেঘনা) পর্যন্ত বহন করার সক্ষমতা আছে কি না সমীক্ষা করা প্রয়োজন।প্রতি বছর বন্যার পানি নদীর দু’কুল প্লাবিত করে পার্শ্ববর্তী হাওরে প্রবেশ করায় পলি পড়ে হাওরের তলদেশ ভরাট হয়ে হাওরের পানি ধারণ ক্ষমতা কমে যাচ্ছে। বিদ্যমান বাস্তবতায় নদীর দু’পাশে ফ্লাড প্লেইন (Flood Plain) রাখাসহ পানি দ্রুত নিষ্কাশনের জন্য নদীর প্রস্থ কেটে বৃদ্ধি করা যেতে পারে। ফলশ্রুতিতে শুধু নদী খনন করলেও বন্যা পরিস্থি তির উন্নতি সম্ভব হবে না। তাই সুরমা ও কুশিয়ারা নদী খননের সাথে উজান/শূণ্য লাইন থেকে আগত ছোট ছোট নদ-নদী ও ছড়ার খনন কাজের সাথে নির্দিষ্ট সময় পর পর হাওরগুলোর খনন অন্তর্ভূক্ত করতে হবে। প্রয়োজনে নদীর দু’পাশের ফ্লাড প্লেইন এ অস্থায়ী বসতি স্থাপন যা দ্রুত সরিয়ে নেওয়া সম্ভব। বর্ষা মৌসুমে সুরমা নদীর উজান থেকে আসা পাহাড়ি ঢলের পানি ছাড়াও যাদুকাটা, চেলা নদী, চলতি নদী, চানপুর ও লুৎমা/লাকমা ছড়া দিয়ে উজানের বিপুল পানি সুনামগঞ্জ জেলার সুরমা নদী অংশে বাংলাদেশে প্রবেশ করে। ভারী বর্ষণে উজান থেকে বিপুল পানি বহণ করার ক্ষমতা নদীগুলোর না থাকায় মূলনদী সুরমাসহ সুনামগঞ্জ অংশে অন্যান্য নদীর আশেপাশে বন্য ছড়িয়ে পড়ে। এছাড়াও কিশোরগঞ্জ জেলার অল ওয়েদার (All weather) সড়কের কারনে সুরমা নদীর পানির সাথে উজানের ছোট/বড় নদী ও ছড়ার আগত পানি সরে যেতে না পারায় স্থানীয়ভাবে বন্যার সৃষ্টির কারন হতে পারে। যা পরিবীক্ষণ করা যেতে পারে। কালের পরিক্রমায় শহরের অভ্যন্তরের অধিকাংশ জলাশয়ই ভরাট করে বিভিন্ন ধরণের ভৌত অবকাঠামো নির্মাণ করা হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ভারী বৃষ্টিসহ অতি বৃষ্টির কারণে সৃষ্ট পানি ধারণক্ষমতা শহরগুলোর অভ্যন্তরে কমেছে। একই সময়ে নগরে বৃষ্টিপাত এবং উজানের পানির কারনে নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় শহরের পানি দ্রুত নামার ক্ষেতে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হচ্ছে। ফলশ্রুতিতে স্বাভাবিক বন্যার হাত থেকে শহর রক্ষা জন্য প্রতিরক্ষা/বেষ্টনীমূলক বাঁধ নির্মাণ করলেও বন্যা হতে মুক্তি পাওয়া সম্ভব নাও হেতে পারে। এজন্য অতি বৃষ্টির ফলে শহরের অভ্যন্তরে জমা হওয়া পানি নিষ্কাশনের বিকল্প ব্যবস্থা রাখতে হবে। এছাড়াও সুরমা ও কুশিয়ারা ড্রেজিং কাজ একই সময়ে করতে হবে।
বন্যা নিয়ন্ত্রণে একাধিক ব্যবস্থা:
(১) Flood plain এলাকায় সহজে স্থানান্তরযোগ্য বসতি তৈরি করা (২) নদীর দু’তীরে ঘন জঙ্গল সৃষ্টি করা (৩) নদী-শাসন ব্যবস্থা সুনিশ্চিত করা (4) পুকুর, নালা, বিল প্রভৃতি খনন করা এবং সেচের পানি সংরক্ষণ করা খ. শ্রমসাধ্য ও ব্যয়বহুল প্রকৌশল ব্যবস্থাপনা (১) ড্রেজারের মাধ্যমে নদীর তলদেশ খনন করে পানির পরিবহন ক্ষমতা বৃদ্ধি করা (2) উজানের ৫৪টি নদী থেকে আসা পানিকে বাঁধের সাহায্যে নিয়ন্ত্রণ ও প্রয়োজনে নিষ্কাশন (৩) সমুদ্র উপকূলবর্তী এলাকায় পানির অনুপ্রবেশ নিয়ন্ত্রণ/বন্ধ করা (৪) নদী তীরকে স্থায়ী সুদৃঢ় কাঠামোর সাহায্যে সংরক্ষণ করা গ. সহজ প্রকৌশলগত ব্যবস্থাপনা (১) নদীর দু’তীরে বেড়িবাঁধ দিয়ে নদীর পানি উপচেপড়া বন্ধ করা (২) সার্বিক বনায়ন সৃষ্টি করা (৩) রাস্তাঘাট নির্মাণের ক্ষেত্রে সমীক্ষা পূর্বক পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা রাখা (৪) শহর বেষ্টনীমূলক বাঁধ দেওয়া এবং অতি বৃষ্টির ফলে শহরের অভ্যন্তরে জমা হওয়া পানি নিষ্কাশনের বিকল্প ব্যবস্থা রাখতে হবে ঘ. প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা: (১) নদীর গতিপথে জমে থাকা পলি উন্নত প্রযুক্তির মাধ্যমে অপসারণের ব্যবস্থা এবং পলি জমে যেসব হাওড়, বিল ভরাট হয়ে গেছে সেগুলো পর্যায়ক্রমিক খননের ব্যবস্থা করা (২) গড়ে উঠা অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করে নদী প্রবাহের পথ উন্মুক্ত রাখা (৩) পরিবেশগত সমীক্ষা পূর্বক রাস্তা-ঘাট, ব্রিজ, বাঁধ তৈরি করতে হবে যাতে সেগুলো পানির স্বাভাবিক গতিপথে বাঁধা সৃষ্টি না করে (৪) নদীর পাড়ে ব্যাপকভাবে বনায়ন করে নদী ভাঙ্গণ রোধ।
উপসংহার:
আর্থিক সক্ষমতা বৃদ্ধির সাথে সাথে বন্যা নিয়ন্ত্রণে ধারাবাহিকভাবে বাংলাদেশ সরকার নানা কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ অব্যাহত রেখেছে। বর্তমানে দুর্যোগ মোকাবেলায় বাংলাদেশ বিশ্বে রোল মডেল। অপরিকল্পিত নগরায়ণ,যথাযথ পরিবেশগত সমীক্ষা ছাড়াই নিচুভূমি/জলাভূমি ভরাট করে ভৌত অবকাঠামো নির্মাণ,কালের পরিক্রমায় নদীর নাব্যতা হ্রাস পাওয়া, নদ-নদী অপদখল ,হাওড়ের মাঝ দিয়ে রাস্তা তৈরী, উজান থেকে আসা ৫৪টি নদীর উৎসমুখ থেকে মূল প্রবাহ সংযোগ পযর্ন্ত নিয়মিত ড্রেজিং এর মাধ্যমে প্রবাহ শতভাগ সচল না থাকা,বৃহত্তর সিলেটের নদীগুলোর ভৈরব পর্যন্ত কার্যকর ড্রেজিং না হওয়া এবং পর্যায়ক্রমিকভাবে হাওড়গুলো খনন/ড্রেজিং না করার কারণে স্থানীয়সহ উজান থেকে আসা অতিবৃষ্টির পানিপ্রবাহ বিঘ্নিত হয়ে বন্যা হচ্ছে। বন্যা বাংলাদেশের মানুষের কাছে নতুন কোনো বিষয় নয়। নানা ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির মতো এই ঘাতক বন্যাও যেন এদেশের মানুষের কাছে চিরায়ত একটি সংস্কারে পরিণত হয়েছে। ভৌগোলিক অবস্থানগত কারণেই এটি বন্ধ করা আমাদের পক্ষে সম্ভব না।তারপরও বন্যার ক্ষতিকর প্রভাব যতটুকু পারা যায় ততটুকু কমানোর চেষ্টা করা উচিত। এর জন্য প্রয়োজন সর্বস্তরের জনগণের সম্মিলিত প্রচেষ্টা। সর্বোপরি, জলবায়ু পরিবর্তনের কারনে বৃহত্তর সিলেটের ক্যাচমেন্ট এলাকায় ভারী বর্ষণের ফলে উজান থেকে আসা পানি বহনের সক্ষমতা নিয়মিত ড্রেজিং করলেও বিদ্যমান নদীগুলোর আছে কিনা সমীক্ষা করা প্রয়োজন। তাই প্রয়োজনে নদীর প্রস্থ বৃদ্ধি করা,নদীর প্রয়োজনীয় অংশে লুপ কাট (Loop cut)’সহ হাওরগুলো পর্যায়ক্রমিক খননের মাধ্যমে পানি নিষ্কাশন ও ধারন ক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যমে বন্যা নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি ভাবা যেতে পারে।
লেখক: জোনাল সেটেলমেন্ট অফিসার, সিলেট ও সাবেক পরিচালক, পরিবেশ অধিদপ্তর, সিলেট