কেন ইলহান ওমরের নাম নিয়ে প্রশ্ন তুললেন ট্রাম্প
যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেস সদস্য ইলহান ওমরের নাম নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। দেশটির প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার পদত্যাগ দাবি করেছেন। এর সূত্রপাত বিচার বিভাগের একটি আদালত-সংক্রান্ত নথিতে ওমরকে অন্য একটি নামেও উল্লেখ করার পর। ট্রাম্প ওই নামকে পরিচয় জালিয়াতির অভিযোগের প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরছেন। তবে নথিটিতে ওমরের বিরুদ্ধে জালিয়াতির কোনো সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়নি। এ ঘটনায় তার বিরুদ্ধে কোনো ফৌজদারি অভিযোগও আনা হয়নি।
মিনেসোটা অঙ্গরাজ্যের ডেমোক্রেটিক পার্টির এই কংগ্রেস সদস্যের নাম নিয়ে বিতর্কের সূত্রপাত হয় তার অভিবাসনসংক্রান্ত অতীত নিয়ে চলমান কেন্দ্রীয় তদন্তের মধ্যে। গত ১২ অক্টোবর ওয়াশিংটন ডিসিতে তার বাড়িতে তল্লাশি চালান কেন্দ্রীয় কর্মকর্তারা। এরপর আদালতের নথিতে তার নামের ভিন্ন উল্লেখ সামনে আসায় বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে।
গত বুধবার জমা দেওয়া বিচার বিভাগের নথিতে ওমরকে ‘ইলহান নুর সাঈদ এলমি, ওরফে ইলহান আবদুল্লাহি ওমর’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। ইংরেজিতে ‘এ কে এ’ (a/k/a) শব্দবন্ধের অর্থ ‘অন্য নামেও পরিচিত’।
তবে নথিতে এই নামগুলোর মধ্যে সম্পর্ক কী, তা ব্যাখ্যা করা হয়নি। এর জবাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে ওমর লিখেছেন, ‘বিষয়টি পরিষ্কার করে বলি। আমার নাম সব সময়ই ইলহান ওমর।’
চলমান একটি ফৌজদারি তদন্তের অংশ হিসেবে ওয়াশিংটন ডিসিতে ওমরের বাড়িতে তল্লাশি চালান কেন্দ্রীয় কর্মকর্তারা। আদালতের অনুমোদিত পরোয়ানার ভিত্তিতে এই তল্লাশি চালানো হয়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, সোমালিয়া থেকে যুক্তরাষ্ট্রে আসার সময় অভিবাসনসংক্রান্ত কাগজপত্রে ওমর অথবা তার প্রয়াত বাবা মিথ্যা তথ্য দিয়েছিলেন কি না, তা তদন্তের বিষয়। ১৯৯৫ সালে শৈশবে পরিবারের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রে এসেছিলেন ওমর। তবে তিনি কোনো অন্যায় করার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তার ভাষ্য, এই তল্লাশি রাজনৈতিকভাবে ভয় দেখানোর চেষ্টা।
ওমরের বাড়িতে তল্লাশির পর সংশ্লিষ্ট গোপন আদালতের নথি প্রকাশের আবেদন করে জুডিশিয়াল ওয়াচ, নিউইয়র্ক টাইমসসহ ১৬টি সংবাদমাধ্যম ও সংগঠন। ওয়াশিংটন ডিসির কেন্দ্রীয় জেলা আদালতে এসব আবেদন করা হয়।
জুডিশিয়াল ওয়াচ তল্লাশির পরোয়ানা, এর পক্ষে দেওয়া হলফনামা এবং জব্দ করা জিনিসপত্রের তালিকা প্রকাশের দাবি জানায়।
গত ২১ অক্টোবর: নথিতে ওমরের অন্য নাম
আদালতের নথি প্রকাশের আবেদনের জবাব দিতে আরো সময় চেয়ে আবেদন করে বিচার বিভাগ। ওই আবেদনে ওমরকে ‘ইলহান নুর সাঈদ এলমি, ওরফে ইলহান আবদুল্লাহি ওমর’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
তবে নাম দুটির মধ্যে সম্পর্ক কী, তা ব্যাখ্যা করেনি বিচার বিভাগ। বরং তল্লাশির পরোয়ানা কার্যকর করার কাজ পুরোপুরি শেষ না হওয়া পর্যন্ত জবাব দেওয়ার সময় বাড়ানোর আবেদন জানায়।
সরকার জানায়, তল্লাশি শেষ হওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে আদালতে অগ্রগতির প্রতিবেদন জমা দেওয়া হবে।
ফক্স নিউজ ডিজিটাল আদালতের নথির বরাত দিয়ে ওমরের নাম নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এতে নাম প্রকাশ না করা কয়েকটি সূত্রের বরাত দিয়ে বলা হয়, তার জন্মগত নাম ইলহান নুর সাঈদ এলমি।
প্রতিবেদনটি প্রকাশের পর ওমরের নাম এবং ২০০৯ সালে আহমেদ নুর সাঈদ এলমিকে বিয়ে নিয়ে পুরোনো গুঞ্জন আবার সামনে আসে। কেউ কেউ দাবি করে আসছেন, ওই ব্যক্তি ওমরের ভাই। তবে ওমর বারবার এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
এ সময় ট্রাম্প ওমরের বিরুদ্ধে আক্রমণ আরো জোরালো করেন এবং তার পদত্যাগ দাবি করেন। আদালতের নথিতে থাকা বিকল্প নামকে তিনি জালিয়াতির প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরেন। কিন্তু নথিতে এমন কোনো সিদ্ধান্ত নেই। ওমরের বিরুদ্ধে কোনো ফৌজদারি অভিযোগও আনা হয়নি।
আলজাজিরাকে দেওয়া এক বিবৃতিতে ওমরের মুখপাত্র বলেন, ‘কংগ্রেস সদস্যের নাম সব সময়ই ইলহান ওমর। এর অন্য কোনো ইঙ্গিত সম্পূর্ণ মিথ্যা।’
এক্সে দেওয়া পোস্টেও অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেন ওমর। তিনি অভিযোগ করেন, খবর খারাপ হলেই ট্রাম্প বিচার বিভাগকে ব্যবহার করে ষড়যন্ত্রতত্ত্ব ছড়ান।
ওমর লেখেন, ‘যখনই খবর খারাপ হয়, এই লোকটি একটি নাম নিয়ে হাজির হন—আমার নাম। তাই বিষয়টি পরিষ্কার করে বলি। আমার নাম সব সময়ই ইলহান ওমর।’
এরপর ট্রাম্পকে নিজের ভাইস প্রেসিডেন্টের প্রকৃত নাম নিয়ে মনোযোগ দেওয়ার কথাও বলেন তিনি।
এমএস নাওয়ের সাংবাদিক ক্রিস হেইসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ওমর বলেন, তাকে কংগ্রেস থেকে সরিয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যেই এসব আক্রমণ করা হচ্ছে।
তার মতে, সমালোচকেরা মনে করেন, তার মতো পটভূমি ও ধর্মবিশ্বাসের কারও কংগ্রেসে থাকা বা যুক্তরাষ্ট্রের আইন প্রণয়নে প্রভাব রাখার অবস্থানে থাকা উচিত নয়।
ওমর বলেন, ‘কংগ্রেসের সদস্য হওয়ার আইনগত অধিকার আমার আছে। এই দায়িত্ব পালন করতে পেরে আমি সম্মানিত।’
ওমরের নাম নিয়ে বিতর্ক এমন এক সময়ে সামনে এসেছে, যখন যুক্তরাষ্ট্রের মুসলিম রাজনীতিকদেরও একই ধরনের আক্রমণের মুখে পড়তে হচ্ছে। তাদের মধ্যে রয়েছেন মিশিগান থেকে সিনেট নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির প্রার্থী আবদুল আল-সাইয়েদ।
বৃহস্পতিবার আলজাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মিশিগানের এক ভোটার প্রশ্ন তোলেন, আল-সাইয়েদ কেন তার ‘প্রকৃত নাম’ ব্যবহার করেন না। তার পূর্ণ নামের দিকেই ইঙ্গিত করেছিলেন ওই ভোটার বলে মনে করা হচ্ছে।
ওই ভোটার বলেন, ‘আবদুলের নাম খুব একটা সামনে আসে না। তিনি নিজের প্রকৃত নামও বলেন না। কেন তিনি নিজের প্রকৃত নাম প্রকাশ করতে পারেন না?’
আল-সাইয়েদের রিপাবলিকান প্রতিদ্বন্দ্বী মাইক রজার্সের পুরো নাম জানেন কি না, জানতে চাইলে ওই ভোটার বলেন, ‘মোহাম্মদ তার মধ্যনাম নয়।’
আল-সাইয়েদের পূর্ণ নাম আবদুর রহমান মোহাম্মদ আল-সাইয়েদ। সিনেট নির্বাচনের প্রচারে তার আরব পরিচয় ও মুসলিম ধর্মবিশ্বাস নিয়েও আক্রমণ করা হয়েছে। ট্রাম্প তার নাম নিয়ে বিদ্রূপ করেছেন এবং তাকে ‘জিহাদি’ বলেছেন।
এক নির্বাচনী সমাবেশে ট্রাম্প বলেন, তিনি এল-সাইয়েদকে ‘মোহাম্মদ’ বলে ডাকতে পারেন। এরপর যোগ করেন, ‘আমি তাকে যা খুশি তাই বলতে পারি।’






