ইমতিয়াজ রহমান ইনু
মাদক প্রতিরোধ করতে সক্ষম হলে ৭০ ভাগ অপরাধ কমে যাবে
আমি এই তো, আমার শহরে গত দশ জুন দেখলাম এ যাবত সবচাইতে মাদকের বিরুদ্ধে অভিযান আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের। মাদক আসক্তদের সাথে যোগ করে নিলাম এই শহরে কয়েকজন শিশুদের নিয়ে ছবি। পত্রিকার পাতা গর্ব করার নয়, কেন তারা আজ নেশায় আসক্ত। এই দিনে এই সময় থাকতো কোন আপন মানুষের কাছে। মা, বাবা, ভাই বোন আত্মীয়স্বজন প্রতিবেশীর ভালোবাসায় মগ্ন হয়ে থাকতো মন। তাদের স্কুল পাঠশালায় বই পাতায় কলম আর সাদা খাতা সবুজ শ্যামল নানা রঙের ছোঁয়া ছবি আঁকা নয়তো খেলা মাঠে। দুষ্টামিতে মায়ের আদরে সন্তান কিন্তু নেশায় মাতাল হয়ে আছে তাদের মধ্যে ও তরুণ তরুণী যুব সমাজ অনেকে।
একটি গবেষণায় দেখা গেছে, আমাদের দেশে আড়াই লক্ষ শিশু মাদকাসক্ত। আট থেকে সতেরো বছরের ছেলেমেয়ে প্রতিদিন শহরের কোন না কোন পথে কোন কারণে কত ধরনের নেশায় আসক্ত হচ্ছে প্রতিনিয়ত। তরুণ তরুণী যুবসমাজ বিভিন্ন পেশার মানুষ আমি কি আপনি কখনো তাদের প্রতি নিয়ে নেশা আসক্ত ব্যক্তি দেখলে ঘৃণা করি। তাদের অপরাধী বলি। কেন সে-তো আঠারো হাজার প্রাণির মাঝে মানুষকে শ্রেষ্ঠ উপাধি দিয়েছেন মহান প্রভু। মানুষ জাতি তাদের মাঝে তারাও মানুষ। মহান বাণী আছে ’পাপকে ঘৃণা করো পাপীকে নয়’। দিনে দিনে এইসব শিশুরা তরুণ প্রজন্মের নেশা আসক্ত টাকার জন্য ছোট ছোট অপরাধ থেকে এক সময় বড় অপরাধী হয়ে যায়। এমনকি তাদের দেখাদেখি অন্য শিশু, কিশোর-কিশোরীরাও অপরাধে জড়ায়।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে বেকারের সংখ্যা প্রায় ছাব্বিশ থেকে সাতাশ লক্ষ। এর মধ্যে বেকারত্বের হার চার দশমিক তেষট্টি শতাংশ। বেকারের কারনে অনেকে নেশা নিতে পারে এবং অল্প বয়সী গ্যাংরা কিছু কিছু পাড়া মহল্লায় বাংলার কোন কোন সিনেমার মতো নেশা ও অপরাধ করে যাচ্ছে। কিছু কালো মুখোশধারীরা এই সমাজের আড়ালে থেকে তাদের দিয়ে অপকর্ম করায়। সেই সময় তাঁরা বিভিন্ন ধরনের নেশার সেবন গ্রহণ করে। যেমন ডেন্ডি, গাঁজা, কাশির সিরাপ, ফেনসিডিল, ঘুমের ওষুধ, মদ, হিরোইন, ইয়াবা, সিরিঞ্জের মাধ্যমে পেথেটিন আইস ইত্যাদি। সময় সময় নতুন নতুন নেশা আবিষ্কার হচ্ছে প্রতিনিয়ত যা সমাজ ও জাতির জন্য ক্ষতিকর। পূর্বের দশ বছরে দেখা গেছে মাদকাশক্ত সন্তানের কাছে দুইশত জন পিতা-মাতা প্রাণ হারিয়েছেন মাদকের জন্য। সমাজে চুরি, ছিনতাই, ডাকাতি, খুন, খারাপির মতো অপরাধ প্রতিনিয়ত বাড়ছে। একজন মাদকাসক্ত প্রতিদিন নেশা করার জন্য নেশার ধরনের উপর একশত থেকে এক হাজার টাকা পর্যšন্ত নেশা সেবল ও পান করেন। একশত জন মাদকাসক্তের মধ্যে দশ জন বৈধ পথে টাকা দিয়ে মাদক সেবন করে। বাকি নব্বই জন অবৈধ টাকায় মাদক সেবন করে। যেমন চুরি, ছিনতাই বিভিন্ন অপরাধ করে। আমাদের সমাজে অনেক সময় দেখা যায় মাদকাসক্ত মাতাল হয়ে হঠাৎ মৃত্যু হয়। মাদক সেবনকারী তাকে বলে ওভার ডোজ হচ্ছে অতিরিক্ত মাত্রায় মাদক সেবন ও গ্রহণ করিলে মৃত্যু হয়। মাদক কিভাবে সেবন করে। মাদকসেবীরা তিন ধরনের মাদক গ্রহণ করে। কেউ মুখের পান করে, কেউ নিঃশ্বাসের মাধ্যমে আবার কেউ শরীরের রগের সিরায় ইনজেকশনের মাধ্যমে। আধুনিক যুগে মোবাইল ফোনের মাধ্যমে মাদকের বিভিন্ন নাম দিয়ে হাতের নাগালে মাদক পাচ্ছে তারা। বিভিন্ন মাদক স্পটে এইসব মাদক আসছে কোথায় থেকে। আমাদের প্রতিবেশী সীমান্ত এলাকা এবং দেখা যাচ্ছে আমাদের দেশে কিছু সংখ্যক রোহিঙ্গারা মাদক পাচার করে নিয়ে আসতেছে। সাগর পথে ও নতুন কৌশলে আমাদের দেশে প্রতিনিয়ত এসব মাদক নিয়ে আসতেছে। যে কেউ ও অল্প বয়সী শিশুরা দিনে দিনে কেন মাদকাসক্ত হচ্ছে। যেমন কৌতুহলে অজানাকে জানতে, পারিবারিক অশান্তি পিতা-মাতার থেকে বঞ্চিত, অস্বচ্ছতায় সঠিক সময় রাস্তঘাটে ভালো বন্ধু পরামর্শদাতা না পাওয়ায়। অসচেতনতায় বিভিন্ন অজুহাতে শিক্ষা থেকে দূরে থাকায় অমনোযোগী হওয়া ঘনবসতি বাস করায়, শহরের কলোনী, ফুটপাতে ফ্লাইওভার থাকার কারণে টোকাই স্থানে থাকার জন্য অতিরিক্ত পারিবারিক শাসনের ভয়ের কারণে, বাড়িঘর ছেড়ে চলে আসায় শহরে, অভিভাবক ছাড়া শিশু ছোট্টখাটো অপরাধ করিলে কিংবা অপরাধ না করলে সমাজ লজ্জাজনক কথা বলায় লজ্জা দেওয়ায় মেনে না নিয়ে নেশায় আসক্তি হয়ে পড়ে। মানসিক চাপে ক্ষনিকের জন্য আনন্দ পাওয়ার জন্য, একাকীত্ব থাকায় ভালোবাসার প্রিয়জন মানুষ কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন, কষ্ট পাওয়ায়, লেখাপড়া শেষ করে চাকরি কিংবা কাজ না পাওয়ার কারণে, বেকারত্বের বন্ধু-বান্ধবের আড্ডায়, কোন উৎসবে পার্টিতে, পিতা মাতা ব্যস্ততা থাকা সন্তানকে সময় না দেওয়ার কারণে। পারিবারিক অশান্তি পরিবার সাথে মাদক সেবন করার জন্য সমাজের ছোট্ট হয়ে থাকে সমাজে মানুষের কাছে মাদকাসক্তের লেখাপড়া থেকে ঝরে পড়ে। সমাজিক একজন মাদকাসক্তের জন্য দেখাদেখি আরও অনেক মাদকাসক্ত জন্ম নেয়। সমাজে বিভিন্ন অপরকর্ম হয় মাদক একজন মাদকাসক্ত সন্তান জন্ম নিলে প্রতিবন্ধী হয়, অনেক সময় দেখা বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়।
অর্থনৈতিক: নিজের যা অর্থ থাকে তা দিয়ে মাদক সেবন করে পরিবারের যা অর্থ থাকে তা দিয়ে মাদকের জন্য শেষ করে দেয়। পরিবার পরিজনকে আথিক অনটনে ফেলে বন্ধুর নিকট আত্নীয় স¦জন থেকে ধার নেওয়া কোন কারণে সমাজে বিভিন্ন ধরনের অপরাধের করে মাদক টাকার জন্য চুরি রাহাজানি প্রবনতা বৃদ্ধি ও মাদক সেবন ও বিক্রির অপরাধে জেলে যায়।
শারীরিক: মাদকের টাকার জন্য অনেক সময় মাদকাসক্ত শরীরের রক্ত বিক্রি করে। স্মৃতি শক্তি লোপ পায়, জন্ডিস, শরির ফুলে যায়, ইনজেকশনের মাধ্যমে নেশা নেওয়ার জন্য সুই সিরিঞ্জ ভাগাভাগি করার কারণে, এইচআইভি এইডস ও হেপাটাইটিস বি রোগে আক্রান্ত হয়। হৃদরোগ ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ে। যৌন ক্ষমতা লোপ পায়, দৃষ্টি শক্তি কমে যায়, শরীরে বিভিন্ন অঙ্গে ক্ষত বা গা হয়। বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয় ছোয়াছে ভাইরাসে আক্রান্ত হয়। শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়। শারীরিক ভারসাম্যতা নষ্ট হয়। ক্ষুধা-মন্দা সৃষ্টি হয় ইত্যাদি।
সমাজিক: মাদক ব্যবহারকারীদের অবস্থা গরিব ও অসহায় যায়। অপরাধী ও অপরাধমূলক কাজে জড়িয়ে পড়ে পরিবার ও সমাজে গ্রহনযোগ্যতা পায় না। সমাজে মাদবসেবী হিসাবে দেখে ও ডাকে চুরি করে ঋণ করে পরবর্তীতে নেশার সেবণ নেয়ার জন্য বাসা বাড়ি নেই। রাস্তায় স্টেশনে ফুটপাতে, শহরের ফ্লাইওভারে জীবনযাপন কাটায়। চিকিৎসা ব্যাক্তিগত সেবা সুবিধা পায় না। অপেক্ষাকৃত কম স্বাস্থ্য সেবা পায়। ব্যক্তি পরিচর্যা থেকে বঞ্চিত মানুষের প্রতি বিশ্বাস হারিয়ে ফেলে।
মানসিক: উত্তেজনা,আত্মহত্যার প্রবণতা মানসিক তীব্র প্রতিক্রিয়া উচ্ছৃঙ্খলা আচরণ, অসংলগ্ন ব্যবহার দুর্বলতা ও হতাশা বৃদ্ধি। নেশার ভুল ধারনা? ধূমপান কোন ধরনের নেশা নয়, এক চুম্মা মদ এক পাতার ড্রাগ গাজা হিরোইন ইয়াবা ব্যবহার করলে কেউ নেশায় আসক্ত হয়না। আমার আয়ের সাথে নেশা টাকা চালানো সম্ভব। মানসিক কোন চাপ কষ্টের চাইতে যে কোন ধরনের নেশা পান করে ঘুমানো ভালো। একদিন নেশা করলে কিছু হয় না।
মাদকাসক্তদের চেনার উপায়: দিনে দিনে টাকা পয়সার চাহিদা বৃদ্ধি পায়, বিভিন্ন অজুহাতে টাকা পয়সা চাওয়া, অনেক রাত্রে বাসায় ফেরা, নতুন নতুন বন্ধু বান্ধবের আগমন, ঘুম ঘুম ভাব, বাথরুম থেকে বাহির হতে সময় লাগা, শরীরের একই জামা কয়েকদিন পরে, আত্মীয়-স্বজন থেকে দূরে থাকা, একই স্থানে থাকা, ঘুম থেকে দেরি করে উঠা, নেশা না নেওয়ার কারণে অসুস্থতা, সারা শরীরে ব্যাথা, খিটখিটি মেজাজ, বাসার দামি দামি জিনিসপত্র নাই হওয়ায়।
আমাদের ইসলাম ধর্মে হুদাইমা নামক ব্যক্তির ঘটনা: নবীজি (সা.)-এর দরবারে এক ব্যক্তি বারবার মদ্যপান করে আসছিলেন। সাহাবিরা তাকে শাসন করত গিয়ে তাকে অভিশাপ বা কটূক্তি করলেন। তখন নবীজি (সা.) সাহাবিদের বারণ করে বললেন, ‘তোমরা তাকে লজ্জিত করো না এবং তার বিরুদ্ধে শয়তানকে সহায়তা করো না, বরং তার জন্য আল্লাহর কাছ ক্ষমা চাওয়া। সনাতন ধর্মে নেশা ও কুব্যসনকে বলা হয়েছে অহিতকর অভ্যাস যা ব্যক্তির নৈতিক চরিত্র ও আধ্যাত্মিক উন্নতির অন্তরায়। প্রাচীন হিন্দু ধর্মীয় শাস্ত্রে (যেমন মনুস্মৃতি) মদ, জুয়া ও অতিরিক্ত কামনাসহ যেকোনো ধরনের নেশাকে “কুব্যসন” বা নৈতিক স্খলন বলা হয়েছে। বৌদ্ধ ধর্মে জাগতিক কোনো আসক্তি বা নেশাকে সরাসরি “তৃষ্ণা” (আসক্তি) এবং “উপাদান” (জড়িয়ে পড়া বা আঁকড়ে ধরা) বলা হয়েছে। এছাড়া যেকোনো ধরনের নেশাজাতীয় দ্রব্য, যা মনের চেতনা ও সচেতনতা নষ্ট করে, তাকে পালি ভাষায়। খ্রিস্টানধর্মের পবিত্র গ্রন্থ বাইবেল সরাসরি ‘মাদকাসক্তি’ বা ‘নেশা’ শব্দগুলো ব্যবহার না করলেও, এতে নেশা এবং ক্ষতিকারক আসক্তি সম্পর্কে সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা দেওয়া আছে। বাইবেলের শিক্ষায় নেশা ও আসক্তিকে আধ্যাত্মিক এবং শারীরিক দাসত্ব হিসেবে বিবেচনা করা হয়। একজন ব্যক্তি মাদক ছাড়তে হলে তার কি প্রয়োজন তার সৎ ইচ্ছা মনোভাব যথেষ্ট থাকতে হবে। পরিবার তাকে মাদক ছাড়ার সাথে সাথে তার প্রতি নজর রাখা এবং ভালোবাসা ও তাহার প্রতি যত্ন নেওয়া। সমাজিক সংগঠনে তাকে জড়িয়ে নেওয়া, শিল্প কুটি শিল্প চর্চা করা, গল্প গল্পের বই পড়া, সে পরিবার কি বা সমাজে যাহার কথা সে রাখে তার প্রতি বেশি সময় দেওয়া, যেকোনো কর্মের প্রতি তার বেশি মনোভাব তৈরি করা। গৃহ পালিত পশু পালনে তাকে উৎসাহিত করাঅ নিজ ধর্ম সম্পর্কে তাকে ধর্মের প্রতি মনোভাব তৈরি করা। ধর্মীয় এর প্রতি আদেশ নিষেধ মানা, মাদক বিক্রি এলাকা থেকে দূরে রাখা। মাদক সেবী বন্ধু-বান্ধব থেকে দূরে রাখা। পূর্বের দিনে মাদক নেওয়ার জন্য তাকে কটু কথা না বলা। পরিবার আত্মীয়-স্বজন প্রতি বন্ধুত্ব আচরণ করা তাহার প্রতি। ৭০ ভাগ অপরাধ কমে যাবে তখন আমরা যখন মাদক প্রতিরোধ করতে সক্ষম হবো।
বাংলাদেশ পুলিশের এবং মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) নিয়মিত দেশব্যাপী চলমান অভিযানে প্রতি বছর মাদক সম্পর্কিত বিভিন্ন অপরাধে গড়ে প্রায় নয় হাজার থেকে দশ হাজার জন গ্রেফতার হয়। প্রায় দশ হাজারটি মামলা হয়। মাদক পাচারের মাধ্যমে বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর গড়ে প্রায় আট চল্লিশ কোটি দশ লাখ মার্কিন ডলার (যা প্রায় পাঁচ হাজার একশত সাত চল্লিশ কোটি টাকা) বিদেশে পাচার হয়ে থাকে। মাদক প্রতিরোধে আমাদের সকলের সচেতন হতে হবে। পাড়া মহল্লায় মাদক প্রতিরোধ কমিটি গঠন করা। মসজিদ মন্দির গির্জায় প্রত্যেক ধর্মের ধর্মীয়গুরু মাদক সম্পর্কে বলা। তরুণ যুব সমাজদের কাউন্সিলিং পরামর্শ সেন্টার খোলা। মাদক ব্যবসায়ীদেরকে চিহ্নিত করে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে সহযোগিতা ও তথ্য দেওয়া। প্রতিটি জেলায় সরকারিভাবে মাদক নিরাময় পূর্ণবাসন খোলা, পূর্ণবাসনের চিকিৎসা কর্মস্থান করা অতি জরুরী। মাদক স্পট এলাকায় পরিবেশ সুন্দর করা প্রতিনিয়ত। এইসব এলাকায় আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর্তি তদারকি করা, আসুন তরুণ প্রজন্মেরকে এখন থেকে সুন্দর একটা মাদকমুক্ত ভালো আদর্শ সমাজ উপহার দেওয়া আমাদের সকলের প্রচেষ্টা চালাই।







