শ্বশুরবাড়িতে দেশি মোরগে জামাই আপ্যায়ন এখন কেবলই গল্প
‘শ্লোক আছে- শ্বশুরবাড়ি মধুর হাড়ি। কথাটি খুবই সত্য। আমাদের সময় শ্বশুরবাড়ি মানেই ছিল বাহারি পদের পিঠাপুলি ও অন্যান্য খাবার। শ্বশুরবাড়িতে ঢুকতেই একটা ধর ধর চিল্লাপাল্লার আওয়াজ কানে ভেসে আসতো। সেটি ছিল ডাক ফোটা ঝুটি ওয়ালা মোরগ ধরার আওয়াজ। জামাইয়ের জন্য ধরা হতো বাড়িতে পোষা দেশি মোরগ। দুপুরে মাছ বা অন্যান্য খাবার থাকলেও রাতে সেই মোরগ দিয়ে আপ্যায়ন করা হতো মেয়ে জামাইকে।’
এভাবেই শ্বশুরবাড়ির গল্প শোনালেন পাবনা সদর উপজেলার দোগাছি ইউনিয়নের সদিরাজপুরের বাসিন্দা ষাট বছর বয়সী আব্দুর রহমান।
আব্দুর রহমানের দাবি, প্রায় ১৫ বছর আগে শ্বশুরবাড়িতে নাইওর খেয়েছেন তিনি। তবে সেই নাইওরের শেষবারে মোরগ জোটেনি, জুটেছিল বাড়িতেই খোলা পরিবেশে পালিত দেশি মুরগি।
সম্ভবত ওই সময় থেকেই বড় ঝুটিওয়ালা দেশি মোরগ দিয়ে জামাই আদরের দিন ফ্যাকাশে হতে শুরু করে। এখন আর জামাই বা স্বজন গেলে মোরগ ধরা হয় না। সেই জায়গা দখল করে নিয়েছে গরুর মাংস। কমবেশি মহিষ বা খাসির মাংসও রয়েছে এর স্থলে। এর কারণ আগের মতো গ্রামগঞ্জে খোলা পরিবেশে আর দেশি মোরগ বা মুরগি পালন করা হয় না।
আব্দুর রহমান বলেন, ‘ধান চৈতালি (ফসল) বতর (ঘরে তোলা) নেওয়ার পর আমরা কিছুটা অবসর সময় কাটাতাম। শ্বশুরবাড়ির লোকজন জানতো এই সময়ই মেয়েকে নিয়ে জামাই আসবে। এছাড়া বিভিন্ন উৎসবকেন্দ্রিক সময়ও যেতাম। আমরা কবে শ্বশুরবাড়ি যাবো সেই অপেক্ষায় বড় মোরগটি রেখে দেওয়া হতো। কোনোভাবেই সেটি নিজেরা জবাই করে খেতো না। উল্টো বিভিন্নভাবে খবর পাঠাতো- বড় মোরগটি রাখা হয়েছে, আমরা যেন দ্রুত আসি। বলা তো যায় না কখন শেয়াল বেজিতে ধরে খেয়ে ফেলে বা রোগবালাই হয়। এরপর আমরা যখন শ্বশুরবাড়ি যেতাম তখন বাড়ির সবাই মিলে দৌড়াদৌড়ি করে মোরগ ধরা হতো। বাড়িতে ছেলে ছোকরা না থাকলে প্রতিবেশী ছেলে ছোকরাদের ডেকে তাদের দিয়ে মোরগ ধরা হতো। এখন সেটি নেই।’
তিনি বলেন, ‘শুধু জামাই আদরের ক্ষেত্রে নয়, আত্মীয়-স্বজন গেলেও বড় মোরগ মারা হতো। বাড়িতে আসা মেহমানকে কতটা আপ্যায়ন করা হলো তা মূল্যায়ন হতো আত্মীয়ের জন্য মোরগ মেরেছে কি না, মারলে সেটি কত বড়- এসবের ওপর। এখন এসব উৎসবী কাজকারবার একদম নেই। মোরগ-মুরগিও নেই।’
এ বৃদ্ধ আরও বলেন, ‘এখন বাড়িতে মোরগ-মুরগি সেভাবে লালন-পালন হয় না। অথচ আগে আমাদের বাড়িগুলোতে দুই থেকে তিনটি খোপে মুরগি পালা হতো। প্রতিদিন ভোরবেলা খোপগুলোর দরজা খুলে বাড়ির উঠানে খাবার দেওয়া হতো। সেসময় বাড়ির উঠান ভরে যেতো। বাচ্চারা দেখে আনন্দ পেতো। এখন এসব শুধুই গল্প। সেভাবে কেউই মুরগি পালে না। এখনকার নারীরা এসবকে ঝক্কিঝামেলা মনে করে। এদের বড় একটা অংশ এগুলোকে নোংরা কাজও মনে করে। ফলে দেশি মুরগি বা মোরগ এখন সেভাবে মেলে না।’
আব্দুর রহমানের দাবির সূত্র ধরে খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, গ্রামগঞ্জে আসলেই খোলা পরিবেশে মুরগি পালন তেমন হারে হচ্ছে না। পাবনা গ্রামের অধিকাংশ শুধু নামেই গ্রাম। এখানকার আবহ বা পরিবেশ অনেকটা শহুরে। শহুরে চিন্তাধারা ও জীবন ব্যবস্থায়ই চলছে সব। ফলে অধিকাংশ গ্রামে পূর্বের মতো গৃহপালিত এই পাখি আর পালন করা হয় না। তবে চাটেমোহর, সাঁথিয়া, বেড়া, সুজানগর, ভাঙ্গুড়া, ফরিদপুর, ঈশ্বরদী, আটঘরিয়া বা সদর- এসব উপজেলায় একেবারেই প্রত্যন্ত গ্রামে এখনো তুলনামূলক বেশি দেশি মুরগি পালন হয়। তবে ১০-১৫ বছর আগের তুলনায় তা প্রায় অর্ধেক কমে এসেছে। ফলে অস্বাভাবিক হারে দাম বেড়েছে এসব মুরগির। বড় ঝুটিওয়ালা পছন্দসই কাঙ্ক্ষিত সেই লাল মোরগ মেলা তো অসম্ভব ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে।
পাবনা শহরের মুরগি গলির মুরগি দোকানি মো. শফিকুল জাগো নিউজকে জানান, চাহিদা থাকলেও দেশি মোরগ-মুরগি পাওয়া কঠিন হয়ে গেছে। দামও অনেক বেশি। বর্তমানে ৭৪০-৭৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।
মাঝখানে দুদিন দেশি মুরগি ছিল না জানিয়ে এই দোকানি বলেন, ‘আমরা সাধারণত ফড়িয়াদের থেকে কিনে থাকি। কিন্তু ফড়িয়ারাও মুরগি কম পাচ্ছে। তারা গ্রামে গ্রামে ঘুরেও মুরগি পাচ্ছে না। অথচ আগে বিভিন্ন হাট বা মোড়ে মোড়ে মাঝে মাঝেই গৃহস্থদের মুরগি নিয়ে বসে থাকতে দেখা যেতো।’
পাবনা শহরের বই লাইব্রেরি মোড় থেকে একটি মুরগি কিনেছেন শহিদুল আলম। তিনি বলেন, ‘একজন তিনটা মুরগি নিয়ে মোড়ে বসেছিল। সেগুলো নাকি তার বাড়িতে পোষা। বেশ কয়েকদিন ধরে দেশি মুরগি খুঁজছিলাম, কিন্তু পাচ্ছিলাম না। দোকানে যা পাওয়া যায় তা আসলেই দেশি কি না কে জানে। তাই চেষ্টা করি গৃহস্থদের থেকে নিতে। কিন্তু আগের মতো এখন মেলেই না।’
এ বিষয়ে সরকারি এডওয়ার্ড কলেজের বাংলা বিভাগের বিভাগীয় প্রধান সহযোগী অধ্যাপক রুহুল আমিন বলেন, ‘আমরা ছোটবেলায় দেখেছি, মা নামাজ শেষে ভোরে উঠানে ঝাঁক ধরে মুরগিকে খাবার দিতেন। এসব বিষয় বর্ণনা বা বিভিন্নভাবে সাহিত্যের অনুষঙ্গ হয়ে এসেছে। কিন্তু এখন সেটি দেখা যায় না।’
কারণ হিসেবে সাহিত্যের এ শিক্ষক বলেন, ‘পূর্বে মানুষ স্বনির্ভর ছিল। কারণ সেসময় সব কিছুর এত সহজলভ্যতা ছিল না। কিন্তু এখন সেটি হয়েছে। সবকিছুই হাতের নাগালে পাওয়া যাচ্ছে। ফলে স্বনির্ভরতা বা নিজে উৎপাদনের জায়গা থেকে আমরা সরে এসেছি। শ্রমহীনভাবে যতটা সহজে পাওয়া যায়, এই পলিসিতে চলে এসেছি। তাছাড়া এখন বিভিন্ন হাইব্রিড জাতের মুরগি এসেছে। এগুলো দ্রুত বাড়ে। এর বাইরে আগে খোলামেলা আঙিনা ছিল। ফলে এগুলো পালন করা সহজ ছিল। এখন পর্যাপ্ত পরিমাণে সেটিও নেই। এসব কারণে আগের মতো বাড়িতে মুরগি পালন করতে দেখা যায় না। অতিথি আপ্যায়নেও পরিবর্তন এসেছে। তবে এটি বিলুপ্ত হচ্ছে এমন নয়। কেউ কেউ বাণিজ্যিকভাবেও দেশি মুরগি পালন করছেন। গ্রামেও কমবেশি তো হচ্ছেই।’
পাবনা জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. জহুরুল ইসলাম বলেন, এখন সবাই প্রতিটি বিষয় বাণিজ্যিকভাবে নেয়। এক্ষেত্রে দেশি মুরগিতে লাভের সুযোগ কম। এর বিপরীতে ব্রয়লার, সোনালি বা অন্যান্য হাইব্রিড জাতের মুরগিতে এ সুযোগ বেশি। ফলে হাইব্রিডেই মানুষ ঝুঁকছে বেশি।
তিনি আরও বলেন, সময়ের সঙ্গে মুরগির মাংস ও ডিমের চাহিদা বাড়ছে। যেটি দেশি মুরগি দিয়ে মেটানো সম্ভব নয়। একটি দেশি মুরগি বছরে কয়েক দফায় সর্বোচ্চ ৩০-৩৬টি ডিম দেয়। এর বিপরীতে হাইব্রিড জাতগুলো দিচ্ছে ৩২০টির মতো। তাছাড়া এ জাতগুলোর বৃদ্ধিও দেশি মুরগির তুলনায় অনেক বেশি। এজন্য দেশি মুরগি পালনে খামারিরা উৎসাহ কম পাচ্ছেন। তবে একেবারেই পালন হচ্ছে না তা নয়। চাহিদা থাকায় কমবেশি উৎপাদন এখনো হচ্ছে।







