ঐতিহ্যবাহী যত প্রাচীন দিঘির জনপদ
দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিত ফেনী জেলা। ঐতিহাসিকভাবে অঞ্চলটি তার বিশাল বিশাল দিঘি এবং বীরত্বগাথার জন্য সমাদৃত। ফেনী হাজার বছরের পুরোনো ঐতিহাসিক জনপদ। এর আছে গৌরবগাথা ঐতিহ্য। ঐতিহ্যের অজস্র নিদর্শন ছড়িয়ে আছে গ্রাম থেকে গ্রামে। আপামর জনগণ গৌরববোধ করেন এসব ঐতিহ্যবাহী ও ঐতিহাসিক নিদর্শন নিয়ে। শ্রদ্ধাভরে স্মরণও করেন জনপদের জ্ঞানী, গুণী ও কৃতিমান বীরদের। ওইসব গুণী ব্যক্তিদের জ্ঞানসহ নানা নিদর্শন ফেনীকে আলোকিত করেছে।
হাজার বছরের পুরোনো বিভিন্ন নিদর্শনের চিহ্ন পাওয়া না গেলেও মানবতার কল্যাণে বিশুদ্ধ খাবার পানির জন্য যখন টিউবওয়েলের অস্তিত্ব ছিল না; তখন পানির সংকট দূর করতে খনন করা হয় এসব দিঘি। দিঘিগুলো হিতৈষী ব্যক্তিদের সৎকর্মের সাক্ষ্য আজও বহন করছে। জেলার গ্রাম-গঞ্জে ছড়িয়ে আছে অসংখ্য দিঘি। এসব দিঘিতে মাছ চাষ, পাড়ে বনায়ন করার মাধ্যমে মানুষের উপকার হচ্ছে। দিঘিগুলোতে গোসল, গৃহস্থালির নানা সরঞ্জাম ধোয়া, পানি রান্না-বান্নার কাজে ব্যবহার হচ্ছে।
অনুসন্ধানে পাওয়া উল্লেখযোগ্য দিঘির পরিচিতি তুলে ধরা হলো:
রাজাঝির দিঘি
ফেনীর ঐতিহাসিক দিঘির একটি রাজাঝির দিঘি। শহরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত এ দিঘির সঠিক ইতিহাস পাওয়া না গেলেও অনুমান করা হয়, ত্রিপুরার কোনো রাজা বা তাদের অধীনস্থ কোনো জমিদার ৫-৭শ বছর আগে রাজাঝির দিঘি খনন করেন। সম্ভবত দিঘিটির অনুকরণে পরে বৃহত্তর নোয়াখালীর বিভিন্ন স্থানে জমিদাররা দিঘি খনন করেন। তখন জনহিতে দিঘি খননের ঐতিহ্য গড়ে ওঠে। সেই ঐতিহ্যের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত ‘রাজাঝির দিঘি’ নামকরণ করা হয়। আয়তন ৯ একর। চার পাড় প্রায় ১ মাইল। ১৮৭৫ সালে ফেনী মহকুমা প্রতিষ্ঠিত হলে তার সদরদপ্তর গড়ে তোলা হয় রাজাঝির দিঘির পাড়ে। মোট ১০.৩২ একর আয়তন বিশিষ্ট দিঘিটি ফেনীর ঐতিহাসিক ও দর্শনীয় স্থানের একটি।
বিজয় সিংহ দিঘি
ফেনী শহরের অদূরে সার্কিট হাউজের সামনে বিজয় সিংহ দিঘি অবস্থিত। এরও কোনো সঠিক ইতিহাস পাওয়া যায়নি। খুব সম্ভব বিজয় সিংহ গ্রামে অবস্থিত কোনো রাজার নামে হয় বিজয় সিংহ দিঘি। এটিও ত্রিপুরার কোনো রাজা ৫-৭শ বছর আগে খনন করে থাকবেন। তবে বিজয় সিংহ নামে ত্রিপুরায় কোনো রাজা ছিলেন না। অত্যন্ত মনোরম প্রাকৃতিক পরিবেশে অবস্থিত বিশাল দিঘির চৌপাড় খুব উঁচু ও বৃক্ষ শোভিত। এর আয়তন ৩৭.৫৭ একর। ফেনীর ঐতিহ্যবাহী দিঘির মধ্যে এটি অন্যতম।
মহিপাল দিঘি
ফেনী শহরের অদূরে মহিপাল এলাকায় অবস্থিত দীঘিটিরও সাঠিক ইতিহাস পাওয়া যায়নি। এটিও আনুমানিক ৫-৭শ বছর আগে খনন করা হয়েছিল। মহিপাল নামক ব্যক্তির নামানুসারে এ দিঘির নামকরণ হয়েছে বলে জনশ্রুতি আছে।
পরশুরামের ঐতিহাসিক দিঘি
শমসের গাজী দিঘি
শমসের গাজী দিঘিটি পরশুরামের সাতকুচিয়া গ্রামে অবস্থিত। ভাটির বাঘ শমসের গাজী প্রজা সাধারণের সুবিধার্থে যে কয়টি দিঘি খনন করেন, তার মধ্যে এটি অন্যতম। এ দিঘি কখনো সেচ দেওয়া হয়েছে এ রকম তথ্য কেউ দিতে পারেননি।
উজিরের দিঘি
এটি পরশুরামের মির্জানগর ইউনিয়নের দূর্গাপুর গ্রামে অবস্থিত। ১ হাজার শতাংশ জমির ওপর এ দিঘি খনন করা হয়। মহারাজ বীর বিক্রম কিশোর মানিক্য বাবা মহারাজা বিবেন্দ্র মানিক্য বাহাদুরের নামে ১৯২৫ সালে এ দিঘি বন্দোবস্ত হয়। স্থানীয়রা জানান, এটি খনন করা হয় তারও বহু আগে। প্রায় ৫০ বছর আগে দিঘিটি সেচ দেওয়া শুরু করলেও সম্পূর্ণ সেচ দেওয়া সম্ভব হয়নি। দিঘির ভেতরে আরও ৭টি পুকুরের অবস্থান। পুকুরগুলো খুব গভীর হওয়ায় সেচ দিয়ে পানি তোলা সম্ভব হয়নি। দিঘিটি খনন করা নিয়ে আছে নানা কথা। কেউ বলেন, মানুষের পক্ষে এত বড় দিঘি খনন করা সম্ভব নয়। কেউ কেউ বলেন, মহারাজার উজিরেরা হাজার হাজার লোক-লস্কর নিয়ে উজিরের দিঘি খনন করেছেন। দিঘির পাড়ে কবরস্থান, বৃক্ষসারি, প্রাথমিক বিদ্যালয়, ঈদগাহ, দোকানপাট ও জনবসতি আছে।
মধু মালতী দিঘি
এ দিঘি কি সেই কিংবদন্তির মধু মালতীর নামে হয়েছে কি না তা আজও জানেন না কেউ। বহু জনশ্রুতি আছে দিঘিটিকে ঘিরে।
রশমের দিঘি
এটি সলিয়া গ্রামে অবস্থিত। জনশ্রুতি আছে, বহুদিন আগে রশম নামের এক নারী এ দিঘির মালিক ছিলেন। এ জন্য তাঁর নামানুসারে এ দিঘির নামকরণ করা হয়।
ভাঙার দিঘি
বহু প্রাচীন এ দিঘি চিথলিয়া গ্রামে অবস্থিত। দিঘির এক পাড় ভাঙা বিধায় ভাঙার দিঘি হিসেবেই জনমানুষের কাছে এর পরিচিতি।
কালীর দিঘি
খন্ডল কালী বাজারে এর অবস্থান। দিঘির পাড়ে হিন্দুদের কালী মন্দিরের অবস্থান। বিধায় এর নামকরণ করা হয়েছে কালীর দিঘি।
চাঁদগাজী-মানগাজী দিঘি
মানগাজী বাজারে এ দুটি দিঘি অবস্থিত। অষ্টাদশ বা তারও আগে চাঁদগাজী-মানগাজী নামে দুই ধনাঢ্য ব্যক্তি ছিলেন। তাদের নামানুসারে এ দুটি দিঘির নামকরণ করা হয়। এ ছাড়া বক্সমাহমুদের সাহেবনগরে সাহেবের দিঘি, কোলাপাড়ায় চৌধুরীর দিঘি উল্লেখযোগ্য।
সোনাগাজী দিঘি
দিঘিটি সোনাগাজীতে অবস্থিত। তুর্কিস্থানের পীর নয়নগাজী ফেনী জেলার যোগিদিয়া পরগনার তুলাতুলী গ্রামে ১৭৮০ সালে বসতি স্থাপন করেন। ইসলাম প্রচারের জন্য মূলত এ অঞ্চলে তার আগমন। সোনাগাজী ও ছিয়াগাজী নামে তার দুই পুত্রসন্তান ছিল। বাবা নয়ন গাজীর মত্যুর পর ওই দুই ছেলে আধিপত্য বিস্তারের সাথে সাথে প্রচুর উন্নতি করেন। ১৮১০ সালে সোনাগাজীর নামে সোনাগাজী বাজার স্থাপিত হয়। সোনাগাজী পরে এ এলাকায় পানীর জলের সমস্যা লাঘব করতে দিঘি খনন করেন। তার নামানুসারে সোনাগাজীর দিঘি নামকরণ হয়। এ ছাড়া সোনাগাজী উপজেলায় আরও ছোট-বড় কয়েকটি দিঘি আছে।
ছাগলনাইয়ার ঐতিহ্যবাহী দিঘি
কৈয়ারা দিঘি
শমসের গাজী তাঁর মায়ের নামে কৈয়ারা দিঘি খনন করেন। এটিও একটি বিশাল দিঘি। এতে ৮টি মাটির বেড়ী আছে। ছাগলনাইয়া উপজেলা সদরের নিকটবর্তী কোনাপুর গ্রামে এটি অবস্থিত।
একখুইল্লা দিঘি
শমসের গাজীর স্মৃতিবিজড়িত একখুইল্লা দিঘি। এটি একটি বিরাট কুয়া বা পুকুর। এর গভীরতাও খুব বেশি। এ পুকুরের কোনো ঘাট নেই। ছালগনাইয়া উপজেলার সীমান্তবর্তী চম্পকনগর গ্রামে এর অবস্থান। এ ছাড়া নর্দমার দিঘি, রাআইট্যা দিঘি প্রভৃতি উল্লেখ্যযোগ্য।
দাগনভূঞার যত দিঘি
দাগনভূঞা দিঘি
মুঘল সম্রাট শাহজাহানের ছেলে শাহজাদা সুজার আমলে বারোভূইয়াদের কোনো এক উপবংশের মাতুভূঞা ও দাগনভূঞা নামে দুজন বিশিষ্ট ব্যক্তি ওই সময় এখানে বসতি পত্তন করেছিলেন। তাদের একজনের নামে দাগনভূঞা এলাকার নামকরণ করা হয়। তিনি একটি দিঘি খনন করেন। পরে তাঁর নামানুসারে সেটিকে দাগনভূঞা দিঘি নামকরণ করা হয়। এটি অনেক গভীর। এর পাড়ে সরকারি ইকবাল মেমোরিয়াল কলেজ ও দাগনভূঞা পৌরসভা স্থাপিত হয়েছে।
কাশির দিঘি
দাগনভূঞার ওমরাবাদ গ্রামে অবস্থিত কাশির দিঘি। ৩-৪শ বছর আগে এটি খনন করা হয়েছে বলে অনুমান করা হয়। অত্যন্ত মনোরম প্রাকৃতিক পরিবেশে অবস্থিত বিশাল এ দিঘির চৌপাড় খুব উঁচু ও বৃক্ষ শোভিত। এর আয়তন ১৯.২০ একর। প্রাচীনকালে এলাকার ‘কাশি’ নামক ব্যক্তির নামে এ দিঘির নামকরণ করা হয়েছে বলে ধারণা করা হয়।
দুই সতীনের দিঘি
রাজাপুর ইউনিয়নের জয়নারায়ণপুর গ্রামে দিঘি দুটি অবস্থিত। জনশ্রুতি আছে, স্থানীয় এক ব্যক্তি দুই বিয়ে করেন। প্রথম বউয়ের আচরণে খুশি হয়ে একটি দিঘি খনন করেন। পরে অপর বউ বায়না ধরলে তাকেও একটি দিঘি খনন করে দেন। প্রথম বউয়ের দিঘিটি বড় হয়। দ্বিতীয় বউয়ের দিঘিটি ছোট হয়। লোকমুখে শোনা যায়, সতীনদ্বয় তাদের নিজের দিঘিতে গোসল করতেন। দিঘি দুটির ব্যবধান ২০০ মিটার হবে। দুই সতীনের দুই দিঘি হিসেবে এর নামকরণ করা হয় ‘দুই সতীনের দিঘি’।
ভবানী দিঘি
রাজাপুর ইউনিয়নের ভবানীপুর গ্রামে অবস্থিত এই দিঘি। ‘ভবানী’ নামক ব্যক্তির নামানুসারে দিঘির নাম এবং গ্রামের নামকরণ করা হয়েছে বলে ধারণা করা হয়। দিঘির পাড়গুলো বড় ও উঁচু। পাড়ে সবুজ বৃক্ষশোভিত। এ দিঘি দাগনভূঞার অন্যতম ঐতিহ্যবাহী দিঘি।
হইল্লার দিঘি
পূর্ব চন্দ্রপুর ইউনিয়নের বৈঠারপাড় গ্রামে অবস্থিত হইল্লার দিঘি। এ দিঘির চারপাশে উঁচু ৫ একর আয়তনের এ দিঘিতে মাছ চাষ করা হচ্ছে। দিঘির পানি স্বচ্ছ ও পরিষ্কার হওয়ায় এলাকার মানুষ এর পানি রান্নাবান্নার কাজে ব্যবহার করেন। সারাদিন দিঘিতে সূর্যের আলো পড়ে। এর নামকরণ সম্পর্কে জানা যায়নি। এ ছাড়া কুরবার দিঘি, সোনাপুর দিঘি, উমা দিঘি, ভূঞার দিঘি ঐতিহাসিক প্রাচীন দিঘি।
শ্রীহীন দিঘি
অপরদিকে কোনো কোনো দিঘি রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ভরাট হয়ে যাচ্ছে। পাড় ভেঙে বনায়ন করার ফলে শ্রীহীন হয়ে পড়ছে। এগুলো সঠিক রক্ষণাবেক্ষণের জন্য বাস্তবসম্মত ব্যবস্থা গ্রহণ করা গেলে ঐতিহ্যবাহী ও ঐতিহাসিক সম্পদগুলো কালের সাক্ষী হয়ে থাকবে।
এ বিষয়ে ফেনীর জেলা প্রশাসক মনিরা হক বলেন, ‘ফেনীকে কেন দিঘির জেলা বলা হয়, তার প্রমাণ মেলে জেলার পরতে পরতে ছড়িয়ে থাকা বিশাল সব জলাশয়ে। বিশাল দিঘিগুলোর শান্ত জল আর মানুষের কর্মচাঞ্চল্য ফেনীকে বাংলাদেশের মানচিত্রে অনন্য মর্যাদা দিয়েছে। ঐতিহ্যবাহী ফেনী বিজয় সিংহ দিঘি, রাজাঝির দিঘিসহ কয়েকটি দিঘিকে কেন্দ্র করে পর্যটনকেন্দ্র বা বিনোদনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠতে পারে। এসব দিঘি দেখার জন্য জেলার এবং দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে দর্শনার্থীরা প্রতিনিয়ত আসছেন। এখানে বিনোদনকেন্দ্র হলে দিঘির সৌন্দর্য যেমন বৃদ্ধি পাবে; তেমনই সরকারের বিপুল পরিমাণ রাজস্ব আয় হবে।’







