লেবাননে ইসরাইলের সাদা ফসফরাস ব্যবহারের ভিজ্যুয়াল প্রমাণ
ইসরাইলি সেনাবাহিনী লেবাননে হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে লড়াইয়ের অংশ হিসেবে জনবহুল এলাকায় সাদা ফসফরাস ব্যবহার করেছে। এটি একটি অত্যন্ত বিপজ্জনক অগ্নিসংযোগকারী পদার্থ। বাতাসের সংস্পর্শে এলে সাদা ফসফরাস স্বতঃস্ফূর্তভাবে জ্বলে ওঠে এবং এটি নিভানো অত্যন্ত কঠিন। এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞ, সাহায্য সংস্থা এবং নিউ ইয়র্ক টাইমসের সংগৃহীত ভিজ্যুয়াল প্রমাণ থেকে পাওয়া গেছে। এ ধরনের অস্ত্রের বিশেষ ধোঁয়ার রেখা ৩০ মে পর্যন্ত নাবাতিয়েহ শহরে দেখা গেছে। সেখানে প্রায় ৪০,০০০ মানুষ বসবাস করে। নিউ ইয়র্ক টাইমস যাচাই করা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভিডিওতে দেখা যায়, ওই সময়ে ইসরাইলি বাহিনী ওই অঞ্চলের বিউফোর্ট ক্যাসেল দখল করছিল। আরও যাচাই করা ফুটেজে দেখা গেছে, দক্ষিণ উপকূলীয় শহর টায়ার এবং আরও তিনটি ছোট শহর ক্লাইয়া, খিয়াম এবং ইয়োহমোরের আশেপাশেও এই পদার্থ ব্যবহৃত হয়েছে মার্চ থেকে ইসরাইল ও হিজবুল্লাহর মধ্যে পুনরায় সংঘর্ষ শুরু হওয়ার পর। সাম্প্রতিক সংঘর্ষ শুরু হয় যখন হিজবুল্লাহ উত্তর ইসরাইলে রকেট হামলা চালায়, যা পরে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল যৌথ হামলার পর ঘটে।
যুদ্ধক্ষেত্রে ধোঁয়া ও আড়াল তৈরির জন্য এটি প্রায়ই ব্যবহৃত হয় সাদা ফসফরাস। এটি জনবহুল এলাকায় বা বেসামরিক লোকজনের বিরুদ্ধে ইচ্ছাকৃতভাবে ব্যবহার করা হলে আন্তর্জাতিক যুদ্ধ আইনের লঙ্ঘন হয়। মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, এর ব্যবহারে বেসামরিক নাগরিকরা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন। ইসরাইল অবশ্য দাবি করেছে, তারা এটি আইন লঙ্ঘন করে ব্যবহার করছে না। তবে ঘটনাগুলিতে তাদের সামরিক বাহিনী কেন এটি ব্যবহার করেছে তা স্পষ্ট নয়। নিউ ইয়র্ক টাইমস নাবাতিয়েহ, ক্লাইয়া, খিয়াম এবং টায়ার এই চারটি ঘটনার বিষয়ে ইসরাইলি সেনাবাহিনীকে প্রশ্ন করেছিল এবং স্থানাঙ্কও দিয়েছিল। কিন্তু তারা কোনো মন্তব্য করেনি। তারা আরও জিজ্ঞাসা করেছিল সাদা ফসফরাস ব্যবহারের অভ্যন্তরীণ নির্দেশিকা সম্পর্কে।
আইডিএফ বিবৃতিতে বলেছে, আইডিএফের নীতিমালা অনুযায়ী কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া এমন শেল জনবহুল এলাকায় ব্যবহার করা হয় না। ইসরাইল ১৫৫ মিলিমিটার মার্কিন নির্মিত এম৮২৫এ১ আর্টিলারি প্রজেক্টাইল ব্যবহার করে। এর মধ্যে ১১৬টি ফেল্ট ওয়েজ (পিজ্জার স্লাইসের মতো আকৃতির) সাদা ফসফরাসে আবৃত থাকে। এগুলো ৫ থেকে ১০ মিনিট পর্যন্ত ঘন সাদা ধোঁয়া তৈরি করতে ডিজাইন করা, যাতে সেনাদের আড়াল দেয়া যায়। এই শেলগুলো এমনভাবে ফিউজ করা যায় যে, আকাশে বিস্ফোরিত হয়ে এর উপাদান ছড়িয়ে পড়ে এবং বিস্তৃত এলাকায় অগ্নিসংযোগ ঘটাতে পারে। এটি ধোঁয়ার পর্দা তৈরি করলেও যেখানে পড়ে সেখানে আগুন লাগাতে পারে। এগুলো কখনও কখনও আঘাতে ফাটানোর জন্যও সেট করা হয়, যাতে একটি নির্দিষ্ট আগুন তৈরি হয় এবং পরবর্তী হামলার জন্য ভিজ্যুয়াল মার্কার হিসেবে কাজ করে।
অস্ত্র বিশেষজ্ঞরা সম্প্রতি সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভিডিও বিশ্লেষণ করে বলেছেন, এসব দৃশ্যে আকাশে বিস্ফোরিত হয়ে জ্বলন্ত সাদা ফসফরাস নিচে ছড়িয়ে পড়তে দেখা গেছে, যা পূর্বে ব্যবহৃত মার্কিন এম৮২৫এ১ শেলের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। নিউ ইয়র্ক টাইমসের প্রশ্নের উত্তরে ইসরাইলি সেনাবাহিনী বলেছে, আইডিএফ সাধারণত যেসব ধোঁয়া-শেল ব্যবহার করে, সেগুলোতে সাদা ফসফরাস থাকে না। অন্যান্য পশ্চিমা সেনাবাহিনীর মতো, আইডিএফ’রও এমন ধোঁয়া-শেল আছে, যাতে সাদা ফসফরাস থাকে। এগুলো ধোঁয়ার পর্দা তৈরির জন্য ব্যবহার করা হয়, লক্ষ্যবস্তুতে হামলা বা আগুন লাগানোর জন্য নয় এবং আইন অনুযায়ী এগুলোকে অগ্নিসংযোগকারী অস্ত্র হিসেবে গণ্য করা হয় না। বর্তমানে আইডিএফ’র অন্যান্য ধোঁয়া-শেলের ব্যবহার সম্পর্কে কোনো প্রকাশ্য পরিসংখ্যান নেই।
ইসরাইলের সাদা ফসফরাস ব্যবহার
সাদা ফসফরাস ‘সস্তা, সহজলভ্য এবং কাজের জন্য যথেষ্ট কার্যকর’ এমনটা বলেছেন অস্ট্রেলিয়াভিত্তিক অস্ত্র গবেষণা সংস্থা আর্মামেন্ট রিসার্স সার্ভিসেসের পরিচালক এন.আর. জেনজেন-জোন্স। জনবহুল এলাকায় সাদা ফসফরাস ব্যবহারের কারণে ইসরাইল অতীতেও সমালোচনার মুখে পড়েছে।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচের ২০২৪ সালের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, লেবাননে এর ব্যাপক ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে এবং এতে নিরাপদ বিকল্প যেমন এম১৫০ শেল ব্যবহার করা সম্ভব ছিল বলে উল্লেখ করা হয়েছে, যা ইসরাইলি সেনাবাহিনী ২০২৪ সালে ব্যবহার করেছে বলে জানা গেছে। এই শেলের চিহ্নগুলো সাদা ফসফরাসের তুলনায় আলাদা। কারণ সেগুলো বেশি পালকের মতো অনিয়মিত ধোঁয়া তৈরি করে। ইসরাইল ২০০৯ সালে গাজাতেও সাদা ফসফরাস ব্যবহার করেছে এবং ১৯৮২ ও ২০০৬ সালের লেবানন সংঘাতেও এর ব্যবহার হয়েছে। ৭ অক্টোবর ২০২৩ হামাস আক্রমণের পরবর্তী এক বছরে, ইসরাইলি সেনাবাহিনী লেবাননে ২০০ বারের বেশি সাদা ফসফরাস ব্যবহার করেছে বলে স্বাধীন গবেষক আহমাদ বেইদুনের একটি ভিজ্যুয়াল ডাটাবেসে উল্লেখ রয়েছে।
লেবানন সরকার ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে জাতিসংঘ ও নিরাপত্তা পরিষদে চারটি চিঠি পাঠিয়ে ইসরাইলের এই ব্যবহারের বিষয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে। এর একটি চিঠি ৩ জুলাই ২০২৪ তারিখে জানায় যে, দক্ষিণ লেবাননে ৬০০টিরও বেশি অগ্নিকাণ্ড সাদা ফসফরাস ব্যবহারের কারণে ঘটেছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, সাদা ফসফরাস ত্বকের সংস্পর্শে এলে গুরুতর পোড়া ক্ষত সৃষ্টি করে। এটি শ্বাসযন্ত্র ও চোখের মারাত্মক ক্ষতি করতে পারে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের সিনিয়র অস্ত্র উপদেষ্টা বনি ডোহার্টি বলেন, সাদা ফসফরাসের ক্ষতি ভয়াবহ। এটি এমন পোড়া ক্ষত সৃষ্টি করে, যা হাড় পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। তিনি আরও বলেন, এর ধোঁয়া শ্বাসযন্ত্রে মারাত্মক ক্ষতি ও অঙ্গ বিকলতার কারণ হতে পারে। এমনকি ব্যান্ডেজ সরানোর সময়ও যদি অবশিষ্ট কণা অক্সিজেনের সংস্পর্শে আসে তবে ক্ষত আবার জ্বলে উঠতে পারে। এটি বাড়িঘর, গাড়ি, ভবন, ফসল ও অন্যান্য জিনিসেও আগুন ধরাতে পারে।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের ২০২৩ সালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, লেবাননের ধাইরা গ্রামের বাসিন্দারা ১৬ অক্টোবর ২০২৩ তারিখে বারবার সাদা ফসফরাস ব্যবহারের কারণে এলাকা ছেড়ে পালিয়েছিল। পরে ফিরে এসে তারা দেখেছে গাড়ি ও বাড়িঘর তখনও জ্বলছিল। বিশেষজ্ঞদের মতে, সাদা ফসফরাস মাটি ও পানিতে দীর্ঘদিন থেকে যেতে পারে এবং বনাঞ্চল ও কৃষিজমির ব্যাপক ক্ষতি করতে পারে। পিএএক্স নামের একটি ডাচ শান্তি সংস্থার গবেষক উইম জভাইনেনবার্গ বলেন, এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব সম্পর্কে এখনো অনেক অজানা ঝুঁকি আছে। কৃষক ও স্থানীয় মানুষরা জমি ব্যবহার করতে না পারার সমস্যায় পড়েন এবং প্রায়ই বিশেষ পরিষ্কার অভিযানের প্রয়োজন হয়।
সাদা ফসফরাস মূলত ধোঁয়া তৈরি ও আলোর জন্য ব্যবহৃত হয় বলে এটি আন্তর্জাতিক আইনের কিছু ফাঁকফোকরের মধ্যে পড়ে বলে জানিয়েছেন বনি ডোহার্টি। তিনি বলেন, এর ধ্বংসাত্মক প্রভাব, যেমন আগুন লাগা বা গুরুতর পোড়াকে সাধারণত পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবে দেখা হয়, মূল উদ্দেশ্য হিসেবে নয়। যদিও আইন অনুযায়ী জনবহুল এলাকায় ইচ্ছাকৃতভাবে ব্যবহার করা নিষিদ্ধ, তবে এটি বোঝা কঠিন যে এটি ইচ্ছাকৃতভাবে ব্যবহৃত হয়েছে কি না।
উইম জিজনেনবার্গ বলেন, এই অস্ত্রগুলো নির্ভুল নয় এবং বেসামরিক ও সামরিক লক্ষ্য আলাদা করতে পারে না। তিনি আরও বলেন, এটি হয়তো নিষিদ্ধ অস্ত্র নয়। কিন্তু সেনাবাহিনী সবসময় এটি উদ্দেশ্য অনুযায়ী ব্যবহার করে না।
যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও ইউক্রেনসহ অন্যান্য দেশও বিভিন্ন যুদ্ধে সাদা ফসফরাস ব্যবহার করেছে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের ২০০৯ সালের প্রতিবেদনে বলা হয়, ইসরাইল গাজার ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় বারবার এই অস্ত্র ব্যবহার করেছে। চার বছর পর আন্তর্জাতিক চাপের মুখে ইসরাইল ঘোষণা দেয় যে তারা এর ব্যবহার উল্লেখযোগ্যভাবে কমাবে।







