হৃদরোগের ঝুঁকি কমাতে সঠিক খাদ্যাভ্যাস ও শারীরিক সক্রিয়তা
বর্তমানে বিশ্বজুড়ে অকালমৃত্যু ও দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থতার অন্যতম প্রধান কারণ হৃদরোগ। অনিয়ন্ত্রিত উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, অতিরিক্ত ওজন, ধূমপান, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, মানসিক চাপ এবং শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ায়। এ রোগ প্রতিরোধে খাদ্যাভ্যাস ও ওষুধের পাশাপাশি নিয়মিত শারীরিক সক্রিয়তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
হার্ট অ্যাটাক বা হৃদরোগ হঠাৎ করেই হয় না। ধূমপান, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা ও অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস ধীরে ধীরে রক্তনালির ক্ষতি করে। তাই খাবার প্লেটে শাকসবজির পরিমাণ বাড়াতে হবে; কারণ শাকসবজির আঁশ, পটাশিয়াম, ম্যাগনেশিয়াম, ভিটামিন ও বিভিন্ন উদ্ভিজ্জ উপাদান রক্তচাপ, ওজন ও সামগ্রিক হৃৎস্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত উপকারী। এক্ষেত্রে পালংশাক, লালশাক, পুঁইশাক, লাউ, ঝিঙে, করলা, ঢ্যাঁড়স, ফুলকপি, বাঁধাকপি, গাজর ও টমেটোর মতো দেশীয় সবজিই যথেষ্ট। ফলের ক্ষেত্রে জুসের চেয়ে আস্ত ফল খাওয়া উচিত। পেয়ারা, কমলা, আপেল, নাশপাতি, পেঁপে, ডালিমসহ বিভিন্ন মৌসুমি ফল খেতে পারেন; কারণ গোটা ফলে আঁশ থাকে এবং জুসের তুলনায় দ্রুত চিনি শোষণের ঝুঁকি থাকে না। চিনিযুক্ত বা বোতলজাত ফলের জুস কখনও তাজা ফলের বিকল্প হতে পারে না।
পাশাপাশি, মসুর ডাল, মুগ ডাল, ছোলা, রাজমা, ওটস, বার্লি ও অন্যান্য পূর্ণ শস্য নিয়মিত খাওয়া উচিত। এসব খাবারে থাকা আঁশ ক্ষতিকর এলডিএল কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। বিশেষ করে সলিউবল ফাইবার অন্ত্রে কোলেস্টেরল শোষণ কমাতে সহায়ক। মাছ খেলেই হবে না, রান্নার ধরনও গুরুত্বপূর্ণ। মাছে থাকা ওমেগা থ্রি ফ্যাটি অ্যাসিড হৃৎস্বাস্থ্যের জন্য ভালো, কিন্তু মাছ অতিরিক্ত তেলে ডিপ ফ্রাই বা ভেজে খেলে বাড়তি ক্যালরি ও চর্বি গ্রহণ হয়। তাই ঝোল, সিদ্ধ, গ্রিল বা কম তেলে রান্না করা মাছ খাওয়া উচিত। বাদাম ও বিভিন্ন বীজে অসম্পৃক্ত চর্বি, আঁশ ও অন্যান্য পুষ্টি উপাদান রয়েছে। মনে রাখতে হবে, বাদামে ক্যালরি বেশি থাকায় অতিরিক্ত খাওয়া যাবে না। সম্ভব হলে লবণবিহীন বাদাম বেছে নিতে হবে।
রক্তচাপ স্বাভাবিক রাখতে লবণ কমাতে হবে, কারণ অতিরিক্ত লবণ রক্তচাপ বাড়ায় এবং দীর্ঘদিন উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে না থাকলে হৃৎপিণ্ড ও রক্তনালির ক্ষতি হয়। তাই খাবারে বাড়তি লবণ কমানোর পাশাপাশি চিপস, নোনতা স্ন্যাকস, অতিরিক্ত নোনতা আচার, প্যাকেটজাত খাবার ও প্রক্রিয়াজাত খাবার সীমিত করতে হবে। পাশাপাশি শাকসবজি, ডাল, টমেটো, কমলা ও কলার মতো খাবারে থাকা পটাশিয়াম রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। কিডনির রোগ থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অতিরিক্ত পটাশিয়াম গ্রহণ করা যাবে না। অন্যদিকে, অতিরিক্ত লবণ, চর্বিযুক্ত লাল মাংস, প্রক্রিয়াজাত মাংস, অতিরিক্ত ঘি ও মাখন, বেশি তেলে ভাজা খাবার, ট্রান্স ফ্যাট, অতিরিক্ত চিনি ও মিষ্টি পানীয়, এবং প্যাকেটজাত ও আলট্রাপ্রসেসড খাবার অবশ্যই এড়িয়ে চলতে হবে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায়ই বিভিন্ন খাবারকে কোলেস্টেরল কমানোর, রক্তনালির ব্লক পরিষ্কার করার বা হার্ট অ্যাটাক প্রতিরোধের বিশেষ খাবার হিসেবে প্রচার করা হয়। মূলত কোনো একটি খাবার একা রক্তনালির ব্লক খুলতে পারে না। হৃদরোগের ঝুঁকি কমাতে প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক সক্রিয়তা, ওজন নিয়ন্ত্রণ এবং রক্তচাপ, কোলেস্টেরল ও ডায়াবেটিসের যথাযথ ব্যবস্থাপনা। তাই সময় থাকতে সচেতন হওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।
লেখক : ক্লিনিক্যাল ও ইন্টারভেনশনাল কার্ডিওলজিস্ট এবং সাবেক পরিচালক, জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল






