বরেন্দ্রর কোলে মাহাতোদের জীবনকথা
শীতটা তখনও জাঁকিয়ে বসেনি। সূর্য ডুবেছে মাত্র। শীতল হাওয়ার ঝাপটা এসে লাগছে শরীরে। সে হাওয়াতেই কাঁপুনি দেয় শরীরটা। হেডলাইটের আলো পড়তেই দৃশ্যমান হয় সামনের পথটা। আঁকাবাঁকা ও উঁচু-নিচু সে পথ, সামনে গিয়েই যেন হারিয়ে যায় অন্য কোনোখানে। বরেন্দ্র অঞ্চল। চারপাশে তাই সুনসান নীরবতা। নিস্তব্ধতা ভেঙে সে পথেই ছুটে চলে আমাদের মোটরসাইকেলটি।
গত শীতের কথা। রাজশাহী শহর থেকে বের হয়েছি বন্ধু কাজিমের সঙ্গে। গোদাগাড়ির বিস্তীর্ণ বরেন্দ্র অঞ্চল ঘুরে দেখব, তেমনটাই পরিকল্পনা। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামে। তবুও শেষ হয় না আমাদের পথচলা। রাস্তার পাশেই ছোট্ট একটি টং দোকান। সামনে বাঁশের তৈরি বেঞ্চিতে বসে গল্প জমিয়েছে কয়েকটি আদিবাসী মুখ। দোকানের সামনে মাটির চুলা। তাতে বসানো আছে একটি কেতলি। গলগলিয়ে পানি বেরোচ্ছে কেতলির নল দিয়ে। এমন দৃশ্য দেখতেই চায়ে তেষ্টা পায়। বন্ধু কাজিমও থামিয়ে দেয় মোটরসাইকেলটি।
গ্রামের নামটি ‘জাওই পাড়া’। নামের শেষে পাড়া থাকলেও এটি মূলত গ্রাম। পাকড়ী ইউনিয়নের এই গ্রামটিতে বাস করে নানা সম্প্রদায়ের আদিবাসী। চায়ে চুমুক দেব, এমন সময় কানে আসে আদিবাসী গানের সুর। পাশের একটি বাড়ি থেকে ভেসে আসছিল সমবেত কণ্ঠগুলো: ‘জগমকার উঠি হ, উপরি চাটনি, কলিকাতা সে আওই, বহুত নাচনি।’ গানের সঙ্গে ঢোল-মাদলের তাল চলে। একটি শেষে শুরু হয় আরেকটি গান: ‘ইন্দিরা গান্ধীর বুদ্ধি ভারী, ফারাক্কায় ছাড়িল গাড়ি, লোহার রেস্তাতে কোম্পানির গাড়ি চলিছে।’
দোকানি জানালেন, এই গ্রামটিতে বাস করে মাহাতো আদিবাসীরা। এছাড়া গোদাগাড়ির ঝালপুকুর, একান্নপুর, শ্রীগ্রামপুর, সাতপুকুরা ও হাপানা গ্রামেও রয়েছে আরও মাহাতো। সন্ধ্যা নামতেই এসব গ্রামে ঢোল-মাদল আর উলুধ্বনির শব্দে বিভোর হয় গ্রামবাসী। মাহাতোদের আগে ‘কুর্মি’ বলে ডাকা হতো। একসময় তারা বন-জঙ্গল, গাছ, উঁচু-নিচু জমি কেটে চাষের উপযোগী করে তুলেছিল। আর এ কারণেই হয়তো এদের নাম হয় ‘কুর্মি’। ভারতের মাহাতোদের এখনও এ নামেই ডাকা হয়। কিন্তু কুর্মি থেকে এ আদিবাসীরা কীভাবে মাহাতো হলো, তা এখনও অজানা। তবে অনেক গবেষক মনে করেন, পূর্বে মাহাতোদের ‘বোদ্ধা’ নামে ডাকা হতো। কালক্রমে বোদ্ধা নাম থেকেই মাহাতো নামকরণ করা হয়েছে।
আদিবাসী গানের কণ্ঠ ধরে আমরা জাওই পাড়া গ্রামের ওই বাড়িটিতে ঢুকি। মাটির আর ছনে ছাওয়া বাড়ির ঘরগুলো। ভেতরে ঢুকতেই সবার দৃষ্টি পড়ে আমাদের দিকে। অপরিচিত মুখ, তাই থেমে যায় আদিবাসী কণ্ঠগুলো। পরিচয় হতেই চলে ভাববিনিময়। আমাদের বসার জায়গা হয় একটি ঘরের বারান্দায়। খানিক বিরতিতে বাড়ির উঠানে আবারও শুরু হয় নাচ-গানের আসর। আসরে পরিচয় হয় নরেন মাহাতোর সঙ্গে। মধ্যবয়সি এই যুবক জানাল, কয়েক দিন পরেই এ বাড়ির এক মেয়ের বিয়ে। বিয়ের পাকা কথা হওয়ার আনন্দেই গ্রামের সবাই জড়ো হয়েছে এখানে।
মাহাতো আদিবাসীরা কথা বলে ‘খট্টা’ ভাষায়। কিন্তু পূর্বপুরুষদের সে ভাষাও আজ হারিয়ে যেতে বসেছে। তাদের ভাষার লিখিত কোনো বর্ণ না থাকাই এর মূল কারণ। পাশাপাশি বাংলা ভাষার আধিক্যের মাঝে এ ভাষাটিকে টিকিয়ে রাখার ক্ষেত্রেও নেই কোনো উদ্যোগ। ফলে এ যুগের মাহাতোরা শুধু বাড়িতেই কথা বলে ‘খট্টা’ ভাষায়। এ নিয়ে নরেন মাহাতো বলেন, ‘বাপ-দাদারা খট্টা ভাষা বলে অনর্গল। আমরা কিছু পারি। নতুনদের অবস্থা আরও খারাপ। বয়স্ক মাহাতোরা যতদিন আছে, ততদিন মাহাতো ভাষা থাকবে।’ খট্টা ভাষা বোঝাতে নরেন এক নিঃশ্বাসে বলে যায় সপ্তাহের সাতটি দিনের নাম- শনিচার (শনিবার), আতোয়ারা (রবিবার), সোমাচার (সোমবার), মাংগারা (মঙ্গলবার), বুধ, বিষ্টিবার (বৃহস্পতিবার) ও শুক্রবার।
এ আদিবাসী সমাজে গ্রামপ্রধানকে বলে মণ্ডল, মোড়ল, মাতব্বর, প্রামাণিক, মাহাতোয়া প্রভৃতি। গ্রামপ্রধানের অনুমতি ছাড়া এদের কোনো অনুষ্ঠান বা উৎসব শুরু হয় না। এদের সমাজে জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত নানা আচার পালনে বিশেষ ভূমিকা রাখতে হয় গ্রামপ্রধানকে। এরা গ্রামপ্রধান নির্বাচন করে যোগ্যতার ভিত্তিতে, গণতান্ত্রিক রীতিতে। জাওই পাড়া গ্রামের গ্রামপ্রধান বা মোড়ল ভুদেব মাহাতো। বয়স ষাটের মতো। আলাপ হয় তার সঙ্গে। তার কাছ থেকে শুনি মাহাতো আদিবাসীদের গোত্রভাগের কথা।
মাহাতো আদিবাসীদের দশটি গোত্র বা টোটেম রয়েছে। যেমন: পেঁচা, সুইয়া, রুখি, আলমন, ময়না, কচ্ছপ, সুরি, মহুকাল, বিহা এবং কুচা। তাদের বিশ্বাস, এই গোত্রগুলো গাছগাছড়া, জীবজন্তু, পশুপাখি প্রভৃতি থেকে উৎপত্তি হয়েছে। যেমন- ‘পেঁচা’ গোত্রের উদ্ভব হয়েছে পেঁচা থেকে। এ কারণেই এ গোত্রের লোকেদের পেঁচা খাওয়া নিষেধ। এভাবেই ‘কচ্ছপ’ গোত্রের উদ্ভব হয়েছে কচ্ছপ থেকে। তাই এ গোত্রের মাহাতোরা কচ্ছপের মাংস ও ডিম খায় না। ‘কুচা’ গোত্রের উদ্ভব কুইচ্যা মাছ থেকে। তাই কুইচ্যা খাওয়া ওই গোত্রের মাহাতোদের জন্য নিষিদ্ধ। ‘রুখি’ মানে কাঠবিড়ালি। তাই রুখি গোত্রের মাহাতোরা কাঠবিড়ালি খায় না। একই কারণে ‘ময়না’ গোত্রের লোক ময়না পাখি, ‘বিহা’ গোত্রের লোক বিহা মাছ, ‘মহুকাল’ গোত্রের লোক মহুকাল (কমলার মতো ফলবিশেষ), ‘সুইয়া’ গোত্রের লোকদের সুইয়ার (একপ্রকার পাখি) মাংস খাওয়া একেবারেই নিষিদ্ধ।
ভুদেব জানালেন, এ গ্রামের মাহাতো আদিবাসীরা বেশির ভাগই কৃষিজীবী। নারী-পুরুষ উভয়েই মাঠে কাজ করে। পুরুষরা হালচাষ ও নারীরা ফসল বোনা, নিড়ানো ও ধান কাটার কাজে পারদর্শী। একসময় তাদের অনেক জমিজমা ছিল। কিন্তু কালপ্রবাহে নানা ছলচাতুরীর মাধ্যমে স্থানীয় জোতদাররা দখল করে নেয় আদিবাসীদের ফসলি জমি। ফলে আদিবাসীরা হয় ভূমিহীন। এখন অধিকাংশ মাহাতোর শুধুই ভিটেমাটি টিকে আছে কোনোরকমে।
ভুদেব মাহাতোর ভাষায়, “এ গ্রামে দুই পাড়ার ভেতর একটা মুসলমানের বাড়িও ছিল না। এখন মুসলমানরাই অর্ধেক। মাহাতো আদিবাসী কম। অনেকেই চলে গেছে ভারতে। কেউ গেছে দৌলতপুরে, কেউ মালদহে।” তিনি জানালেন, যারা ভারতে চলে গেছে তারাও সেখানে ভালো নেই। কেন? প্রশ্ন করতেই উত্তর, “বাবু, নিজের দেশ ছাড়া কি ভালো থাকা যায়!”
পাশের বাড়ি থেকে দরজা ঠেলে ঢোকেন এক বৃদ্ধ। আমাদের আসরে তাকে বসানো হয়। হারিকেনের হালকা আলো এসে পড়ে তার মুখে। ভাঁজ পড়া চামড়া বয়সের কথা বলে। বয়স ষাটোর্ধ্ব কিংবা তারও বেশি। কিন্তু এখনো বেশ সুঠামদেহী। ভুদেব আমাদের পরিচয় করিয়ে দেন তার সঙ্গে। আদিবাসী এই বৃদ্ধের নাম সতীশ মাহাতো। তার সঙ্গে আলাপ হয় মাহাতোদের প্রিয় পানীয় নিয়ে। অন্য আদিবাসীদের মতো মাহাতোরাও মদ পান করে। তাদের ভাষায় এটি ‘হাঁড়িয়া’।
এই হাঁড়িয়া তাদের সংস্কৃতিরই একটি অংশ। বিয়ে, অতিথি আপ্যায়ন ও সামাজিক যেকোনো অনুষ্ঠানেই তাদের হাঁড়িয়া পানের প্রচলন আছে। এটি তাদের পূর্বপুরুষদের আদি রেওয়াজ। সতীশ জানান, হাল আমলের মাহাতোরা লেখাপড়া শিখে সচেতন হয়েছে। ফলে পূর্বপুরুষদের হাঁড়িয়া পানের রীতিটি তারা তেমন একটা পছন্দ করছে না। কিন্তু এ নিয়ে কোনো আক্ষেপও নেই তাদের। সতীশের ভাষায়, “ভাষা ও সংস্কৃতি কালের প্রবাহে পরিবর্তন হবেই।”
ঢোল-মাদলের ছন্দে আদিবাসী গান আর নৃত্যে সবাই তখনও মগ্ন। খানিক জিরিয়ে নিচ্ছেন কেউ কেউ। হারিকেনে তেল ভরতে আসরে আসেন সতীশ মাহাতোর ছেলের বউ গেন্ধা ফুলি। ছিপছিপে গড়নের শরীর। কপালে তার ভরাট সিঁদুর। আলাপ হয় তার সঙ্গে। মাহাতো নারীরা সকাল-সন্ধ্যা সৃষ্টিকর্তাকে স্মরণ করে ভক্তি দেন। গেন্ধা ফুলির ভাষায়, “আমরা সকালে ‘মোড়লি’ দিই আর সন্ধ্যায় দিই ‘সন্ধ্যাবাতি’। সকালবেলা আমরা বালতি নিয়ে যাই পুকুরে। নিজে পরিষ্কার হয়ে এক বালতি জল এনে খানিকটা গোবর দিয়ে তুলসীতলাসহ ঘরদোর লেপে দিই। অতঃপর কিছু পানি ও গোবর ছিটিয়ে দিই তুলসীতলায়।”
সন্ধ্যার কথা উঠতেই তিনি বলেন, “সন্ধ্যাবেলায় ঘটিতে পানি নিয়ে প্রতি ঘরে ছিটিয়ে দিই। অতঃপর ধূপ জ্বালিয়ে, প্রদীপ নিয়ে তুলসীতলায় ভগবানের উদ্দেশে প্রথম ভক্তি দিই। একে একে বাড়ির গোয়ালঘরসহ প্রতিটি ঘরের দুয়ারেই ভক্তি দিতে হয়।” কেন এই আচার? গেন্ধা ফুলির উত্তর, “বাবু, মনসার জন্য করি। তাকে বলি, ভগবান আমি তো তোকে পূজা দিচ্ছি, তুই আমার সহায় হ।”
পূজার সময়টাতেই মাহাতো আদিবাসীরা আনন্দ-ফুর্তিতে মেতে ওঠে। মনোবাসনা পূরণের আশা নিয়ে বুক বাঁধে তারা। ফলে আদিবাসীরা ভুলে যায় অতীতে তাদের না-পাওয়ার কষ্টগুলোকে। মাহাতোরা কী কী পূজা করে? এমন প্রশ্নের উত্তর মেলে গ্রামের মোড়ল ভুদেব মাহাতোর কাছে। তিনি জানালেন, সহরায়ই তাদের প্রধান উৎসব। কার্তিক মাসের অমাবস্যা তিথিতে এই পূজা করে মাহাতো আদিবাসীরা। অশুভ শক্তি নাশ ও গরু-ছাগলের মঙ্গল কামনাই এ পূজার উদ্দেশ্য। মাহাতোরা একে গোয়াল পূজাও বলে থাকে। তবে কারাম পূজা মাহাতো আদিবাসীদের কাছে ডাল উৎসব। এ ছাড়া মাহাতো আদিবাসীরা পুত্রসন্তান কামনায় মাঘ মাসে সূর্যাহী পূজা, ফাল্গুন মাসে ফাগুয়া এবং পৌষ মাসে পুষনা উৎসব পালন করে। আর কোনো পুজো হয় কি না জানতে চাইলে সবার না-সূচক জবাব। কিন্তু বৃদ্ধ সতীশ চুপ। হঠাৎ বললেন, “আছে। ভূতপূজা।”
এ পূজার কথা শুনি সতীশের জবানিতে। একসময় মাহাতোরা মনেপ্রাণে বিশ্বাস করত, পৃথিবীতে আছে অসংখ্য ‘ভূত’। সতীশের ভাষায়, “রাঙাহরি, বিশাচণ্ডী, চিনার, কুদ্রাকুদ্রি প্রভৃতি। চোর-ডাকাত থেকে রক্ষা করে রাঙাহরি ভূত। গরু-ছাগলের বৃদ্ধি ঘটায় চিনারা ভূত। বিশাচণ্ডী ভূত অশুভ শক্তিকে দূর করে। আর কুদ্রাকুদ্রি ভূত দূর করে সব রোগব্যাধিকে।” তাই মাহাতো আদিবাসীরা এসব ভূতের সন্তুষ্টি লাভের আশায় মাটির উঁচু ঢিবি বানিয়ে পূজার আয়োজন করে। এ পূজার জন্য কোনো তিথির প্রয়োজন হয় না। পূজার জন্য শুধু আলাদা ঘর বানাতে হয় এবং পূজার সময় সাত রঙের সাতটি মোরগ বলি দেওয়া হয়।
রাত বাড়তে থাকে। কথার পিঠেও চলে কথা। ফলে আসরটাও জমে ওঠে। কালপ্রবাহে মাহাতোদের হারিয়ে যাওয়া কাহিনি ও বিশ্বাসের গল্পে আমরাও হারিয়ে ফেলি নিজেদের।







