মাধবপুরে মৌসুমি ফল বিক্রি করে স্বাবলম্বী তোফায়েল
মাত্র ১৮ বছর বয়সেই কাঁধে ওঠে পরিবারের দায়িত্ব। চাকরির পেছনে না ছুটে ধার করা ৫০ হাজার টাকা দিয়ে শুরু করেন মৌসুমি ফলের ব্যবসা। সেই ছোট উদ্যোগই আজ তার পরিবারের স্বচ্ছলতার প্রধান অবলম্বন। তিনি হলেন হবিগঞ্জের মাধবপুর পৌরসভার পূর্ব মাধবপুর গ্রামের মো. তোফায়েল আহমেদ পাঠান (২৬)। মাধবপুর বাজারের ধান বাজার এলাকায় ভ্রাম্যমাণ মৌসুমি ফলের দোকান চালিয়ে বর্তমানে ব্যবসার খরচ বাদ দিয়ে মাসে ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকার বেশি আয় করছেন তিনি।
তোফায়েল ছয় ভাই ও তিন বোনের মধ্যে ছোটদের একজন। তার বাবা মৃত রফু মিয়া মাধবপুর পৌরসভার সাবেক দুইবারের কাউন্সিলর ও কৃষক ছিলেন। মা গৃহিণী। সংসারে আর্থিক সংকটের কারণে পঞ্চম শ্রেণির পর পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যায় তার। অল্প বয়সেই পরিবারের দায়িত্ব নিতে হয়।
ব্যবসার শুরুটাও সহজ ছিল না। পূর্ব মাধবপুর গ্রামের কোনা এলাকায় ছোট একটি টক দোকান দিয়ে ব্যবসায় নামেন তোফায়েল। সেখানে প্রত্যাশিত সাফল্য না পাওয়ায় নতুন করে পথ খুঁজতে থাকেন। পরে প্রতিবেশী এক বড় ভাইয়ের কাছ থেকে ৫০ হাজার টাকা ধার নিয়ে শুরু করেন মৌসুমি ফলের ব্যবসা।
তোফায়েল বলেন, ‘শুরুতে অনেক কষ্ট হয়েছে। সংসার চালানোই কঠিন ছিল। পরিবারের কাউকে ভালোভাবে সহযোগিতা করতে পারতাম না। তবে হাল ছাড়িনি। সততা ও পরিশ্রমের ওপর ভরসা রেখেই ব্যবসা চালিয়ে গেছি।’
কয়েক মাসের মধ্যেই ব্যবসায় পরিবর্তন আসতে শুরু করে। ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে আয়, ফিরতে থাকে সংসারের স্বচ্ছলতা। একসময় ধার করা সেই টাকা পরিশোধও করে দেন তিনি।
তোফায়েল বলেন, ‘পরিশ্রম, ধৈর্য আর একাগ্রতার ফলেই আজ এই অবস্থানে এসেছি। একসময় যে টাকা ধার করে ব্যবসা শুরু করেছিলাম, সেই ব্যবসার আয় দিয়েই ঋণ পরিশোধ করেছি।’
তার দোকানে আখঁ, কাঁঠাল, কলা, ব্রীজ আলো, বেল ও তরমুজসহ দেশি-বিদেশি বিভিন্ন মৌসুমি ফল পাওয়া যায়। স্থানীয় ক্রেতাদের কাছে তার দোকানের ফলের বেশ ভালো চাহিদা রয়েছে।
নিয়মিত ফল কিনতে আসা সামসু মিয়া (৩২) ও নজরুল ইসলাম (৩৬) বলেন, ‘দোকানটি ছোট হলেও এখানে বিভিন্ন ধরনের টাটকা ফল পাওয়া যায়। দামও মোটামুটি সহনীয়। তাই নিয়মিত এখান থেকেই ফল কিনি।’
মাধবপুর বাজার ফল ব্যবসায়ী সমিতির সেক্রেটারি মো. রাসেল মিয়া বলেন, ‘তোফায়েল খুব পরিশ্রমী ছেলে। সততার সঙ্গে ব্যবসা করে। তার দোকানে সাধারণত টাটকা ফল পাওয়া যায়। ক্রেতাদের কাছেও তার ভালো গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে।’
নিজে স্বাবলম্বী হওয়ার পর এখন ব্যবসাকে আরও বড় করার স্বপ্ন দেখছেন তোফায়েল। খুচরা বিক্রির পাশাপাশি ভবিষ্যতে পাইকারি ফলের ব্যবসা শুরু করতে চান। এতে স্থানীয় কয়েকজন বেকার যুবকের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে বলে আশা তার।
তোফায়েল বলেন, ‘দোকানের পাশে কিছু অব্যবহৃত জায়গা আছে। সুযোগ পেলে সেখানে পাইকারি ফলের ব্যবসা শুরু করতে চাই। সরকার সহযোগিতা করলে ব্যবসাটা আরও বড় করা সম্ভব। তখন অন্যদেরও কাজের সুযোগ দিতে পারব।’ তবে তার সবচেয়ে বড় স্বপ্ন ছেলেকে ঘিরে। নিজের অপূর্ণ শিক্ষাজীবনের আক্ষেপ থেকে ছেলেকে উচ্চশিক্ষিত করার সংকল্প নিয়েছেন তিনি।
তোফায়েল বলেন, ‘আমার ছেলে পড়ালেখা করতে যত কষ্টই হোক, তাকে উচ্চশিক্ষিত বানাতে চাই। ছোটবেলা থেকেই আমার এই স্বপ্ন। আমি নিজে পড়তে পারিনি, কিন্তু ছেলেকে সেই সুযোগ দিতে চাই।’তরুণদের জন্যও রয়েছে তার পরামর্শ। তার মতে, চাকরির পেছনে ছুটে বেকার থাকার চেয়ে সামর্থ্য অনুযায়ী ছোট ব্যবসা শুরু করা যেতে পারে। ফলের ব্যবসায় সারা বছরই কমবেশি চাহিদা থাকে।
তোফায়েল বলেন, ‘৪০-৫০ হাজার টাকা পুঁজি নিয়ে শুরু করেও ধীরে ধীরে ভালো আয় করা সম্ভব। অভিজ্ঞ কারও সঙ্গে থেকে কাজ শিখলে ব্যবসা করা অনেক সহজ হয়ে যায়।’ অভাব তাকে থামাতে পারেনি। বরং ধার করা ৫০ হাজার টাকার ছোট উদ্যোগই হয়ে উঠেছে তার ঘুরে দাঁড়ানোর সিঁড়ি। পরিশ্রম, সততা ও ধৈর্য ধরে এগিয়ে গেলে ছোট পুঁজির ব্যবসাও যে স্বাবলম্বী হওয়ার পথ দেখাতে পারে—তোফায়েলের গল্প তারই উদাহরণ।







