ইসলাম যে সমৃদ্ধি নিয়ে এসেছিল বাংলায়
বাংলায় ইসলামের আগমনের ফলে বাংলার মানুষের বিশ্বাস, সামাজিক জীবন ও সংস্কৃতিতে ব্যাপক পরিবর্তন আসে। ইসলাম আসার আগে বাংলার সমাজটা ঠিক কেমন ছিল সেটা না বুঝলে পরিবর্তনটা ধরা যাবে না। তাই প্রথমেই একটু ইসলামপূর্ব অবস্থা সম্পর্কে জেনে নেওয়া যাক।
ডক্টর এম. এ. রহিম বলেন, ইসলাম-পূর্ব যুগে বাংলার হিন্দু সমাজ ব্রাহ্মণ, কায়স্থ, বৈশ্য ও শূদ্র—এই চার বর্ণে কঠোরভাবে বিভক্ত ছিল। এবং বিভিন্ন বর্ণ ও উপবর্ণের মধ্যে পারস্পরিক সামাজিকতাই নিষিদ্ধ ছিল। ব্রাহ্মণদের মধ্যেও স্তরে স্তরে ছিল বিভাজন। কুলীন ব্রাহ্মণরা চাটুয্যে, মুখুটি, বন্দ্য, গাঙ্গুলি পদবি ধারণ করতেন। নিম্নশ্রেণির ব্রাহ্মণ তাঁদের ধারেকাছেও যেতে পারতেন না। সমাজের উঁচুতলায়ও ছিল এমন শ্রেণিবিন্যাস। একই করুণ অবস্থা ছিল নারী সমাজেও। হিন্দু নারীদের সম্পত্তিতে কোনো অধিকার ছিল না। বাল্যবিবাহ ও কৌলিন্য প্রথার কারণে দশ-এগারো বছর বয়সেই বিয়ে হয়ে যেত। আর স্বামীর আশ্রয় থেকে বঞ্চিত হলে দাঁড়ানোর কোনো জায়গা ছিল না। হিন্দু কবি ভারতচন্দ্র নিজেই লিখেছেন, ‘একটা মেয়ের জীবন খুব সুখের নয়; সে সর্বদা পরনির্ভরশীলা এবং তাকে অন্যান্যদের বোঝা বহন করতে হয়’। (এম. এ. রহিম, বাংলার সামাজিক ও রাজনৈতিক ইতিহাস)
শিক্ষার দরজাও সবার জন্য উন্মুক্ত ছিল না। জ্ঞানচর্চার অধিকার ছিল মূলত ব্রাহ্মণদের, আর সংস্কৃত ছিল সেই জ্ঞানের ভাষা, যা ছিল সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে।
এই সামাজিক বাস্তবতার মধ্যেই ১২০৪ সালে বাংলায় আবির্ভূত হলেন বখতিয়ার খলজি। সুভাষ মুখোপাধ্যায় তাঁর ‘বাঙালীর ইতিহাস’ গ্রন্থে বলেন, বখতিয়ারের এই সহজ বিজয়ের পেছনে মূল কারণ ছিল উত্তর ভারতের হিন্দু রাজশক্তির প্রতিরোধ আগেই ভেঙে পড়েছিল এবং সেন রাষ্ট্রের পক্ষে মুসলমানদের ঠেকানোর মতো মনোবল ছিল না।
বখতিয়ার খলজির আগমনের পর বাংলায় ইসলাম ছড়াল কীভাবে? মানুষ মুসলিম হলো কেন? ইতিহাসবিদ Richard Eaton-এর মতে, এর উত্তর শুধু রাজনৈতিক বিজয় বা তরবারির মধ্যে খুঁজলে পুরো চিত্রটি ধরা যায় না। কারণ পূর্ববঙ্গে নতুন কৃষিজমি সৃষ্টি, বনভূমি পরিষ্কার করে বসতি স্থাপন এবং সেই প্রক্রিয়ায় সুফি-দরবেশদের ভূমিকা ছিল এর জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে হিন্দু সমাজের কঠোর বর্ণব্যবস্থার নিচে থাকা বহু মানুষের কাছে ইসলামের সাম্য ও ভ্রাতৃত্বের বাণী আকর্ষণ সৃষ্টি করে। তবে সবাই একই কারণে ইসলাম গ্রহণ করেনি; সামাজিক মর্যাদা, আধ্যাত্মিক আকর্ষণ, অর্থনৈতিক সুযোগ ও নতুন সমাজব্যবস্থায় যুক্ত হওয়ার মতো নানা কারণ একসঙ্গে কাজ করেছিল। এভাবেই ধীরে ধীরে বাংলায় একটি বৃহৎ বাঙালি মুসলিম সমাজ গড়ে ওঠে।
ক্রমান্বয়ে ইসলামের প্রভাব ছড়িয়ে যায় বিভিন্ন শ্রেণিতে, নারীর জীবনে, শিক্ষায়, ভাষায়, স্থাপত্যে, অর্থনীতিতে, এমনকি প্রতিদিনের রান্নাঘর পর্যন্ত। শ্রেণির পরিবর্তনটা সবচেয়ে তীক্ষ্ণ। মুসলিম শাসনে রাজকার্যে নিয়োগের ভিত্তি হলো মেধা ও যোগ্যতা, জন্মসূত্রের বর্ণ নয়। (বাংলার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাস)
এই পরিবর্তন কায়স্থ শ্রেণির জন্য দরজা খুলে দেয়। বাংলায় মুসলিম শাসনামলে বিদ্যাবুদ্ধির ফলে কায়স্থগণ সমৃদ্ধ জীবনযাপন করতেন। সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনে মুসলিম যুগ ছিল কায়স্থ শ্রেণির উত্থানের যুগ। তারা মুখ্যমন্ত্রী, দেওয়ান, শাসনকর্তা পর্যন্ত হন। যে কায়স্থরা আগে ব্রাহ্মণের ছায়াতলে ছিল, তারা মুঘল দরবার পর্যন্ত পৌঁছে যায়। দেওয়ান, বখশি, ফৌজদার, কানুনগো, মজুমদার, নকিব—এইসব পদে কাজ করার সুযোগ পেল এমন মানুষরা, যাদের পূর্বপুরুষের বর্ণ দিয়ে এটা কখনো সম্ভব হতো না।
নারীর জীবনেও পরিবর্তনের হাওয়া লাগে। হিন্দু সমাজে নারী ছিল মূলত পুরুষের অধীন। সম্পত্তিতে তার অধিকার ছিল না। অল্প বয়সেই বিয়ের বন্ধনে আবদ্ধ হতে হতো এবং স্বামী বা পরিবারের আশ্রয় হারালে তার পথ সংকীর্ণ হয়ে যেত। মুসলিম সমাজে নারী উত্তরাধিকারসূত্রে সম্পত্তির অধিকার লাভ করে, মোহরানার অধিকার পায় এবং পরিবারে তার আইনি অবস্থান আগের তুলনায় সুস্পষ্ট হয়। ফলে সে কেবল পরিবারের বোঝা বা আশ্রিত সদস্য হিসেবে নয়, অধিকারসম্পন্ন ব্যক্তি হিসেবেও স্বীকৃতি পেতে শুরু করে।
শিক্ষার ক্ষেত্রে পরিবর্তন ছিল ব্যাপক। আগে সংস্কৃত শিক্ষা ছিল মূলত উচ্চবর্ণের সম্পদ। মুসলিম শাসনে মসজিদে মসজিদে মক্তব ও মাদ্রাসা গড়ে উঠল। ইতিহাসবিদ ডক্টর এম. এ. রহিম বলেন, ‘বাংলায় নির্মিত শত শত মসজিদসংলগ্ন স্থানে মক্তব ও মাদ্রাসাগুলো গড়ে উঠেছিল এবং এ দেশের মুসলিম সমাজে শিক্ষার ব্যাপক বিস্তার ও উল্লেখযোগ্য উন্নতি পরিলক্ষিত হয়। অন্যান্য দেশের मुसलमानों ন্যায় উপমহাদেশের মুসলমানরাও খেলাফত আমলের খ্যাতনামা পূর্বপুরুষদের বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য উত্তরাধিকার সূত্রে লাভ করে।’
ষোলো শতকের মুসলিম কবি বাহরাম লিখেছেন, ‘পুত্র বিদ্যা শিক্ষায় যশস্বী হলে পিতা নিজেকে একজন সম্মানী ব্যক্তিরূপে গর্ববোধ করতেন। বিদ্যাহীন একজন সুদর্শন ব্যক্তিকেও মূল্যহীন গণ্য করা হতো।’ (বাংলার সামাজিক ও রাজনৈতিক ইতিহাস)
ভাষার ক্ষেত্রে পরিবর্তন ঘটল দুইভাবে। ফারসি প্রশাসনিক দরবার থেকে নামল, আর বাংলা নিচ থেকে ওপরে উঠল। ইতিহাসবিদ এম. এ. রহিম বলেন, মুঘল শাসন বাংলা সাহিত্যের অগ্রগতিতে নতুন উৎসাহ-উদ্দীপনার সঞ্চার করে। ফারসি সাহিত্যের মূল্যবান ঐতিহ্য নিয়ে উত্তরাঞ্চল থেকে ক্রমবর্ধমান হারে বহু সংখ্যক পণ্ডিত ও বিদ্বান ব্যক্তি বাংলায় আসেন। মুসলমান কবিগণ ইসলামের আদর্শ অনুসারে জনসাধারণকে অনুপ্রাণিত করার জন্য বাংলায় ধর্মীয় পুস্তক রচনা করলেন। ইউসুফ-জোলেখা, লালমতি-সায়ফুল-মুলুক, গদা-মল্লিকার মতো কাব্য বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করল। অন্যদিকে শ্রীচৈতন্যের বৈষ্ণব মতবাদ তাঁর শিষ্যগণ কর্তৃক পুনরুজ্জীবিত হলো এবং বৈষ্ণব সাহিত্যের সমৃদ্ধি ব্যাপক উৎসাহ লাভ করল। বাউল-মুর্শিদা-ভাটিয়ালি সংগীত ফুলে উঠল এবং এই দুই ধারা একে অপরকে প্রভাবিত করতে করতে এগিয়ে চলল।
স্থাপত্যেও বাংলার মাটি তার নিজস্ব পথ বের করল। মুসলমান নির্মাতাগণকে স্থানীয় ও সহজলভ্য মালমসলা ও রাজমিস্ত্রির ওপর নির্ভর করতে হয়েছিল বলে স্বাভাবিকভাবেই স্থানীয় চিন্তাধারা ও রীতিনীতির প্রভাব মুসলিম স্থাপত্য শিল্পের ওপর পড়েছিল। বাংলাদেশে পাথর দুর্লভ ছিল কিন্তু পলি কাদামাটি ছিল প্রচুর। তাই ইট হলো প্রধান উপাদান। সেই ইট দিয়ে মসজিদ উঠল, কিন্তু তার ছাদে এলো বাংলার চিরপরিচিত বাঁকানো চালের রেখা। পাঁচ মাস গ্রামাঞ্চল পানিতে ডুবে থাকার কারণে ভারী ছাদ চলত না, তাই বক্রাকৃতি বিশিষ্ট ছাদের নির্মাণরীতি উদ্ভাবিত হয়েছিল, যাতে প্রবল বৃষ্টিপাত ছাদের কোনো ক্ষতি করতে না পারে। মধ্যপ্রাচ্যের গম্বুজ আর বাংলার চৌচালার মিলনে তৈরি হলো একটি অনন্য স্থাপত্য ঐতিহ্য, যা পৃথিবীর আর কোথাও নেই।
অর্থনীতির চেহারাও বদলাল। ইবনে বতুতা লিখেছিলেন, তিনি মেঘনার উভয় তীরে উদ্যানরাজি, শস্যপূর্ণ মাঠ ও জনবহুল সমৃদ্ধ গ্রামসমূহ দেখতে পান। পঞ্চদশ শতকের গোড়ার দিকে আগত চৈনিক দূতগণ মন্তব্য করেছেন, স্বর্গ এই রাজ্যে পৃথিবীর স্বর্ণরাজি ছড়িয়ে রেখেছে। বাংলার উর্বরতার কাহিনী এত বেশি প্রচলিত ছিল যে, আবুল ফজল লিখেছেন, ধানের গাছগুলো এক রাতেই ৬০ হাত বেড়ে উঠত এবং বাংলার মাটিতে বছরে তিনটি ফসল জন্মাত। (বাংলার সামাজিক ও রাজনৈতিক ইতিহাস)
বস্ত্রশিল্পেরও প্রসার ঘটে। সে যুগে সুতা কাটা ও বস্ত্র বয়ন ছিল একটি সম্মানজনক পেশা। ময়মনসিংহের বাজিতপুর ও জঙ্গলবাড়ির সুতাকাটা কারিগরগণ সর্বোৎকৃষ্ট মানের সুতা প্রস্তুত করত, এবং একজন অতি দক্ষ রমণী সারাক্ষণ সুতা কাটার কাজে নিয়োজিত থেকে সে সময় প্রায় এক মাসে তিন টাকা আয় করতে পারত।
বাংলায় মুসলিম আমল ছিল এ অঞ্চলের সমাজ, সংস্কৃতি ও মানুষের মনস্তত্ত্বের এক যুগান্তকারী পুনর্গঠন। যে সমাজ এককালে কঠোর বর্ণভেদের শৃঙ্খলে বন্দি ছিল, তা ইসলামের সাম্য ও সুফি-দরবেশদের উদারতার স্পর্শে এক নতুন গতিশীলতা লাভ করে। উচ্চবর্ণের ভাষা ও সংস্কৃতির আড়াল থেকে মুক্ত হয়ে বাংলা ভাষা স্বমহিমায় বিকশিত হয় রাজদরবার থেকে লোকালয় পর্যন্ত। বাংলার নিজস্ব মাটি আর জলবায়ুর সাথে মিশে গিয়ে স্থাপত্য, অর্থনীতি ও জীবনযাত্রায় যে সমৃদ্ধি আসে, তা এই অঞ্চলকে পৃথিবীর বুকে অনন্য করে তোলে। এই সমন্বয় ও রূপান্তরের উত্তরাধিকার আমরা আজও বহন করে চলেছি।
তথ্যসূত্র:
১. বাংলার সামাজিক ও রাজনৈতিক ইতিহাস — ডক্টর এম. এ. রহিম
২. বাঙালীর ইতিহাস — সুভাষ মুখোপাধ্যায়
৩. The Rise of Islam and the Bengal Frontier (1204–1760) — Richard M. Eaton







